প্রবাসীদের এনআইডি কবে

- ফাইল ছবি

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২১:৩৩

ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোসহ বিশ্বের ৪০টি দেশে এক কোটি ৪০ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩৪ বাংলাদেশি রয়েছেন। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে জীবনপণ কাজ করছেন এসব রেমিট্যান্সযোদ্ধারা। অথচ তাদের প্রায় সবাই এখনো ‘পরিচয়হীন’। দেশে দেশে গিয়ে এনআইডি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শত কোটি টাকার প্রকল্প গৃহীত হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না এসব প্রবাসীরা। বেশকিছু দেশ থেকে অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ রাখা হলেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সাড়া মিলছে খুবই কম। অনেকাংশে আবেদন জমাই দেয়া যাচ্ছে না। যে কারণে পরিচয়হীন প্রবাসীদের প্রায়ই পড়তে হয় নানা ঝক্কি-ঝামেলায়। যদিও প্রবাসীদের সেবাপ্রাপ্তি সহজ করতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা রয়েছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন (এনআইডি) অনুবিভাগ সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রবাসীদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রবাসেই তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার উদ্যোগ নিলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না পাওয়ায় কাজটি শুরু করা সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলছেন প্রবাসীসহ সংশ্লিষ্টরা। যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা প্রকল্পটির কাজে এ অচলাবস্থার জন্য মহামারী করোনা পরিস্থিতিকে দায়ী করছেন।

এনআইডি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের এনআইডি দিতে ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর মেয়াদে ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিয়া) দ্বিতীয় পর্যায়’ প্রকল্প হাতে নেয় নির্বাচন কমিশন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মেশিন নিয়ে সেসব দেশে যেতে হবে। অনলাইনে আবেদন করলেও প্রবাসীদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর সেটি ঠিক থাকলে তাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট ও চোখের আইরিশ নেয়ার প্রয়োজন হবে। প্রকল্পের আওতায় প্রবাসে নিবন্ধন টিম পাঠানো ও বাংলাদেশি নাগরিকদের নিবন্ধন সংক্রান্ত ব্যয় হিসেবে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না থাকায় কাজ শুরু করা যায়নি।

