নির্বাচন কমিশন নিয়োগ বিল রবিবার সংসদে উত্থাপন

চলতি অধিবেশনেই পাশের সম্ভাবনা


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৩:০১

নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে প্রচলিত ‘অনুসন্ধান কমিটি’ আইনি ভিত্তি পাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে এ সংক্রান্ত আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে দ্রুততম সময়ে সংসদে পাসের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এই কমিটির সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে চলমান সংলাপ শেষ করে বঙ্গভবন এখন অপেক্ষা করছে জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সংবিধান নির্দেশিত পথ অনুসরন করে আইনি কাঠামোতে গঠিত হবে নির্বাচন কমিশন।

সরকার ও সংসদ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী রবিবার ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ শিরোনামের এই বিলটি জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে উত্থাপন করা হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটি সংসদীয় কমিটি যাচাই-বাছাই করে দিলে সপ্তাহান্তেই বিলটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর রাষ্ট্রপতি অনুমোদন করলেই বিলটি রূপান্তর হবে আইনে। তারা জানান, পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী মাসের প্রথমার্ধেই নতুন আইনের মাধ্যমে ইসি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। তারা আশা করছেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষের আগেই নতুন ইসি নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।

ইসি নিয়োগে আইন এবার সম্ভবপর হচ্ছে না— রাষ্ট্রপতির সংলাপ শুরুর আগে এমনই বলেছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সংলাপে আইন করার দাবিটি জোরেশোরে উঠার পর চিত্র গেছে বদলে। সংলাপে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সবাই প্রস্তাব তুলেন সংবিধান নির্দেশিত আইন করার। অনুযোগ করে যারা সংলাপে যাননি তারাও চিঠি এবং বিভিন্ন মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে একই দাবি তুলেন। এছাড়া সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও গণমাধ্যমসহ নানা প্লাটফর্মে ইসি গঠনে আইন করার দাবি জানিয়েছে আসছিলেন। এ প্রেক্ষিতে সংলাপের শেষদিনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনাকালে রাষ্ট্রপতি উপস্থিত প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারে থাকা প্রতিনিধি দলের সদস্যদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন। তাত্ক্ষণিকভাবেই সরকারপ্রধান এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব জানিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে আশ্বস্ত করেন। এদিনই সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নতুন আইন হচ্ছে বলে ঘোষণা দেন। আর সংসদে উঠলে আইনটি পাসে যে দেরি হবে না, সেই ইঙ্গিতও দেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইনটি দ্রুততম সময়ে পাসের জন্য প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। আগামী সপ্তাহেই তা সংসদে তোলা হবে এবং তা পাস করে তার অধীনেই আসবে নতুন ইসি। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ চলতি অধিবেশনেই উত্থাপন হবে। আগামী রবিবার বিলটি সংসদে উঠছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ অধিবেশনেই আইনটি পাস হবে, এবং এ আইনের অধীনেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন হবে।

এদিকে এতো দ্রুত আইন পাস করা সম্ভব হবে কিনা—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংসদে কোনো বিল উত্থাপন হলে সাধারণত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। সেজন্য কমিটিকে সময় দেয়া হয়। সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন আসার পর সংসদে তা নিয়ে আলোচনা শেষে পাস হয়। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে দ্রুত আইন পাসের নজিরও রয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সরকারের পক্ষে কোনো আইন পাস করিয়ে নেয়া সহজ। তারা জানান, দুই মাস আগে উচ্চ আদালতের বিচারকদের ভাতা বাড়ানোর আইন দুই দিনেই পাস হয়েছিল। গত ২৭ নভেম্বর বিলটি সংসদে তোলার পর ২৮ নভেম্বরই পাস হয়। এটি সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়নি। এমন আরো নজির আছে। এটিও সেভাবেই হবে।

সাংবিধানিক সংস্থা ইসিতে কমিশনার নিয়োগের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। আর তা একটি আইনের অধীনে হবে—এমন বিধানই রয়েছে সংবিধানে। কিন্তু সেই আইন না হওয়ায় প্রতিবারই ইসি গঠনের সময় শুরু হয় বিতর্ক। তা এড়াতে ২০১২ সালে নিয়োগের সময় তত্কালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান অনুসন্ধান কমিটি নামে একটি মধ্যস্থ ফোরাম তৈরি করেন। এই পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একজন বিচারপতির নেতৃত্বে বিশিষ্ট কয়েকজন নাগরিকদের নিয়ে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেন তিনি। ওই কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের জন্য যোগ্যদের নামের একটি তালিকা তৈরি করেন। সেই তালিকা থেকে একজন সিইসিসহ অনধিক পাঁচজন কমিশনার নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। ২০১৭ সালে মো. আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতির পদে আসার পর জিল্লুর রহমানের সেই পদ্ধতিই অনুসরণ করেন। এবারো একই পদ্ধতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু সংলাপে অংশ নেয়া ২৫টি দলের প্রায় সবই ইসি গঠন নিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আইন প্রণয়নের উপরই জোর দেয়। আলোচনায় রাষ্ট্রপতিও এ বিষয়ে সম্মত হন। সংলাপের শেষ দিন সোমবার আইন পাসের প্রস্তাব নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বঙ্গভবনে যাওয়ার আগেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত হয় খসড়া আইন।

