ইভিএম অনভ্যস্ততায় শ্লথগতি


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০২

কেন্দ্র নিরাপত্তা, ভোটের পরিবেশ, ভোটগ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশ— সব কিছুতেই সর্বমহলের সন্তুষ্টি অর্জন হওয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনকে ‘অবিস্মরণীয়’ করে রাখবে সন্দেহাতীতভাবে। করিত্কর্মা স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা এবং সর্বোপরি নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচন উপহার দেয়ার প্রচেষ্টা স্থাপন করেছে অনন্য নজির। ভোটবিমুখ ভোটারদের কেন্দ্রে টানার বিষয়টিও পর্যবেক্ষক মহলের কাছে পেয়েছে প্রশংসা। তবে ‘এক ঘামলা পানিতে এক ফোঁটা চুনি’ পড়ার মতোই ভোটকে ‘দুষণীয়’ করে তুলে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। এই মেশিনে অনভ্যস্ততার কারণে ভোটগ্রহণে শ্লথগতি হওয়ায় আশানুরূপ ভোটার উপস্থিতিকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা যায়নি। ভোট না দিয়েই ফিরে গেছেন অনেকে। যে কারণে উত্সবমূখর এই নির্বাচনে ভোট পড়ে মাত্র ৫০ শতাংশ।

বিষয়টি নিয়ে ভোটাররা যেমন নাখোশ তেমনি ক্ষুব্ধ প্রার্থীরাও। অক্ষেপ রয়েছে নির্বাচন কমিশনেরও। তবে কমিশন সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভোটারদের দোষেই ভোটগ্রহণ দোষী হয়েছে। মক ভোটিংয়ে নারী ভোটাররা অংশ নেয়া থেকে বিরত ছিলেন, অথচ ভোটের দিন সেই নারীদেরই বেশি উপস্থিতি ছিল। কিন্তু ইভিএম সম্পর্কে ধারণা না থাকায় সঙ্গত কারণেই মেশিনে ভোট দিতে সমস্যায় পড়েছেন তারা। আর শিখিয়ে-পড়িয়ে ভোট দেয়াতে গিয়েই শ্লথ হয় ভোটগ্রহণ।

ইসি সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার ইভিএমের কারণে ভোট দেয়ায় ধীরগতি সম্পর্কে বলেন, নারায়ণগঞ্জে মক ভোটিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু নারী ভোটাররা সেখানে আসেননি। যার ফলে ভোট প্রদান সম্পর্কে তাদের লাইনে দাঁড়িয়ে বুঝিয়ে দিতে হয়েছে। ওইখানে হয়তো একটু সময় লেগেছে। তবে যারাই এসেছেন সবার ভোটগ্রহণ করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হওয়ায় খুব দ্রুত ফলাফল পাওয়া যাবে বলে জানান ইসি সচিব।

২০১১ সালের নির্বাচনে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ হলেও এবারই প্রথম রাজধানীর উপকণ্ঠের এই নগরীর নির্বাচনে ১৯২ কেন্দ্রের সব ক’টিতেই ভোটগ্রহণ করা হয় ইভিএমে। এ সিটির ২৭টি ওয়ার্ডের এক হাজার ৩৩৩টি বুথে একযোগে ভোট হয় যন্ত্রে। অবশ্য ভোট দেয়ার বিষয়টি অধিকাংশের জন্য ছিল নতুন এক অভিজ্ঞতা। যে কারণে অনেক ভোটারই বঞ্চিত হয়েছেন নাগরিক অধিকার প্রদান করা থেকে। এ নিয়ে ভোটের দিনই মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মূল দুই প্রার্থী সেলিনা হায়াত্ আইভী ও তৈমুর আলম খন্দকার উষ্মা প্রকাশ করেন। ভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী আইভী সবার ভোট নিশ্চিত করতে ভোটদানে গতির বাড়ানোর তাগিদ দেন। একই বক্তব্য দেন তৈমুরও। কেন্দ্র পরিদর্শন করে কোথাও কোথাও ভোটারের উপস্থিতি কম দেখে গণমাধ্যমের কাছে বলেন, ‘ইভিএম-ভীতির কারণে’ মানুষ কম আসছে।