আইডিয়া প্রকল্পের পরিচালক জানান, কাজ শুরু করতে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনই মিলছে না। অবশ্য এরইমধ্যে লন্ডনের সঙ্গে কাজ অনেকটাই এগিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে কোথায় কোথায় যাওয়া হবে, সে বিষয়ে তাদের সঙ্গে মিটিংও হয়েছে। চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয়েছে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না মেলায় কয়েকবার লন্ডন থেকে আমাদের তাগাদা দিয়ে চিঠি দিলেও কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ৪০টি দেশে বাংলাদেশিরা রয়েছেন। এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিবছর আটটি দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন দুই বছর ধরে সারা পৃথিবীতেই কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের কারণে এসব কার্যক্রম স্থগিত হয়ে আছে। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ যদি দূর হয়, তারা যদি ভিসা দেয় তাহলে আমাদের লোকজন যাবে। বিদেশে আমাদের মিশনগুলোতে এসে তথ্য দিয়ে যায়, তাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট, আইরিশ দিয়ে যায়। কোভিডের ফলে এখন লোক আসতে পারে না, খুব সিলেক্টেড লোক আসে। শুধু দেশে ফেরার ভিসার জন্য আসে। অন্য সব ধরনের কাজকর্ম স্থগিত। সেখানে লাইন ধরতে দেয় না। ব্রিটিশ, স্প্যানিশ, আমেরিকানরা কোনো মিশনে লাইন ধরতে দেয় না, দাঁড়াতে দেয় না। তারা নির্ধারণ করে দিয়েছে কতজন লাইনে থাকবে। নির্বাচন কমিশন থেকে অনুমতি চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হলেও অনুমতি না মিলার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রবাসী ভোটারদের বিষয়গুলো কমিশনের দায়িত্ব। তারা কোভিডের মধ্যে কোথাও যেতে পারেনি, তাই প্রোগ্রামটা মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের রোডম্যাপ অনুযায়ী, প্রবাসীদের এনআইডি দিতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লেবানন, জর্ডান, লিবিয়া, সুদান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, হংকং, মিশর, ব্রুনাই, মরিশাস, ইরাক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, স্পেন, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ব্রাজিল, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, তুরস্ক ও সাইপ্রাসে কার্যক্রম চালাবে নির্বাচন কমিশন। এরইমধ্যে এসব দেশ থেকে বসবাসকারীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশন থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, মালয়েশিয়ায় ৮ থেকে ৯ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস করেন, যার মধ্যে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ প্রবাসীর এনআইডি নেই। কাতারের বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, সেখানে বসবাসরত চার লাখ বাংলাদেশির মধ্যে ৫০ হাজার প্রবাসীর এনআইডি নেই। মিসরের বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, সেখানে বসবাসরত আট হাজার প্রবাসীর মধ্যে পাঁচ হাজারের এনআইডি নেই। এছাড়া আইডিয়া প্রকল্পের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে চার লাখ ৪৯ হাজার ৫৮৮ জন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪১ হাজার ৫৫২, যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার ১০৭, ইতালিতে ৫৫ হাজার ৫২০, হংকংয়ে পাঁচ হাজার, মিসরে ২৩ হাজার ৮৪, ব্রুনাইয়ে ৭৪ হাজার ৮৯৩, মরিশাসে ৬৯ হাজার ৪৭৬, ইরাকে ৭৫ হাজার ৭৪৮, যুক্তরাষ্ট্রে ৮০ হাজার, জাপানে ৬০ হাজার, অস্ট্রেলিয়ায় ৪০ হাজার, গ্রিসে ২৫ হাজার, স্পেনে ৮০ হাজার, জার্মানিতে ২০ হাজার, দক্ষিণ আফ্রিকায় ১০ হাজার, ফ্রান্সে ১২ হাজার, নেদারল্যান্ডসে ৭ হাজার, বেলজিয়ামে ছয় হাজার, সুইজারল্যান্ডে পাঁচ হাজার, ব্রাজিলে ২৫ হাজার, চীনে ১৫ হাজার, ইন্দোনেশিয়ায় ২০ হাজার, নিউজিল্যান্ডে আড়াই হাজার, রাশিয়ায় ছয় হাজার, তুরস্কে পাঁচ হাজার, সাইপ্রাসে সাত হাজার প্রবাসীসহ মোট ৪০টি দেশে এক কোটি ৪০ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩৪ প্রবাসী এনআইডি পাননি।

এ বিষয়ে সদ্য সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটা স্থগিতও নয়, আবার চলমানও নয়। কোভিড পরিস্থিতিতে এটি নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়নি। কোভিড পরিস্থিতি যখন পরিবর্তিত হবে, যখনই আমাদের লোকজন গিয়ে ওখানে কাজ করার অনুমতি পাবে, তখন হয়তো পরবর্তী কমিশন এসে এগুলো চিন্তাভাবনা করবে। প্রবাসী যারা অনলাইনে আবেদন করছেন, তাদের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে গেলে আমাদের একটা টিমকে পাঠাতে হবে সেই দেশগুলোতে। অনলাইনে আবেদনের ওপর ভিত্তি করে যদি দেখা যায় যে, একটা টিম পাঠিয়ে এটা করা যাবে, তখনই কমিশন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অনলাইনে টিম পাঠানোর মতো সাড়া পাওয়া যায়নি। আবার যেসব জায়গা থেকে অনলাইনে আবেদন পাওয়া গেছে সেসব জায়গায় টিম পাঠিয়ে এই কার্যক্রম শুরুর জন্য অনুমোদনের যে প্রক্রিয়া আছে, সেটা কোভিডের জন্য স্থগিত হয়ে আছে।


poisha bazar