পিসিবি প্রকল্প কাজ কতদূর

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে সংসদীয় কমিটি


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ০৯ মার্চ ২০২২, ১৬:৪৯,  আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২২, ১৬:৫৭

‘এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড ডেভেলপমেন্ট ফর দ্য পাওয়ার সেক্টর উইথ দ্য ফাইনাল ডিসপোজাল অব পলিক্লোরিনেটেড বাই ফিনাইল (পিসিবি)’ নামের প্রকল্পটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের। প্রকল্পটির মেয়াদ ফুরিয়েছে গত ডিসেম্বরে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজের অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ। একই সময়ে মেয়াদ শেষ হওয়া চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার শেখ রাসেল অ্যাভিয়ারি অ্যান্ড ইকোপার্ক প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি আরো কম। এই প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ১৯ দশমিক ৬১ শতাংশ হলেও বাস্তব অগ্রগতি ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২৩টি প্রকল্পের তথ্য দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি প্রকল্পের বাস্তবায়নকাজের অগ্রগতি ২৫ শতাংশের নিচে। কাজের এই শামুকগতির বিষয় নিয়ে ক্ষুব্ধ এ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। আগামী বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়নে প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতি প্রতিবেদন সম্পর্কে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন (আইএমইডি) বিভাগের মূল্যায়ন প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

জাতীয় সংসদ ভবনে গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী। কমিটির সদস্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার, নাজিম উদ্দিন আহমেদ, তানভীর শাকিল জয় এবং খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন  বৈঠকে অংশ নেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রধান বন সংরক্ষক, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মন্ত্রণালয় এবং সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।                    

এর আগে জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব কমিটির বৈঠকেও সরকারি কাজের এই ধীরগতির জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই বৈঠকে প্রকল্প কাজের এমন অবস্থার জন্য মন্ত্রণালয় করোনা পরিস্থিতিকে দুষলেও কমিটির পক্ষ থেকে দায়ী করা হয়েছে কাজের সমন্বয়হীনতাকে। এ ব্যাপারে সংসদীয় কমিটির সভাপতি উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুস শহীদ জানান, মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প নিয়ে আলোচনার সময় কাজের ধীরগতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে নেই কোনো সমন্বয়। বেশ কিছু প্রকল্পে আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি হুবহু একই। অথচ আর্থিক অগ্রগতির থেকে কাজ বেশি হওয়ার কথা। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় কোনো পর্যালোচনা না করেই বড় বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পের খরচ, সময় নির্ধারণ এবং জমি অধিগ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই। নামকাওয়াস্তে একটি প্রকল্প নিয়ে তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই যেকোনো প্রকল্প হাতে নেয়ার আগে সার্বিক পর্যালোচনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ানো রোধে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে প্রকল্প হাতে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

সংসদীয় কমিটিতে উত্থাপিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত জুনে মেয়াদ শেষ হওয়া এস্টাবলিশিং ন্যাশনাল ল্যান্ড ইউজ অ্যান্ড ল্যান্ড ডিগ্রেডেশন প্রফাইল টুওয়ার্ডস মেইন স্ট্রিমিং এসএলএম প্রাবপ্রিস ইন সেক্টর পলিসিস প্রকল্পের কাজ এখনো ১৪ দশমিক ১১ শতাংশ বাকি রয়েছে। আর পরিবেশ অধিদপ্তরের অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণাগার স্থাপন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ। ৪ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মেয়াদ আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে মেয়াদ শেষ হবে ৩ বছর মেয়াদি ইকোসিস্টেম বেসড অ্যাপ্রোচ টু অ্যাডাপশন (ইবিএস) ইন দ্য ড্রাউট-প্রোন বারিন্দ ট্র্যাক্ট অ্যান্ড হাওর ‘ওয়েটল্যান্ড’ এরিয়া প্রকল্পের। এই প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ।

গত ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে সুনীল অর্থনীতি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য প্রতিবেশ সম্পদের সমীক্ষা প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া ২৪ মাসের এই প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি ১০ শতাংশেরও কম। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি একই। ৩ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের ২ বছরের বেশি সময়ে কাজের অগ্রগতি মাত্র ২ দশমিক ২৭ শতাংশ।  বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইন অ্যাবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন প্রকল্পের বাস্তবায়নকাজের অগ্রগতি ৩৫ শতাংশ। আগামী জুনে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। একই সময়ে মেয়াদ শেষ হবে বাংলাদেশ ফার্স্ট বাইনিয়াল আপডেট রিপোর্ট টু দ্য ইউএসএফসিসিসি প্রকল্পের। এই প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্যারিস চুক্তির আওতায় পরিবেশ নির্গমন পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা জোরদারকরণ প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি ১৮ দমিক ১৩ শতাংশ। এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। একই সময়ে মেয়াদ শেষ হবে রিনিউয়াল অব ইনস্টিটিউশনাল স্ট্রেনদেনিং ফর দ্য ফেস-আউট অব অডিএস প্রকল্পের। এই প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। একই মন্ত্রণালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, গাজীপুরের অ্যাপ্রোচ সড়ক প্রশস্তকরণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে। গত ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষের এই প্রকল্পের কাজ এখনো অর্ধেকও হয়নি।

