লাঠি হাতে হামলাকারী কারা

শিক্ষার্থীদের ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম


  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৪ নভেম্বর ২০২১, ১২:৫৭,  আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২১, ১৬:১৩

দেশের গণপরিবহনে হাফ পাস বা অর্ধেক ভাড়াসহ পাঁচ দফা দাবি মেনে নিতে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে আন্দোলরত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি বাস্তবায়ন না হলে কাল বৃহস্পতিবার থেকে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে বলেও জানিয়েছে তারা।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর ধানমণ্ডির নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাবের সড়ক কর্মসূচি চলাকালে ৫০-৬০ জন তরুণ লাঠিসোটা নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। কিছুক্ষণ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলার পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাস্তা থেকে সরে যায়। সেখানে মিছিল থেকে আইডিয়াল কলেজের এক ছাত্রকে তুলে নেয়ার অভিযোগ মিলেছে। এর প্রায় ৫ ঘণ্টা পর ওই ছাত্র ছাড়া পায়।

প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলাকারীরা কারা? শিক্ষার্থীদের দাবি, হামলাকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এদিকে গত কয়েকদিন ধরে চলা শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। গণপরিবহনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়াসহ ৫ দফা দাবিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও (জাবি) সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গতকাল বেলা ১২টার দিকে তিন-চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ধানমণ্ডির নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাব মোড় এলাকায় সড়ক অবরোধ করে। তারা গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ পাস বা অর্ধেক ভাড়া নির্ধারণ, পরিবহনে নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি বন্ধসহ নিরাপদ সড়কের দাবিতে প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে আন্দোলন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল সায়েন্সল্যাবে সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে। আন্দোলনে বাম সংগঠনের শিক্ষার্থীদেরও দেখা গেছে। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী রাসেল বলেন, আমাদের দাবি হাফ পাস ও নিরাপদ যাতায়াত। আমরা সড়ক ছেড়ে দিয়েছি, সরকার ও বাস মালিকদের ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছি, তারা বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই সময়ের মধ্যে আমাদের দাবি বাস্তবায়ন করবে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে সায়েন্সল্যাব সড়কটি শিক্ষার্থীদের দখলে ছিল। এতে এলিফ্যান্ট রোড, নীলক্ষেত, ধানমণ্ডি, নিউমার্কেট এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এর আগে রাজধানীর বকশীবাজার এলাকায় শিক্ষার্থীরা দ্রুত সরকারের কাজে এই দাবি বাস্তবায়নে প্রজ্ঞাপন জারির অনুরোধ করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিক্ষার্থীরা অন্য যানবাহন ছেড়ে দিলেও কিছু বাস আটকে স্প্রে ও মার্কার দিয়ে তাদের দাবি ও বিভিন্ন স্লোগান লিখে দিচ্ছিলেন। খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে তারা ওই এলাকা প্রদক্ষিণ করছিলেন। ধানমণ্ডি থানার পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম জানান, শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে মিরপুর সড়ক, ধানমণ্ডি, নিউমার্কেট এলাকায় ব্যাপক যানজট তৈরি হয়।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা: গণপরিবহনে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া চালুর দাবিতে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়েছে ঢাকা কলেজের একদল ছাত্র। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা পৌনে দুইটার দিকে ঢাকা কলেজের দিক থেকে ৫০-৬০ জন তরুণ লাঠিসোটা নিয়ে এসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। কিছুক্ষণ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলার পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাস্তা থেকে সরে যায়। হামলাকারী দুর্বৃত্তদের হাতে বড় লাঠি ও রামদা দেখা গেছে। সাধারণ ছাত্রদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে এমন জঘন্য হামলা-আন্দোলনে ঘি ঢেলে দেয়ার শামিল বলে মনে করেন আশপাশের দোকানিরা। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঢাকা কলেজের কিছু শিক্ষার্থীর বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়। পরে তাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। আন্দোলনরত চলে যাওয়ার পর বেলা আড়াইটার দিকে ওই সড়কে যান চলাচল শুরু হয়।

ছাত্রকে তুলে নেয়ার অভিযোগ: আন্দোলনরত এক ছাত্রকে পুলিশের সামনে থেকেই তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মিছিল থেকে আইডিয়াল কলেজের ওই ছাত্রকে ঢাকা কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ওই ছাত্রের বিস্তারিত নাম-পরিচয় জানা জায়নি। জানা গেছে, সায়েন্সল্যাব এলাকায় বেলা ২টার দিকে আন্দোলনের সমাপ্তি টানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে মিছিল নিয়ে নীলক্ষেতের দিকে যাওয়ার সময় হঠাত্ লাঠিসোটা নিয়ে একদল তরুণ এসে ছাত্রদের ধাওয়া করে। এ সময় পুলিশের উপস্থিতিতে আইডিয়াল কলেজের এক ছাত্রকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এর প্রায় পাঁচ ঘণ্টার দেনদরবার শেষে সন্ধ্যা সাতটার দিকে আইডিয়াল কলেজের ছাত্র ছাড়া পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন পুলিশের নিউমার্কেট জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহেন শাহ মাহমুদ।