এদিকে গতকাল সোমবার ভোটের পরদিন পৃথক প্রতিক্রিয়ায় একই অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন এই দুই প্রার্থী। টানা তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হওয়া সেলিনা হায়াত্ আইভী ইভিএমে ভোটগ্রহণের ‘শ্লথ গতি’ নিয়ে নিজের ‘অসন্তুষ্টির‘ কথা জানিয়ে বলেন, এর প্রভাব ভোটের হারে পড়েছে। তিনি বলেন, ইভিএম নতুন টেকনোলজি, একটু প্রবলেম হতে পারে। আমি প্রথম থেকেই বলেছি, ভোট স্লো ছিল। ভোট একটু কম হয়েছে। নদীর ওপারের আমার নারী ভোটাররা ঠিকমতো ভোট দিতে পারেনি। পার্সেন্টেজটা হয়তো একটু বেশি হতো। ইভিএম আরেকটু ফার্স্ট হলে ভালো হতো। ভোটের হার বেশি হতো।

নিজ বাসায় সাংবাদিকদের কাছে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করতে গিয়ে আইভী বলেন, এই জয়ে মানুষের প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ। পাঁচ বছর মানুষের খেদমত করতে পারব। যে মেগা প্রজেক্টগুলো চলছে সেগুলো শেষ করতে পারব, কাজ করতে পারব। আগামী দিনে নগর পরিষদ চালাতে গিয়ে সবার পরামর্শ ও সহযোগিতা নেবেন বলেও জানান আওয়ামী লীগের এই নেত্রী। এ সময় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী তৈমুর আলম খন্দকারের পরামর্শও নেবেন বলে জানান। নির্বাচনের দিনের আরেকটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইভী বলেন, নারী ভোটকক্ষগুলো দোতলা-তিন তলায় দেয়া হয়েছে। এটা ঠিক হয়নি। নারীরা, বয়স্করা আমাকেই ভোট দেয় সব সময়। আমার ভোট-ব্যাংকে কেউ হানা দিল কি-না খুঁজে দেখতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার বিষয়ে আইভী বলেন, এখন তো কোভিডের সময়। তিনি যেদিন সময় দেবেন, সেদিনই যাব।

ইভিএমের সমালোচনায় আরেক ধাপ এগিয়ে থাকা তৈমুর আলম খন্দকার যন্ত্রটিকে ভোট ডাকাতির বাক্স বলে অভিহিত করেন। গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ভোটের সময় ইভিএমে ভোটগ্রহণে ‘স্লথ গতি’ এবং মেশিন অকেজো হওয়ার অভিযোগ এনে বলেন, ‘ভোটে মানুষ ছিল, কিন্তু ইভিএম মেশিন স্লো ছিল। এতই স্লো ছিল যে, ভোটার টানতে পারে নাই। মানুষ লাইনে দাঁড়াইয়া বিরক্ত হয়ে ভোটার স্লিপ ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেছে। অনেক জায়গায় হ্যাঙ হইয়া পইড়া ছিল, অনেক জায়গায় ওপেন হয় নাই। আমি আগে বলেছি, ইভিএম একটা চুরির বাক্স, এখন বলছি এটা ডাকাতির বাক্স।’ এর আগে নির্বাচনের পর রাতে এক তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভোটে পরাজয়ের কারণ হিসেবে ‘প্রশাসনিক ও ইভিএমের কারচুপির’ কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

ইভিএম ভোট দিতে না পারা ভোটারদের বেশ কয়েকজন জানান, ইভিএমে শ্লথ গতি তো ছিলোই, ব্যবস্থাপনায়ও সমস্যা ছিল অনেক। এ সমস্যার কারণেও অনেকে কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ভোট দিতে না পেরে ফিরে গেছেন। একটি বুথের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার মোহাম্মদ বাদশা বলেন, ভোটাররা ভোট দিতে গিয়ে অনেক সময় নিয়ে নিচ্ছেন। আমরা বাইরে থেকে বলে দেয়ার পরেও তারা বুঝতে পারছেন না। যে কারণে ভোটে শ্লথ গতি হয়েছে। তবে যারা মেশিনের বিষয়টি বুঝেছেন তাদের অনেকে আবার এক মিনিটের মধ্যে ভোট কাস্ট করে চলে গেছেন। অপর একটি বুথের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা রিয়াদুল ইসলাম বলেন, আঙ্গুলের ছাপ না মিললে শতকরা এক শতাংশ ভোটারের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থায় ভোট গ্রহণের নিয়ম আছে। কিন্তু আমার বুথে অধিকাংশই ছিলেন বয়স্ক ভোটার। অনেকরই আঙ্গুলের ছাপ মিলছে না। এ কারণে ভোটগ্রহণে অনেক বিলম্ব হয়েছে।


poisha bazar


ads