এ ছাড়া বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও আবাসস্থল উন্নয়ন প্রকল্প, বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা নতুন চরসহ উপকূলীয় এলাকায় বনায়ন প্রকল্প, স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগণের সহায়তায় মধুপুর জাতীয় উদ্যানের ইকোট্যুরিজম উন্নয়ন ও টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদকরণ প্রকল্প, টেকসই বন ও জীবিকা প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, কক্সবাজারে অধিকতর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প, কক্সবাজার জেলায় সবুজ বেষ্টনী সৃজন, প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার ও ইকোট্যুরিজম উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগে পুনঃবনায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, মাদারীপুর জেলার আওতায় চরমুগুরিয়া ইকোপার্কের আধুনিকায়ন প্রকল্প এবং চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্পের কাজও শেষ হয়নি এখনো।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রকল্প কাজের প্রকৃত অবস্থা কি তা জানাটা জরুরি। তাই মন্ত্রণালয়কে আগামী বৈঠকে এ সংক্রান্ত আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন থেকেই প্রকৃত চিত্র জানা যাবে। 

এদিকে গতকালের বৈঠকে পার্বত্য অঞ্চলের বনকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অভয়ারণ্য করতে ওই অঞ্চলের প্রতিবেশ ব্যবস্থা এর উপযোগী কি না, এর সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখতে বলেছে কমিটি। সাবের হোসেন চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, এক সময় তো বেঙ্গল টাইগার সারা বাংলাদেশেই ছিল। এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখন কেবল সুন্দরবনে বসবাস করে। এজন্য আমরা ভাবছি, পার্বত্য এলাকায় টাইগারের দ্বিতীয় হ্যাবিটেট তৈরি করতে পারি কি না। মন্ত্রণালয় এই বিষয়টি দেখছে। পরবর্তী বৈঠকে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট মন্ত্রণালয়কে দিতে বলা হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চল, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার নিয়ে ট্রান্স বাউন্ডারি করিডর হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ট্রান্স বাউন্ডারি করিডরে পরামর্শক নিয়ে যে অনিয়ম ছিলে, তার তদন্ত প্রতিবেদন এসেছে। সেখানে যে কর্মকর্তা দায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে।  সাভার ট্যানারিতে অ্যাকশন শুরু হয়েছে উল্লেখ করে সভাপতি বলেন, পরিবেশ দূষণের দায়ে ৭টি ট্যানারির বিদ্যুত্, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। কিছু বাধা এলেও আমরা এটা করতে পেরেছি। আরও ২৩টির মতো ইউনিট রয়েছে, যেগুলোর দূষণের মাত্রা খুবই বেশি। সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন আছে। পরিবেশ দূষণ প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। তিনি জানান, পরিবেশ খাতে নারীদের অবদানের স্বীকৃতি দিতে আগামী বছর থেকে নারী দিবস উপলক্ষে পুরস্কার দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা কীভাবে হবে সেই বিষয়ে মন্ত্রণালয় নীতিমালা তৈরি করবে।

বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালায় সেখানে ধূমপান ও রাত যাপন নিষিদ্ধকরণ এবং দিনে পর্যটক ৯০০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বৈঠকে ‘কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ’ এর কার্যপ্রণালী বিধি চূড়ান্তকরণ বিষয়ে প্রস্তাবনা, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্প সবুজায়নে  সার্কুলার এবং ইকোনমি সেক্টরে আসন্ন বাজেটে প্রস্তাবনা, পরবর্তী কপ সম্মেলনের আগের ইভেন্টগুলোর বিষয়ে গৃহীত কর্মসূচি এবং বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের বেদখলকৃত জমির তথ্য ও তা উদ্ধারে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। কমিটি প্লাস্টিক উত্পাদনে স্থানীয় কাঁচামালের ট্যাক্স বাড়িয়ে উত্পাদন নিরুত্সাহিত করা এবং বন বিভাগের ভূমিতে অনুমোদনহীনভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের তালিকা আগামী সভায় উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে।


poisha bazar