Image description

সাধারণত শীত শুরু হওয়ার আগে উত্তর ও মধ্য এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে প্রচুর অতিথি পাখি বাংলাদেশের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় আসে। শীত শেষে আবার ফিরে যায় আপন নীড়ে। তবে প্রচণ্ড গরম মৌসুমেও বঙ্গোপসাগরের মৃদু ঢেউ বালুকাময় তীরে আছড়ে পড়ছে, এ সময় উপকূলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শত শত অতিথি পাখি। দ্রুত পায়ে তারা এদিক-সেদিক ওড়াওড়ি করছে, কিংবা ক্ষুদ্র ক্রাস্টেসিয়ান ও পোকামাকড়ের খোঁজে ঠোঁট দিয়ে ভেজা বালি খোঁড়াখুঁড়ি করছে। 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেবলীপ কুমার দাস বলেন, এখনও যৌন পরিপক্ব হয়নি এমন কিছু অল্পবয়সী পাখি পুরো গ্রীষ্মজুড়ে বাংলাদেশের মতো অ-প্রজননকারী স্থানগুলোতে থেকে যায়। তাই এদের সঙ্গে শুধু শীতকালে আসা মৌসুমি পাখিদের গুলিয়ে ফেলা যাবে না। তবে যে মনে করা হয় তা হলো, এখন গ্রীষ্মকালেও এসব অতিথি পাখি বাংলাদেশে আসছে, নিশ্চয়ই জলবায়ু পরিবর্তনের ফল এসব। 

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন প্রকৃতির জন্য একটি বড় হুমকি হলেও, মে মাসে বাংলাদেশে অতিথি পাখির দেখা পাওয়ার ঘটনাটি নতুন কিছু নয়! বিশেষজ্ঞরা একে খুবই স্বাভাবিক বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং প্রচলিত ধারণাটিকে ভুল হিসেবে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের প্রচলিত ধারণা, শুধু শীতকালেই বাংলাদেশে অতিথি পাখি দেখা যায়। এ সময় সবাই এসব অতিথি পাখি সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে। 

এশিয়ার বিপন্ন প্রজাতির বাস্তুসংস্থান ও সংরক্ষণে আগ্রহী সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী সায়াম ইউ চৌধুরী বলেছেন, অনেক শোরবার্ড, বিশেষত তরুণরা গ্রীষ্মকালে উত্তরের যেসব দেশ থেকে তারা এসেছে, সেখানে ফিরে যায় না। তাই এসব তরুণ অতিথি পাখি শীত শেষ হওয়ার পরও অন্যান্য দেশে থেকে যায় এবং গ্রীষ্মকালে দেশের উপকূলীয় এবং জলাভূমি এলাকায় থাকে। এই বিষয়টি ‘ওভার-সামারিং’ নামে পরিচিত। তাই খুব সম্ভবত কেন্টিশ প্লোভার মে মাসে বাংলাদেশে আসেনি। তারা সম্ভবত শীতকাল শেষেও বাংলাদেশে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের বাকি সঙ্গীরা অনেক আগেই দেশে পৌঁছে গেছে। 

বাংলাদেশে শোরবার্ডদের ‘ওভার-সামারিং’ আচরণ বোঝার জন্য সায়ম এবং তার দল কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপের শোরবার্ডগুলোর  উপর পাঁচ বছর (২০১১-২০১৫) ধরে একটি গবেষণা করেছিলেন। তারা শীত (জানুয়ারি-মার্চ) এবং গ্রীষ্ম (মে-আগস্ট) উভয় ঋতুতেই পাখিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেন। এই সময়কালে তারা মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সোনাদিয়া দ্বীপে ২৩ প্রজাতির সোরবার্ডের উপস্থিতি দেখতে পান। এই ২৩ প্রজাতির ওপর সারা গ্রীষ্ম এবং শীতকালে নজর রাখেন তারা। 

