মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট চলছে কচ্ছপ গতিতে


  • সেলিম আহমেদ
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৮:৪০

পৃথিবীর সব ভাষা সংরক্ষণ ও হুমকিতে পড়া ভাষা বিস্তারের উদ্যোগ গ্রহণসহ চর্চা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে মাতৃভাষাকে সুরক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। দীর্ঘ এক যুগে পা দিলেও এখনো ভাষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি মানুষের কাছে নিজের সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পর্কেও জানান দিতে পারেনি এটি। শুরু থেকেই অনেকটা কচ্ছপ গতিতে চলছে এর কাজ। আইন অনুযায়ী ২৩টি কাজ থাকলেও ভাষা জাদুঘর ও একমাত্র মৌলিক কাজ বাংলাদেশের নৃ-ভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির আর কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। এরমধ্যে প্রচারের অভাবে ভাষা জাদুঘরের কথা অনেকটা অজানাই রয়ে গেছে মানুষের কাছে। আর নৃ-ভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষার গবেষণার ফল ১০ খণ্ডে প্রকাশ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেছে মাত্র একটি খণ্ড। বাকি খণ্ডগুলো কবে প্রকাশ হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। শুধু বুলেটিন প্রকাশ ও স্কুল শিক্ষকদের ভাষা বিষয়ক কয়েকটি প্রশিক্ষণ, অভ্যন্তরীন প্রশিক্ষণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুই-একটি সেমিনার আর জাতীয় দিবসগুলো পালন করেই সময় পার করছে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটটি।

এ প্রসঙ্গে দেশের গবেষকরা বলছেন, বাংলাসহ বিশ্বের অন্যান্য ভাষা চর্চা বা উন্নয়নে সবচেয়ে বড় অবদান রাখার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। কিন্তু প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মন্থর গতি ও উদ্যোগহীনতা প্রতিষ্ঠানটিকে অকার্যকর করে তুলেছে। সারাবিশ্বের সব মাতৃভাষা, এমনকি বিপন্ন ভাষা রক্ষা ও ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা দেয়াই এই প্রতিষ্ঠানেরই কাজ। চাইলে প্রতিষ্ঠানটি এত বছরে অনায়াসে কিছু মেধাবী ছেলেমেয়ের নিয়োগ দিয়ে নিজস্ব ভাষাবিজ্ঞানী আর দোভাষী তৈরি করতে পারত। তারা পরবর্তী সময়ে ভাষা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে নিতে পারতেন। কারণ ভাষা গবেষণা বিশেষজ্ঞ ছাড়া সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলায়েত হোসেন তালুকদার মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি চলতি দায়িত্বে আছি। এই সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়ার যোগ্যতাই আমার নেই।’ এই ইনস্টিটিউটের পরিচালক (ভাষা, গবেষণা ও পরিকল্পনা) মো. শাফীউল মুজ নবীন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের নৃ-ভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা গবেষণা ফল এক খণ্ড প্রকাশ হয়েছে। বাকিগুলো প্রকাশের প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় রয়েছে।’

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আছে, কিন্তু কী কাজ হচ্ছে আমরা জানি না। কাজ নিশ্চয়ই হচ্ছে; কিন্তু আমরা জানি না। এই ইনস্টিটিউট যখন হয়, তখন আমি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। আমি প্রস্তাব করেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট আছে সেখানে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট করা দরকার। যাতে করে বিশ্ববিদ্যালয় লগ্ন একটি একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হতো। সেখানে পটভূমি তৈরি করা আছে। কিন্তু সরকার আমাদের কথা শুনেনি। কারণ যেকোনো নতুন প্রকল্প হলেই আমলাদের পকেটে রোজগার হয়। তাই নতুন প্রকল্পের ব্যাপারে আমলাদের যথেষ্ট উত্সাহ।’

শিক্ষাবিদ যতীন সরকার বলেন, ‘মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের কাজকর্ম সম্পর্কে আমার খুব একটা ধারণা নেই। যদি কাজ করত তাহলে আমরা সেই সম্পর্কে জানতাম। তবে তারা একটি বুলেটিন বের করে সেখানে কয়েকবার আমার লেখা নিয়েছে।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘প্রথমত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সামগ্রিক কার্যক্রম দেশের মানুষ জানে না। কর্তৃপক্ষের মূল দায়িত্ব ছিল এর কার্যক্রম সম্পর্কে দেশের মানুষকে জানাতে। কিন্তু তারা তা করতে পারেনি। আমি নিজেও তেমন একটা জানি না তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে। আমি সেখানে যেসব কার্যক্রম দেখি তা হলো ভিন্ন ধরনের কার্যক্রম। যেমন—তাদের অডিটরিয়াম ভাড়া নিয়ে চলচিত্র উত্সব থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা সভা হয়। কিন্তু মাতৃভাষা সম্পর্কে সেখানে কী কী কার্যকম পরিচালিত হয় সে সম্পর্কে আমি অজ্ঞ। তাই আমি বলব, তারা যদি তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে দেশের মানুষকে সামগ্রিক ধারণা দিতে না পারে তাহলে মানুষ এতে সম্পৃক্ত হবে না।’

