নাসিক নির্বাচন

দুই প্রার্থীই বিজয়ে আশাবাদী


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১৫ জানুয়ারি ২০২২, ১৪:০৩,  আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২২, ১৪:০৭

ঘটনাবহুল দুই সপ্তাহের প্রচারযুদ্ধ শেষ হয়েছে গতকাল শুক্রবার মধ্যরাতে। আজকের রাতটা ঘুচলেই উদিত হবে ভোটের রবি। রাজধানী লাগোয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) এই ভোটকে ঘিরে এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে সব প্রস্তুতি। এখন শুধু ভোটের অপেক্ষা। নগরীর ১৯২টি কেন্দ্রে আজকের মধ্যেই পৌঁছে যাবে নির্বাচনী সরঞ্জাম। যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে নগরীতে গড়ে তোলা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা বলয়। মাঠে নেমেছে আইশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর পাঁচ হাজারেরও বেশি সদস্য। এ ছাড়া নির্বাচনী অনিয়ম ঠেকাতে জুডিসিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা রয়েছেন সর্বক্ষণিক দায়িত্বে।

এদিকে সুষ্ঠু, আবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থা নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন চায়-নিজেদের শেষ সময়ে এসে একটি ‘ভালো নির্বাচন’ উপহার দিয়ে ভালোয়-ভালোয় বিদায় নিতে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপের সময় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও উত্তাপ বাড়ছে। এটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন হলেও এতে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ বিরাজ করছে। নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচনি এলাকায় সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বহিরাগতদের অবস্থানসহ যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

নাসিক নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ অনুষ্ঠান করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে ইসি। সিইসি কেএম নূরুল হুদা বলেছেন, ভোটারের চেয়েও কেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য থাকবে বেশি। তিনি ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করে বলেছেন, সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ভোটগ্রহণ ও ভোটারদের নিরাপত্তায় মাঠে রয়েছে ৫ হাজারেরও বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।

এই নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন প্রার্থী হলেও মূল লড়াই হবে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী এবং বিএনপি থেকে পদ খোয়ানো স্বতন্ত্র হাতি মার্কার প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের মধ্যে। জাতীয় পার্টি নাসিক নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। তবে দলটি সরাসরি কাউকে সমর্থনও দেয়নি।

জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হেভিওয়েট দুই প্রার্থীই: নিজেদের জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী হেভিওয়েট দুই প্রার্থী। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার গতকাল শুক্রবার পৃথক পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সম্মেলনে দুজনই দাবি করেছেন সুষ্ঠু ভোট হলে নিজেরাই জিতবেন। জয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করে তৈমুর বলেন, ৫০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দেখে এবং গত ১৮ বছরের সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বের প্রতি মানুষের ‘ক্ষোভের কারণে’ ভোটাররা তাকেই নির্বাচিত করবেন। এ সময় তিনি নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেন। অন্যদিকে আইভীও বলেছেন, তার জয়ের বিষয়ে কোনো ধরনের শঙ্কা নেই। আর সে কারণেই নির্বাচন প্রভাবিত করার তার কোনো দরকারও নেই। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জনগণ তার সঙ্গে আছে এবং তাকেই নির্বাচিত করবে। আইভী বলেন, যখন শহরে কেউ ছিল না তখন নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে নির্বাচন করেছি আপনারা লাখো ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন। ২০১৬ সালেও আপনারা একই কাজ করেছিলেন। এ নৌকা আইভীর নৌকা, বিজয়ের নৌকা, বঙ্গবন্ধুর নৌকা। এ নৌকাকে রোধ করার ক্ষমতা কারো নেই।

সহিংসতার শঙ্কা; সহনশীল হওয়ার পরামর্শ ইসির: ভোট ঘিরে সহিংসতা হতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মূল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীই। তৈমুরের আশঙ্কা, ভোটে যেভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে তা অব্যাহত রাখলে এবং কারচুপির চেষ্টা করা হলে যে কোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। একই আশঙ্কা আইভীরও। তবে তিনি সহিংসতা চান না জানিয়ে সুষ্ঠু ভোট সম্পন্ন করার লক্ষ্যে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। প্রধান দুই প্রার্থীর সহিংসতার এমন আশঙ্কার প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন সবাইকে সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তার বলেন, ‘সহিংসতা ঘটলে তো বড় দুই প্রার্থীই ঘটাবেন। তারা যদি আইনি বিষয়গুলো মেনে চলেন, নির্বাচন কমিশনের বিষয়গুলো যদি মেনে চলেন, তাহলে আর সহিংসতার ঘটনার আশঙ্কা থাকে না। আমি সব প্রার্থীর প্রতি অনুরোধ করব, নিজের কাজে সচেতন হবেন, আইনের প্রতি সহনশীল হবেন।’

নগরজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয়; অতিগুরুত্বপূর্ণ ১৯২ কেন্দ্রে বিশেষ নজর: সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে নারায়ণগঞ্জের পুরো শহর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। নগরীর ১৯২টি কেন্দ্রের প্রতিটিকেই অতিগুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গতকাল শুক্রবার থেকে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জে। বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দারাও মাঠে নেমেছেন। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেয়া হয়েছে। নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শুক্রবার থেকে ১৪ প্লাটুন বিজিবি মাঠে নেমেছে। আগামীকাল রবিবার ভোট গ্রহণের দিন দায়িত্বে থাকবে বিজিবির ২০ প্লাটুন সদস্য। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নাসিকের ২৭টি ওয়ার্ডে নির্বাহী ও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে ৩০টি মোবাইল কোর্ট কাজ করবে। পাশাপাশি প্রতি ওয়ার্ডে র্যাবের একটি করে টিম কাজ করবে।

এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মাদ জায়েদুল আলম জানান, ভোটের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রাখতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সুযোগ দেয়া হবে না। তিনি বলেন, ১৯২টি ভোট কেন্দ্রকেই অতিগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। মোতায়েন থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত পাঁচ সহস্রাধিক সদস্য। ভোটের দিন পুলিশের ৩ হাজার সদস্য, এ ছাড়া ২০০ প্লাটুন আর্মড পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।

মাঠে আছে ‘রোবোকফ’: পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম জানান, ভোটের দিনে অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে মাঠে থাকবে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের বিশেষ বাহিনী ‘রোবোকফ’। তিনি বলেন, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গেলে স্ট্রাইকিং ফোর্সের পাশাপাশি বিশেষায়িত এই বাহিনী তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এক কথায় বলতে গেলে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ শতভাগ প্রস্তুত।
যত ভয় কাউন্সিলর প্রার্থীদের ঘিরেই: একাধিক স্থানীয় ভোটার, দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এবারের নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের নিয়ে তেমন কোনো শঙ্কা না থাকলেও কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে ভয়-শঙ্কা আছে। নগরীর টানবাজার এলাকার সরকারদলীয় এক ওয়ার্ড নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ নির্বাচনে বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরকারি দলেরই একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। সেক্ষেত্রে সরকারদলীয় প্রার্থীদের মাঝেই ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা হতে পারে।

প্রার্থী ও ভোটার: এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৭ জন প্রার্থী। এরা হলেন, নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী, হাতী প্রতীকে বিএনপি থেকে পদ হারানো স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, হাতপাখা প্রতীকের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী মা. মো. মাসুম বিল্লাহ, দেয়ালঘড়ি প্রতীকের খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এ বি এম সিরাজুল মামুন, ঘোড়া মার্কা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের বটগাছ প্রতীকের প্রার্থী মো. জসীম উদ্দিন ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির হাতঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী মো. রাশেদ ফেরদৌস। এ ছাড়া সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে রয়েছেন ৩২ জন। প্রায় ২০ লাখ মানুষের এ সিটিতে ভোটার ৫ লাখ ১৭ হাজার ৩৫৭ জন। নারী ভোটার-২ লাখ ৫৭ হাজার ৫১৯ আর পুরুষ ভোটার-২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৩৪ জন।

ইসির অধীনে শেষ বড় নির্বাচন: বর্তমান কমিশনের অধীনে নাসিকই শেষ বড় নির্বাচন। ১৪ ফেব্রুয়ারি এ কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কমিশনারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও শেষ এ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে কমিশন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আমাদের সব অভিজ্ঞতা উজাড় করে এ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। ভোটের দিন সব কিছু মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

ভোট পর্যবেক্ষণে ৯ সংস্থা: নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে ৯টি সংস্থার ৪২ পর্যবেক্ষককে অনুমতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইসির জনসংযোগ পরিচালক এস এম আসাদুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সংস্থাগুলো হল— জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদ (জানিপপ), সার্ক মানবাধিক ফাউন্ডেশন, আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশন, সমাজ উন্নয়ন প্রয়াস, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থা, তালতলা যুব উন্নয়ন সংগঠন, রিহাফ ফাউন্ডেশন, বিবি আছিয়া ফাউন্ডেশন এবং মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থা-মওসুস। তবে পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করতে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা মানার পাশাপাশি এসব সংস্থাকে ভোট শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের শর্ত দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। স্থানীয় সরকারের সামপ্রতিক নির্বাচনগুলোতে সহিংসতা ও অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগের পর নারায়ণগঞ্জ সিটি ভোটের আগের দিন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ উত্সবমুখর পরিস্থিতি দেশে নির্বাচনী পরিবেশ ফেরার আশা জাগিয়েছে পর্যবেক্ষকদের মনে। তারা বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের ভোটে আমরা জাতীয় নির্বাচনের আবহ দেখতে পাচ্ছি। জাতীয় নেতারা মাঠে গেছেন, অথচ কোনো বাধা-হামলা ঘটেনি। প্রচারে এ পর্যন্ত নেতিবাচক তেমন কিছুই দেখিনি। সব মিলিয়ে ইংরেজি নতুন বছরের শুরু জানুয়ারি মাসে ভালো একটি নির্বাচন হচ্ছে বলা যায়।


poisha bazar

ads
ads