Image description

তরুণ শিল্পী ও ডিমোক্রেজি ক্লাউনস্ ব্যান্ডের ভোকালিস্ট ইলা লালালালা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি এবার ডাকসু নির্বাচনে সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্সুরেন্স বিভাগের এই ছাত্রী গান, রাজনীতি এবং নারীদের ভূমিকা নিয়ে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন তার অভিজ্ঞতা।

ফারিয়া মতিন থেকে ইলা লালালালা নামটি কীভাবে এল? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, "২০২৩ সালের মঙ্গল শোভাযাত্রায় প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলাম। লেখা ছিল – চাল জোটে না, ইলিশ পাবো কই! ছবিটা ভাইরাল হলে আওয়ামী লীগের লোকজন আমাকে ট্রল করে ফেসবুক আইডি উড়িয়ে দেয়। নতুন আইডিতে ডাকনাম ইলা যুক্ত করে লালালালা... রেখে দিই।"

গানে কীভাবে এলেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি গান গাই বিশ বছর, আমার বয়স ২৪। চার বছর বয়সে গানের স্কুলে ভর্তি হই। তখন আমার গানের গুরু ছিলেন শরীফুল ইসলাম শরীফ স্যার। সেমি-ক্ল্যাসিকাল দিয়ে শুরু করি। যশোরে দুই বছর গান শেখার পর ঢাকায় চলে আসি পরিবারের সঙ্গে। ঢাকায় আসার পর দীর্ঘ সময় দরবারি গান করি। এর মধ্যে চার-পাঁচ বছর পরিবার গান বন্ধ করে দেয়। ২০২০ সালে এইচএসসির পর গানে ফেরার কথা মনে হলো। নিজেকে মনে হলো ছাড়া ছাড়া … নিজের কাছে মনে হচ্ছিলো কী যেন একটা নেই। কিছু টাকা জমিয়ে, কিছু টাকা ধার করে একটা গিটার কিনি। কয়েকটা কড শিখে নিজে নিজে গান করার চেষ্টা করি।

ব্যান্ড করার গল্প জানতে চাইলে ইলা বলেন, আমার ইচ্ছে ছিল গানের দল করবো। সবাই মিলে গান করবো। আমাদের গান সবাই কানেক্ট করতে পারবে। খুব পপুলাল হতে হবে, তা না। আমাদের গান যারা পছন্দ করবে, আসলেই পছন্দ করবে। তখন চেষ্টা করি ব্যান্ড করার। বিশ্ববিদ্যালয় শুরু করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। আস্তে আস্তে ব্যান্ডটা ফর্ম করলাম। ব্যান্ডের পাঁচটা গান রেডি করলাম। আমাদের গান অফিসিয়ালি রিলিজ দিইনি। কিন্তু আপনি আমাদের ক্যাম্পাসে যান, বাংলাদেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডায় আমাদের গান গাওয়া হয়। আমাদের গান রিলিজ হয়নি, কিন্তু আমাদের গান মানুষ শুনছে, আমাদের গান মানুষ গায়। এটা আমাদের বড় অর্জন বলে মনে হয়। আমাদের ব্যান্ডদল গঠনের সময়কার মজার একটা ঘটনা আছে। বাউলরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে চাল, ডাল, সবজি সংগ্রহ করে। এটা ইউরোপের দিকে অনেক হয়। সামনে বক্স রেখে গান গায়। আমরাও সামনে একটা বক্স রাখলাম, প্ল্যাকার্ডে কিছু একটা লেখা থাকে, যেটা আমাদের আইডোলজি প্রকাশ করে। মানুষ টাকা দেয়, ফুল দেয়, বই দেয়, নানান ধরনের জিনিস দেয়। বাস্কিং থেকেই ব্যান্ডের নাম ডিমোক্রেজি ক্লাউনস্ দেওয়া হয়েছে।

ছাত্ররাজনীতির শুরু কীভাবে হলো, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রথমবর্ষ থেকে। একদিন দেখলাম, কিছু লোক মিছিল করছিল, অল্প কয়েকটা লোক। মনে হলো আসলে কী নিয়ে মিছিল! গিয়ে দেখি না, এরা যৌক্তিক জিনিস নিয়েই মিছিল করছে। প্রথমবর্ষ থেকে আমিও যুক্ত হলাম। মিছিলে গেলাম। মিছিলে গেলে আমি মজার একটা কাজ করি। সবাই মিলে একটা গান গাই, ‘আমরা করবো জয়।’ আমার কাছে পবিত্র জায়গা হলো মিছিল-মঞ্চ, যেখানে দাঁড়িয়ে আমি গান গাই, যেখানে ন্যায্য দাবির কথা বলতে বলতে হাঁটি।

