রাজনীতির নতুন দুয়ার বন্ধ


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ২৪ নভেম্বর ২০২১, ১৩:১১,  আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২১, ১৬:১৬

ওয়ান ইলেভেনের সময় থেকে প্রতিটি নির্বাচন কমিশন (ইসি) নতুন নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন দিয়ে এলেও কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন নিজেদের মেয়াদ পার করেছে রাজনীতির নতুন দুয়ার বন্ধ রেখেই। ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন ৭৬টি রাজনৈতিক দল ইসিতে নিবন্ধনের আবেদন করে। কিন্তু নিবন্ধন মেলেনি একটিরও। উল্টো আগে নিবন্ধন পাওয়া ৪টি দলের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইসির ওপর ত্যক্ত-বিরক্ত রাজনীতিকদের কেউ কেউ আদালতের দ্বারস্থও হয়েছেন। এতেও দমেনি ইসি। আদালতের আদেশে দুটি দলকে নিবন্ধন দিতে বাধ্য হলেও বাকিগুলোর বিষয়ে এ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।

নিবন্ধনের পথ কঠিন করে রাজনীতির নতুন দুয়ার বন্ধ রাখার এই বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধিকার কর্মীরা। রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কঠোর অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করে নতুন দলের নিবন্ধনের পথ কঠিন করে ফেলা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তারা। তবে ইসির দাবি, নতুন দলগুলোর কেউই শর্ত পূরণ করতে না পারায় নিবন্ধন পায়নি। এতে কমিশনের কিছু করার ছিল না।

বর্তমানে দেশে ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে। এদের অধিকাংশেরই নিবন্ধন মিলেছে ২০০৮ সালে দেশে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পদ্ধতি চালু হওয়ার পরই। ইসির তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ৪৪টি দল ইসিতে নিবন্ধন পায়। এর মধ্যে ২০০৮ সালে নিবন্ধন পায় ৩৯টি। এ ছাড়া ২০১৩ সালে দুটি এবং বাকি দুটি দল নিবন্ধন পায় ২০১৯ সালে। তবে আদালতের আদেশ ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) শর্ত প্রতিপালনে ব্যর্থ হওয়ায় এদের মধ্যে ৫টি দলের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে ৪টির নিবন্ধন বাতিল হয় বর্তমান কে এম নূরুল হুদা কমিশনের সময়ে। এ ছাড়া নিবন্ধন পাওয়ার পর স্থায়ী গঠনতন্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এক বছরের মাথায়ই ফ্রিডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল করা হয়।

ওয়ান ইলেভেনের সময় এ টি এম শামসুল হুদা কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে নির্বাচনে অংশ নিতে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাধ্যবাধতামূলক করা হয়। ওই আইন অনুযায়ী, ইসিতে আবেদন সাপেক্ষে শর্তপূরণ করলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধন দেয়া হয়। ওই সময় জমা পড়া ১১৭টি রাজনৈতিক দলের আবেদন যাচাই-বাছাই করে ৩৯টি দলকে নিবন্ধন দিয়েছিল তত্কালীন ইসি। নিবন্ধন দেয়ার সময় দলগুলোকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে স্থায়ী গঠনতন্ত্র জমাসহ আরো কিছু শর্ত পালনের নির্দেশনা দেয়া হয়।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আবেদনের পর যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচন কমিশন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে (এলডিপি) প্রথম নিবন্ধন দেয়। এ দলটিকে ২০০৮ সালের ২০ অক্টোবর নিবন্ধন দেয়া হয়। তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে এলডিপির আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর। জাতীয় পার্টি (জেপি) নিবন্ধন পায় ২০০৮ সালের ২০ অক্টোবর। জেপি ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন একসঙ্গে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেয়। এ দফায় নিবন্ধন পায় বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল)। ওই দিন নিবন্ধন পায় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নিবন্ধন পায় ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর। একই দিনে নিবন্ধন পায় ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলও (বিএনপি) নিবন্ধন পায় এই দিনে।