এর আগে আইডিয়াল কলেজের ১১ জন শিক্ষকের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ আই কে সেলিম উল্লাহ খন্দকারের সঙ্গে দেখা করেন। সেলিম উল্লাহ খন্দকার অবশ্য কোনো ছাত্রকে আটকে রাখা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাব দেননি। তিনি বলেন, ‘আমি ঠিক জানি না, কোনো ছাত্র এখানে আছে কি না। আমার সামনে আইডিয়াল কলেজের শিক্ষকরা আছেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা আছে। তারা বলছে, তাদের একটা মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়েছে।’

তবে আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ জসিমউদ্দীন আহমেদ সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে জানান, তারা ছাত্রটিকে ফিরিয়ে এনেছেন।
একই দাবিতে জাবি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন: গণপরিবহনে হাফ পাস (অর্ধেক ভাড়া), যাত্রী হয়রানি বন্ধসহ পাঁচ দফা দাবিতে মানববন্ধন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল বেলা ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এই কর্মসূচি পালিত হয়। শিক্ষার্থীদের অন্য দাবিগুলো হলো—সর্বনিম্ন ভাড়া পাঁচ টাকা, গণপরিবহনের যাত্রাপথে চেক ও ওয়েবিল বাতিল, বিআরটিএর আইন মেনে গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বন্ধ এবং পরিবহনে শিক্ষার্থী ও যাত্রী হয়রানি বন্ধ করা। মানববন্ধন কর্মসূচিতে ছাত্রনেতা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, সড়ক পরিবহনে নৈরাজ্যে এখন দেশের মানুষ নাকাল। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নেয়া হচ্ছে না। শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের একরকম মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। আমরা এর দ্রুত শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। এ সময় সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া হাসান শিক্ষার্থীদের পক্ষে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা চাই, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গণপরিবহনের চলমান সমস্যার সমাধান করা হোক। তা না হলে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা একত্রে কঠোর আন্দোলনে যাবে। মানববন্ধনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়িয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি জানানোর অনুরোধ করেন। পরে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন শেষে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেন। উপাচার্যের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর স্মারকলিপি গ্রহণ করেন।

চট্টগ্রামেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমাবেশ: আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান জানান, গণপরিবহনে হাফ ভাড়াসহ ৫ দফা দাবিতে চট্টগ্রামে সমাবেশ করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুর ১২টায় নগরীর ২ নম্বর গেট এলাকায় ‘গণপরিবহনে হাফ ভাড়া চাই’ ব্যানারে তারা এই সমাবেশ করে। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো-সড়ক, নৌ ও রেলপথসহ সর্বস্তরে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নিশ্চিত করা, গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দ্রুত বাতিল করা, পরিবহন খাতে শ্রমিকদের ওপর চলমান সকল প্রকার চাঁদাবাজি বন্ধ করা, জ্বালানি তেল ও এলপিজি গ্যাসের দাম কমানো, রাস্তার ধারণক্ষমতা বিবেচনায় ব্যক্তিগত পরিবহন হ্রাস, গণপরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা। সাধারণ শিক্ষার্থী বলেন, গণপরিবহনে হাফ ভাড়ার দাবি নতুন নয়। এটি আমাদের যৌক্তিক দাবি। চট্টগ্রামে তো হাফ পাসের সিস্টেমই নেই। ছাত্ররা বাসে হাফ ভাড়া দিতে গেলে বাসের হেলপার নিতে চায় না। এমনকি তারা বলে ওঠা-নামা করলেই ১০ টাকা দিতে হবে। আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি কামনা করছি। সেটি হলে চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের এই দুর্ভোগ পোহাতে হবে না। পরে দুপুর পৌনে ১টায় ২ নম্বর গেট থেকে একটি মিছিল বের হয়ে জিইসির মোড়ে গিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।

আমিও হাফ ভাড়া দিয়েছি-তথ্যমন্ত্রী: ছাত্রদের হাফ ভাড়ার দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিগুলো বিবেচনা করতে পারে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমি নিজেও হাফ ভাড়া দিয়েছি। তখন অনেক ক্ষেত্রেই হাফ ভাড়া ছিল। গতকাল সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সভাকক্ষে সমসাময়িক বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।


poisha bazar

ads
ads