আইন হবে সংক্ষিপ্ত; বিধিতে থাকবে সব: কি থাকছে আইনে, কেমন হবে এই আইন—এমন প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে আলোচনায়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, আইনটি খুবই সংক্ষিপ্ত হবে। তবে বিধি প্রণয়ন করা হবে। আর বিধিতেই থাকবে বিস্তারিত সব। এখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দানের জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট সুপারিশ প্রদানের নিমিত্তে একটা অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটির দায়িত্ব ও কার্যাবলি আইনে বলা থাকবে। কমিশনার নিয়োগের জন্য এই কমিটি যোগ্য প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, কেউ একবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে মেয়াদ পূর্ণ করলে আবার ওই পদে যেতে পারবেন না। তবে কেউ আগে নির্বাচন কমিশনার পদে থাকলে পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হতে পারবেন। দায়িত্ব পালন করে যাওয়া নির্বাচন কমিশনাররা এই আইনের আওতায় আসবেন জানিয়ে তিনি বলেন, যেহেতু এর আগে আইন ছিল না, ইতোপূর্ব যেসব ইলেকশন কমিশন গঠন করা হয়েছে, সেগুলো এ আইনের অধীনেই করা হয়েছে বলে ধরে সেগুলোকে হেফাজত করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে স্বাধীনতার পর থেকে নিয়োগ পাওয়া ১২ জন সিইসি ও ২৭ জন নির্বাচন কমিশনার এ আইনের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন বলে বিবেচিত হবে।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, প্রস্তাবিত এ আইনে যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। আইন হওয়ার পরে বিধিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন হলে তখন দেখা যাবে। তবে আইনেই বিস্তারিত বলে দেয়া হবে। বিধি লাগবে না, আইনের মধ্যে সব থাকবে। কয়েকটি জায়গা খসড়া সংক্রান্ত যেসব প্রস্তাব দিয়েছিল-সব কিছু কনসিডার করেছি। যেটা সংবিধান আমাদের পারমিট করে সেটাই রাখা হয়েছে। অনুসন্ধান কমিটিসহ সার্বিক বিষয়গুলো আইনে ডিফাইন করা হয়েছে। তিনি জানান, সিইসি ও ইসির নামের সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে দেয়ার জন্য আইনে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি থাকবে। নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নারী সদস্যের কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হচ্ছে না আইনে; এটা উন্মুক্ত থাকছে।

কাদের নিয়ে ইসি: প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনে বলা হয়েছে— তাদের বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে; কমপক্ষে ৫০ বছর বয়স হতে হবে; গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-আধা-সরকারি, বেসরকারি বা বিচার বিভাগীয় পদে কমপক্ষে ২০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে; কোনো আদালতের মাধ্যমে অপ্রকৃতস্থ ঘোষিত ব্যক্তি, দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পরে দায়মুক্ত না হওয়া ব্যক্তি, বিদ্যমান নিয়মের বাইরে অন্য কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিলে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণাকারী ব্যক্তি, নৈতিক স্খলনজনিত কারণে ফৌজদারি আইনে দুই বছর কিংবা ততোধিক সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডিত ব্যক্তি এবং প্রজাতন্ত্রের লাভজনক কোনো পদে অধিষ্ঠিত থাকা ব্যক্তি এই পদে আসতে পারবেন না।

প্রচলিত নিয়মেই অনুসন্ধান কমিটি: প্রচলিত নিয়েমেই অনুসন্ধান কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক এই কমিটির চেয়ারম্যান হবেন। প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি), পিএসসি চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিক এই কমিটির সদস্য হবেন। বর্তমান ইসি নিয়োগের আগে ২০১৭ সালেও ৬ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের এই কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মাসুদ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শিরীন আখতার। এরআগে ২০১২ সালে গঠিত অনুসন্ধান কমিটি ছিল চার সদস্যের। আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন নেতৃত্বাধীন ওই কমিটির অন্য তিন সদস্য ছিলেন হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান, পিএসসি চেয়ারম্যান এটি আহমদুল হক চৌধুরী ও মহাহিসাব নিরীক্ষক আহমেদ আতাউল হাকিম।


poisha bazar


ads