Image description

রাজধানীর কল্যাণপুরের সরু গলির শেষ মাথায় জংধরা টিনের এককক্ষের ঘর। এখানে কেন্দ্রীয় কার্যালয় খুলেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ-শাজাহান সিরাজ), যারা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রাথমিক বাছাইয়ে নিবন্ধনের জন্য যোগ্য বিবেচিত ২২টি দলের একটি। এমনই অপ্রচলিত স্থানে কার্যালয় স্থাপন করেছে আরও কয়েকটি দল—কেউ গ্রামের বন্ধ কারখানায়, কেউ আবাসিক ফ্ল্যাটে, কেউবা কোচিং সেন্টার বা ভবনের ছাদে। এসব দলের কার্যালয়ের অবস্থা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ার শর্ত নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

প্রথম সারির একটি গণমাধ্যমের সরেজমিন তদন্তে দেখা গেছে, ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারী ২২টি দলের মধ্যে ১৯টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঢাকায়, বাকি তিনটি সাভার, কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। তবে অনেক দলের কার্যালয়ের অবস্থা ইসির নিবন্ধন শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অপ্রচলিত স্থানে কার্যালয়

  • জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ-শাজাহান সিরাজ): কল্যাণপুরের ১৩ নম্বর সড়কে টিনের এককক্ষের ঘরে কার্যালয়। দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল জানান, সাবেক সংসদ সদস্য শাজাহান সিরাজের নামে নিবন্ধনের আবেদন করা হয়েছে, প্রতীক হিসেবে চাওয়া হয়েছে ‘দোয়াত কলম’।

  • বাংলাদেশ সলুশন পার্টি: গাজীপুরের কাপাসিয়ার দুর্গাপুর গ্রামে বন্ধ পোশাক কারখানায় কার্যালয়। দলের সভাপতি শামছুল হকের বাবা আবদুল মোতালেব জানান, আধা পাকা চার কক্ষের এই কারখানাই দলের কার্যালয়।

  • বাংলাদেশ বেকার সমাজ (বাবেস): ক্রিসেন্ট রোডের একটি ফ্ল্যাটে কার্যালয়, যেখানে দলের সভাপতি মো. হাসানের ছেলে পরিবার নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, “ছোট দল হওয়ায় অসুবিধা আছে, তাই ছেলের বাসায় কার্যক্রম চলছে।”

  • ফরওয়ার্ড পার্টি: ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কে স্কলার্স কোচিং সেন্টারের ভেতর দুটি কক্ষে কার্যালয়। দলের মহাসচিব মো. মাহবুবুল আলম জানান, ২২টি জেলা ও ১০০টি উপজেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

  • জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি: পুরান ঢাকার নর্থব্রুক হল রোডের একটি ভবনের ছাদে এককক্ষের কার্যালয়। কক্ষে চেয়ার-টেবিল থাকলেও কম্পিউটার বা প্রিন্টার নেই।

কার্যালয় না পাওয়া দল

  • নতুন বাংলাদেশ পার্টি: মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার উল্লেখিত ঠিকানায় কার্যালয়ের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দলের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) সিকদার আনিসুর রহমান জানান, ভবনমালিকের আপত্তির কারণে কার্যালয় ইসিবি চত্বরে স্থানান্তর করা হয়েছে।

  • বাংলাদেশ জাতীয় লীগ: কেরানীগঞ্জের টানপাড়া আটি নামে উল্লেখিত ঠিকানার কোনো অস্তিত্ব নেই। দলের চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম প্রথমে ঘাটারচরের কথা বললেও পরে জানান, কার্যালয় মিরপুরের মাজার রোডে স্থানান্তরিত হয়েছে।

বাণিজ্যিক ভবনে কার্যালয়

১২টি দলের কার্যালয় বাণিজ্যিক ভবনে অবস্থিত, যার মধ্যে রয়েছে:

  • বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি: কাকরাইলের পাইওনিয়ার রোডে।

  • বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি (বিআরপি): সেগুনবাগিচায় তিন কক্ষের পরিচ্ছন্ন কার্যালয়, প্রতীক হিসেবে ‘ঢেঁকি’ চাওয়া হয়েছে।

  • জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): বাংলামোটরের রূপায়ণ টাওয়ারে আধুনিক কার্যালয়, গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি দেয়ালে।

অন্যান্য দলের কার্যালয়

  • মৌলিক বাংলা দল: সাভারে আধা পাকা এককক্ষে কার্যালয়।

  • বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি (বিজিপি): উত্তরায় নির্মাণাধীন ভবনের পার্কিংয়ে অস্থায়ী কার্যালয়, প্রতীক হিসেবে ‘ঢেঁকি’ চাওয়া হয়েছে।

  • জাতীয় জনতা পার্টি: ওয়ারীতে নিজস্ব ভবনে কার্যালয়।

  • বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-সিপিবি (এম): তোপখানা রোডে এককক্ষের কার্যালয়, কম্পিউটার বা প্রিন্টার নেই।

  • ভাসানী জনশক্তি পার্টি: পুরানা পল্টনে এককক্ষের কার্যালয়, প্রতীক হিসেবে ‘তালের আঁশের টুপি’ চাওয়া হয়েছে।

নিবন্ধনের শর্ত ও বাস্তবতা

ইসির নিবন্ধন শর্তে কেন্দ্রীয় কার্যালয়, এক-তৃতীয়াংশ জেলায় কার্যকর কার্যালয়, ১০০টি উপজেলায় কমিটি ও প্রতিটিতে ২০০ ভোটারের তালিকা প্রয়োজন। অতীতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা ৫% ভোট পাওয়াও যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আবদুল আলীম বলেন, “কিছু দল শর্ত পূরণ না করেও নিবন্ধন পেয়েছে। রাজনীতিকে বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা হচ্ছে, যা বন্ধে আইন সংস্কার প্রয়োজন।”

প্রশ্নবিদ্ধ কমিটি

জনতার দলের দৌলতপুর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত মোজাফফর দেওয়ান জানান, তিনি দলীয় পদ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তাঁর ভোটার আইডি কার্ড অনুদানের প্রলোভনে সংগ্রহ করা হয়েছে।

ইসি ১৪৭টি দলের মধ্যে ২২টিকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য বিবেচনা করলেও, কার্যালয়ের অবস্থা ও শর্ত পূরণে ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে। ৩১ আগস্টের মধ্যে মাঠপর্যায়ের তদন্ত শেষ করবে ইসি।