লতিফ-জাহাঙ্গীরের পথে মুরাদ


  • সাইফুল ইসলাম
  • ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ১৫:৪৪

মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের পর ‘দলের প্রাথমিক সদস্যপদ ও সংসদ সদস্য’ পদ হারাতে যাচ্ছেন জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মতিয়ার রহমান তালুকদারের ছেলে ডা. মুরাদ হাসান। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গতকাল ই-মেইল যোগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পদত্যাগ পাঠান তিনি। সেই পদত্যাগ পত্রেও ভুল তথ্য উপস্থাপন ছিল দিনব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে পদত্যাগপত্র পাঠানোর পর ফেসবুক পেজে সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন মুরাদ। সেখানে তিনি লিখেছেন— ‘আমি যদি কোন ভুল করে থাকি অথবা আমার কথায় মা-বোনদের মনে কষ্ট দিয়ে থাকি তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।’

এদিকে ডা. মুরাদ হাসানকে গ্রেফতার করে প্রচলিত আইনে তার বিচার করার দাবি জানিয়েছে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। ডা. মুরাদ হাসানের অশ্লীল কথাবার্তার অডিও-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরাতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

জানা গেছে, সম্প্রতি খালেদা জিয়া ও তার নাতনি জাইমা রহমানকে নিয়ে ফেসবুক লাইভ আলোচনায় কুরুচিকর মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচনায় পড়েন ডা. মুরাদ। এরপর সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয় নায়িকা মাহিয়া মাহির সঙ্গে তার আপত্তিকর ফোনালাপ। এর মধ্যেই আরেক ভিডিও আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেত্রীদের নিয়েও তিনি অপমানজনক বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এসব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলে দল ও দলের বাইরে। একপর্যায়ে গত সোমবার রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরেই গতকাল ই-মেইলে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। এতে তিনি লিখেছেন, ‘গত ১৯ মে ২০২১ আমাকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। আমি অদ্য ০৭.১২.২০২১ তারিখ হতে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব হতে ব্যক্তিগত কারণে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে ইচ্ছুক। আমাকে দায়িত্ব হতে অব্যাহতি প্রদানের লক্ষ্যে পদত্যাগ পত্রটি গ্রহণে আপনার একান্ত মর্জি কামনা করছি।’ এই পদত্যাগপত্রে দায়িত্ব প্রদানের সালটি ভুল লিখেছিলেন, তা ছিল ২০১৯। ওই ভুলের কারণে এবং ই-মেইলে পাঠানোয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তা ফেরত পাঠায়। পরে ভুল সংশোধন করে ‘হার্ড কপি’ আকারে দেয়া হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তা গ্রহণ করে।

জেলা আ.লীগ থেকে অব্যাহতি: মন্ত্রিসভার থেকে পদত্যাগের পরপরই জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাকী বিল্লাহ জানান, ‘দলীয় ভাবমূর্তি বিনষ্ট, অগঠনতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ডা. মো. মুরাদ হাসানকে অব্যাহতির এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দলীয় গঠনতন্ত্রের ৪৭(৯) ধারা মোতাবেক ডা. মুরাদকে অব্যাহতি প্রদান করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নিকট চিঠি পাঠাবে জেলা আওয়ামী লীগ।’

সাংগঠনিক ব্যবস্থা
ডা. মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ। তিনি বলেন, ‘মুরাদ হাসানকে এরইমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে দলের আগামী কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সুপারিশ করা হবে।’ কেন্দ্র থেকেও প্রাথমিক সদস্যপদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বলেছেন, দলীয় ফোরামের পরবর্তী সভায় বিষয়টি তোলা হবে।

সংসদ সদস্যপদের বিষয়ে সংবিধান: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেন অনুযায়ী কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।

গ্রেফতার ও বিচার দাবি: গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডা. মুরাদ হাসানকে গ্রেফতার করে প্রচলিত আইনে বিচার দাবি করেছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, এই ধরনের ব্যক্তির রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। সে যে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলেছেন, সেজন্য তাকে রাজনীতি করার অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। তাকে সবপর্যায় থেকেই সরিয়ে দিতে হবে এবং প্রচলিত আইনে তার বিচার করতে হবে।

অশ্লীল কথাবার্তার অডিও-ভিডিও সরাতে নির্দেশ: তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ হারাতে যাওয়া ডা. মুরাদ হাসানের অশ্লীল কথাবার্তার অডিও-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরাতে গতকাল নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের আবেদনে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ মৌখিক এই নির্দেশ দেন। মুরাদ হাসানের বিষয়টি আদালতের নজরে এনে ব্যারিস্টার সুমন বলেন, মুরাদ হাসানের ওই কথাবার্তা এত অশ্লীল যে কোনো শিশু যদি তা শোনে, তাহলে তাদের মনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থেকে গেলে তা হবে সবার জন্য বিব্রতকর। এরপর আদালত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমারকে বলেন বিটিআরসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে ওই অডিও-ভিডিওগুলো সরানোর পদক্ষেপ নিতে। একইসঙ্গে এ বিষয়ের অগ্রগতি আগামীকাল (আজ) আদালতকে জানাতে বলেন।


poisha bazar

ads
ads