গণতন্ত্রী পার্টি ইসির নিবন্ধন পায় ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর। একই দিনে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফ্ফর) বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, প্রয়াত এইচএম এরশাদ প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর নিবন্ধন পায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নিবন্ধন নম্বর ছিল ০১৪। উচ্চ আদালতের আদেশে ২০১৩ সালে দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। পরে ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর দলটির নিবন্ধন স্থায়ীভাবে বাতিল করে ইসি।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ইসির নিবন্ধন পায় ২০০৮ সালের ৯ নভেম্বর। একই দিনে নিবন্ধন পায় জাকের পার্টি। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলও (বাসদ) ৯ নভেম্বর নিবন্ধন পায়। একই দিনে নিবন্ধন পায় বাংলাদেশের জাতীয় পার্টি (বিজেপি), বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন। বাংলাদেশ খেলাফল আন্দোলন নিবন্ধন পায় ২০০৮ সালের ১৩ নভেম্বর। একই দিনে নিবন্ধন পায় বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, গণফোরাম, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- বাংলাদেশ ন্যাপ ও গণফ্রন্ট। ওয়ান ইলেভেনে কিং পার্টিখ্যাত প্রগ্রেসিভ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি) ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর পরই নিবন্ধন পায়। ওই বছর ১৩ নভেম্বর নিবন্ধন পাওয়া দলটি নির্বাচন কমিশনের শর্ত প্রতিপালনে ব্যর্থ হওয়ায় বর্তমান কমিশন এ দলের নিবন্ধন বাতিল করেছে।

২০০৮ সালের ১৬ নভেম্বর ইসির নিবন্ধন পায় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি। একই দিনে নিবন্ধন পেয়েছিল ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন। তবে ইসির শর্ত পূরণ না হওয়ায় ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর এ দলের নিবন্ধন বাতিল করে বর্তমান কমিশন। ওই দিনই নিবন্ধন পায় ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ইসির নিবন্ধন পায় ২০০৮ সালের ১৭ নভেম্বর। একই দিনে নিবন্ধন পায় ইসলামী ঐক্যজোট। ২০০৮ সালের ২০ নভেম্বর ইসি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে নিবন্ধন দেয়। একই দিনে ইসির নিবন্ধন পায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, খেলাফত মজলিশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট। ২০০৮ সালের ২০ নভেম্বর নিবন্ধন পেয়েছিল জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা। তবে শর্ত পূরণ করতে না পারায় নির্বাচন কমিশন গত বছরের ৩১ মার্চ জাগপার নিবন্ধন বাতিল করে।

নবম সংসদ নির্বাচনের আগে সর্বশেষ দল হিসেবে ইসির নিবন্ধন পেয়েছিল বাংলাদেশ ফ্রিডম পার্টি। তবে নিবন্ধন পেতে ইসির শর্তানুসারে এক বছরের মধ্যে পার্টির সংধোশিত গঠনতন্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১০ সালে ফ্রিডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল হয়। ২০১৩ সালের ২ জুন নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন পায় বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল)। একই বছর ৮ অক্টোবর ইসি থেকে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট) নিবন্ধন পায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (বিএনএফ) ইসির নিবন্ধন পায় ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর।

বর্তমান কে এম নূরুল হুদা কমিশনের সময় ৭৬টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পেতে আবেদন করেছিল। এর মধ্যে কোনো দলই ইসির চূড়ান্ত বিবেচনায় নিবন্ধন পায়নি। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা দলগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ও বাংলাদেশ কংগ্রেসে উচ্চ আদালতের নির্দেশে নিবন্ধন পায়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এনডিএমকে ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি ও বাংলাদেশ কংগ্রেসকে ২০১৯ সালের ৯ মে ইসি নিবন্ধন দেয়।

রাজনীতির নতুন দুয়ার না খোলার বিষয়ে দল নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর দিকের সময়ে নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন বলেন, সবার মতামত নিয়েই তখন নিবন্ধনের শর্তগুলো ঠিক করা হয়েছিল। নতুন দল এবং স্বাধীনতার পর বিদ্যমান দলের কথা বিবেচনা করে ৩টি শর্তের একটি পূরণের জন্য বলা হয়েছিল তখন। সবার জন্য সমান সুযোগ থাকতে হবে; আগে যারা নিবন্ধিত হয়েছে এবং সামনে যারা হবে, সবার জন্যই।

নতুন দলের নিবন্ধনের পথ রুদ্ধ করা বা বেশি কঠিন করা ঠিক হবে না জানিয়ে সাবেক এই আমলা বলেন, নিবন্ধনটা সহজ রাখাই উচিত। দল ইসির কাছে নিবন্ধন পেলেই সব হয়ে গেল এমন নয়; তারপরে তাকে জনগণের কাছে যেতে হচ্ছে। নিবন্ধন হলে ইসির কাছে দলটি সব বিষয়ে বাধা পড়ে গেল, দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা থেকে শুরু করে হিসাব-নিকাশ পর্যন্ত। তাই দলগুলোকে আইনের আওতায় আনতে সহজ শর্ত আরোপ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।


poisha bazar

ads
ads