ভাষা জাদুঘরে নেই দর্শনার্থী: ২০১১ সালে ইনস্টিটিউটের প্রথম তলার একটি কক্ষে শুরু হয় বিশ্বমানের ভাষা জাদুঘর এবং ভাষা আর্কাইভ। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্বের ৬৬টি ভাষার তথ্যসমৃদ্ধ এই ভাষা সংগ্রহশালা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ভাষার বর্ণলিপি, উত্পত্তি, ইতিহাস সংরক্ষিত আছে এখানে। অথচ প্রচারের অভাবে দর্শনার্থীদের তেমন আনাগোনা নেই।

সমপ্রতি সরেজমিন ইনস্টিটিউট ঘুরে দেখা যায়, ডিজিটাল ব্যানারে বিভিন্ন দেশের ভাষা ও ভাষা জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে। দেয়ালে ঝুলছে প্রাচীন মিসরীয় ভাষার লিপি, চার হাজার বছর আগের গুহাচিত্রের প্রতিলিপি। কিন্তু এই ভাষা জাদুঘর নিয়েও নেই প্রচার। জাদুঘরের রেজিস্ট্রার বুকেও দেখা যায়, এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা খুব কম আর অনিয়মিত।

প্রসঙ্গত, ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নবেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়। এরপর বিশ্বের বিপন্ন ও প্রায় বিপন্ন ভাষার বিকাশ এবং এসব ভাষার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয় তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৯৯ সালের ৭ ডিসেম্বর পল্টনের এক জনসভায় এ সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে ঘোষণা অনুযায়ী ২০০১ সালের ১৫ মার্চ রাজধানীর ১/ক, সেগুনবাগিচায় ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। সে সময় উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের তত্কালীন মহাসচিব কফি আনান।

দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ইনস্টিটিউটের প্রাথমিক নির্মাণকাজ শেষ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১২তলা ভিত্তির উপর তিনতলা ভবন উদ্বোধন করেন। ইনস্টিটিউট পরিচালনার জন্য একই বছরের ১১ অক্টোবর প্রণয়ন করা হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন। ওই আইনে ইনস্টিটিউটের মোট ২৩টি সুস্পষ্ট দায়িত্ব উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে প্রথমটিই হলো দেশে ও দেশের বাইরে বাংলাভাষার প্রচার ও প্রসারে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ।

বাকিগুলো হলো—পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ক্ষুদ্র জাতিগুলোর ভাষা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, ভাষাবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা, বাংলাসহ অন্যান্য ভাষা আন্দোলন বিষয়ে গবেষণা ও ইউনেসকোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এ সংক্রান্ত ইতিহাস প্রচার, বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ, বাংলা ভাষার উন্নয়নে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনা, ভাষা ও তথ্য প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ, বিভিন্ন ভাষা বিষয়ে অভিধান বা কোষগ্রন্থ প্রকাশ এবং হালনাগাদকরণ, পৃথিবীর সব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার লেখ্যরূপ প্রবর্তন, বাংলাসহ পৃথিবীর সব ভাষার বিবর্তনবিষয়ক গবেষণা, ভাষা বিষয়ে গবেষণা-জার্নাল প্রকাশনা, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন, ভাষা বিষয়ে গবেষণার জন্য দেশি ও বিদেশিদের ফেলোশিপ প্রদান, ভাষা ও ভাষাবিষয়ক গবেষণায় অবদানের জন্য দেশি ও বিদেশিদের পদক ও সম্মাননা প্রদান, ভাষাবিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বৃত্তি প্রদান, ভাষাবিষয়ে আন্তর্জাতিক ভাষাপ্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও রক্ষা সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে কোনো রাষ্ট্র, দেশি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর, বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণমালার জন্য একটি আর্কাইভ নির্মাণ, সংরক্ষণ ও পরিচালনা, ভাষা বিষয়ে জাদুঘর নির্মাণ, সংরক্ষণ ও পরিচালনা, আন্তর্জাতিক মানের গ্রন্থাগার ও গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা, ভাষা বিষয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়া চ্যানেল স্থাপন, পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার ইতিহাস, নমুনা ও তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রদর্শন।


poisha bazar