তারা দেখেন, সর্বাধিক ‘ওভার-সামারিং’ করা প্রজাতিগুলো হলো লেসার স্যান্ড প্লোভার, গ্রেটার স্যান্ড প্লোভার এবং ইউরেশীয় কার্লিউ। সায়ামের মতে, বড় থেকে মাঝারি আকারের শোরবার্ডের ক্ষেত্রে গ্রীষ্মকাল এবং শীতকালের গড় সংখ্যার মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। 

সোনাদিয়া দ্বীপে সবচেয়ে বেশি যে প্রজাতির পাখি ছিল, তাদের একটি বড় অংশের বয়স ছিল এক বছর মতো। তিনি বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপে বিশ্বব্যাপী বিপন্ন শোরবার্ডগুলোর উল্লেখযোগ্য সংখ্যকের ‘ওভার-সামারিং’ রেকর্ড করা হয়েছে। তাই আমাদের উচিত সারা বছর এসব পাখি সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেয়া।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রাণিবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক দিলীপ কুমার দাস বর্তমানে গ্রোনিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। অধ্যাপক দিলীপ কুমার দাস জানান, তিনি অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত একাধিকবার লাল চর পরিদর্শন করেছেন উপকূলীয় পাখিদের পর্যবেক্ষণের জন্য। কেন্টিশ প্লোভার সেখানে বাস করা একটি পরিচিত প্রজাতি। 

তার মতে, বাংলাদেশে শরৎ থেকে বসন্ত পর্যন্ত সর্বোচ্চ অতিথি পাখি দেখা যায়। ব্ল্যাক-টেইলড গডউইট এবং ইউরেশিয়ান কার্লিউর মতো প্রজাতি প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৯ মাস অবস্থান করে। বেশিরভাগ অতিথি পাখি বাংলাদেশে আসতে শুরু করে আগস্ট মাসের প্রথম থেকেই, তবে সর্বোচ্চ পাখি আসে মধ্য নভেম্বরের দিকে। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়কাল কেন্টিশ প্লোভারের মতো অতিথি পাখিদের প্রজনন ঋতু হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়ে তারা সঙ্গম, বাসা নির্মাণ, ডিম পাড়া এবং তাদের ছানাদের পালন-পালনের জন্য উত্তরে ফিরে যায়। দেশের উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত জোয়ারভাটা হয়। ফলে এসব জায়গায় একটি ‘ইন্টারটিডাল জোন’ তৈরি হয়, অর্থাৎ সেই নির্দিষ্ট অংশ পর্যন্ত জোয়ার ও ভাটার সময় পানির স্তর ওঠানামা করে।

এই ইন্টারটিডাল জোনগুলোতে ভাটার সময় অতিথি পাখিদের জন্য প্রচুর খাবার পাওয়া যায়। শোরবার্ড, ওয়াডার এবং জলচর পাখিরা এই গতিশীল পরিবেশে খুব ভালোভাবে মানিয়ে নেয়। তারা উন্মুক্ত কাদামাটিতে ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী এবং মাছের মতো শিকার খোঁজে। 

তবে হাওর অঞ্চলগুলোতে সারা বছর অতিথি পাখি দেখা যায় না। কারণ বর্ষা মৌসুমে সেখানে ভারি বৃষ্টিপাত এবং ব্যাপক বন্যা হয়। বন্যায় বিস্তৃত এলাকাজুড়ে আবাসস্থল প্লাবিত হয়, যার ফলে এসব অঞ্চলে অতিথি পাখিদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং বিশ্রামের সুযোগ কম থাকে। হাওর অঞ্চলের তুলনায় উপকূলীয় এলাকা সবসময়ই অতিথি পাখিদের আশ্রয়স্থল হওয়ার বেশি উপযুক্ত। যেমন- নিঝুম দ্বীপ অতিথি পাখিদের ‘ব্যস্ততম বিমানবন্দর’ হিসেবে বিবেচিত।


মানবকণ্ঠ/এফআই