ডাকসু নির্বাচনকে কীভাবে দেখছেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে ইলা বলেন, ডাকসু নির্বাচন শেষবার ২০১৯ সালে হলো। এর আগে ৩৭ বছর আগে হয়েছে। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আমাদের ক্যাম্পাস উৎসবমুখর অবস্থায় আছে এখনও। আমাদের ক্যাম্পাসে আছে ৪০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী। প্রশাসন আসলে যতগুলো ভোটকেন্দ্র বানিয়েছে, ১৫ হাজার ছাত্র-ছাত্রী ভোট দিতে পারবে। বাকি থেকে যাচ্ছে অনেক ভোটার। ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে কি না এ নিয়ে আমি শঙ্কিত। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা, ডাকসু নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে হোক। এটা আমাদের ন্যায্য অধিকার।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক হলে প্রথমে কোন কাজটি করবেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি যেটা প্রথমে করতে চাইবো, ঢাবিতে বিভিন্ন জেলার ছেলে-মেয়েরা আসছে, তাদের নিজের মাটির সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করবো। বিশ্ববিদ্যালয় কালচারাল এক্সচেঞ্জের জন্য খুবই সুন্দর জায়গা। প্রত্যেকটা মানুষ নিজের কালচার নিয়ে আসে সেখানে। সবাই সবার কাছ থেকে গ্রহণ করে। আমি ক্যাম্পাসে আসার পর দুই বছর কোনো কনসার্টে গান গাইতে পারিনি। সব অনুষ্ঠানে লেখা থাকতো ‘ছাত্রলীগ’। আমি তাদের ব্যানারে কোনো গান গাইনি। কোনো ক্লাব-ট্লাব করিনি। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি একজন শিল্পী, শিল্পীর সৎ থাকা উচিত।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে কী পরিবর্তন দেখছেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে ইলা বলেন, পরিবর্তন আসলে একটি লেনদি প্রসেস। বাংলাদেশটা খুব অল্পবয়সী একটা দেশ। কয়েক বছর পর পর একটা করে অভ্যুত্থান আসছে, সরকারপতন করে আসছে। কিন্তু স্থিতাবস্থার জন্য যুদ্ধটা একটা লঙটার্ম যুদ্ধ। আমরা কিছু বেসিক জিনিস আশা করেছিলাম। ভেবেছিলাম, নারী হিসেবে স্বাধীনভাবে চলতে পারবো। বর্তমান সরকার সেটা নিশ্চিত করতে পারেনি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ের নারীরা মুখ ফিরিয়ে নিলো কেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সিস্টেমেটিক্যালি মেয়েদের সামনে আসতে দেওয়া হয় না। যখন আন্দোলনে প্রয়োজন ছিল, তখন ব্যবহার করেছে। দেখবেন ছেলেরা কিন্তু ছাত্রলীগ পিটিয়ে হল থেকে বের করে দিতে পারেনি, মেয়েরা পেরেছে। মেয়েদের যতটুকু প্রয়োজন ছিল, ততটুকু ব্যবহার করা হয়েছে। যখন ক্ষমতা নেওয়ার সময়, তখন কোথাও মেয়েদের নেওয়া হয়নি। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়টা অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া নারীদের জন্য বেশ কষ্টদায়ক।

আপনার তো দুটো পরিচয়। একটা রাজনীতিক, আরেকটা শিল্পী। কোন পরিচয়টা আপনি প্রথমে নিতে পছন্দ করেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে ইলা বলেন, দুটো পরিচয় আসলে আলাদা না। আমার একটা পরিচয় আরেকটার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। আমি মনে করি, প্রত্যেক শিল্পীর তার জায়গাটা জানা উচিত যে, কার পক্ষে গানটা গাইছি। আমি তো শোষিতের পক্ষে গানটা করি, যার হক আদায় হয় না, মঞ্চে তার গানটা করি। আমি ওইসব মঞ্চ থেকে কোনো টাকা নিই না। আমি উল্টো নিজের পকেটের টাকা খরচ করে গিয়ে গানটা গেয়ে আসি।