ফিফা বিশ্বকাপ-২০২২

মেসি জাদুতে টিকে থাকল আর্জেন্টিনা


  • মো. মোজাহিদুল ইসলাম নয়ন
  • ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩:০৯

চলতি বিশ্বকাপের ফাইনাল এখনও বহুদূর। আগামী ২০ ডিসেম্বর। কিন্তু মেসির আর্জেন্টিনার জন্য অবস্থাদৃষ্টে গ্রুপপর্বের ম্যাচগুলিই ফাইনালে রূপ নিয়েছে। প্রথম ম্যাচে অপ্রত্যাশিতভাবে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে তলানিতে থাকা সৌদি আরবের কাছে হেরে যাওয়ায় প্রথমপর্ব থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার বিষয়টিই হয়ে ওঠে পরিসংখ্যানের নানা জটিল হিসাব। গতকালের ম্যাচে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে যখন তারা খেলতে নামে তখন তাদের জন্য ম্যাচটি হয়ে যায় ডু অর ডাই। যদি হারে তাহলে পরের পর্বে যাওয়ার আশা একেবারেই ক্ষীণ হয়ে যাবে। সেই কারণে সমর্থক, ক্রীড়ামোদি সকল দর্শকের কাছে ম্যাচটি ছিল টানটান উত্তেজনার।

ম্যাচটিতে জয় ছাড়া আর কিছু ভাবার নেই আর্জেন্টিনার। এমন ্একটি জটিল কঠিন শর্তে খেলতে নামে মেসি ও তাঁর দল। খেলায় শুরু থেকেই সেই উত্তেজনা এবং প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। মেসি, লাওতারো মার্টিনেজ, ডি মারিয়া, ডি পল, একুইনোকে নিয়ে উইং ও আক্রমণ ভাগ সাজিয়ে মাঠে নামে আর্জেন্টিনা। গতম্যাচের অভিজ্ঞতা থেকে তারা শুরু থেকে শুধু পারফরমেন্স শুধু নয় খেলতে থাকে যথেষ্ট পরিশ্রম করেও। খেলায় আক্রমণভাব, মাঝমাঠ এবং রক্ষণ প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সুমন্বয়। অপরদিকে মেক্সিকো ছিল যথেষ্ট আক্রমণাত্মক। ঐতিহ্যগতভাবেই এই দলটি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে। গত ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দুদলই সমান সমান আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে খেলেছে। যদিও খেলার প্রথমার্ধে তেমন কোনো গোলের সুযোগ কোনো দলই তৈরি করতে পারেনি।

আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা মেসি শুরু থেকেই ছিলেন কড়া মার্কিংয়ে। মেক্সিকানরা জানতো লিওনেল মেসই সেই খেলোয়াড় যিনি মুহূর্তেই খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সেই বিবেচনায় হয়তো তাঁকে আকটাতে বা অকার্যকর করে রাখতে একাধিক খেলোয়াড়কে তারা ডেডিকেটেড করে রেখেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হলে আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধের ভুলগুলি শুধরে গোছানো ফুটবল খেলতে থাকে। ছোটো ছোটো পাসে আস্তে আস্তে আক্রমণে আসে। মেসি কড়া মার্কিং এ থাকায় খেলায় ডি মারিয়াকে মাঠের দু’াশেই খেলতে দেখা যায়। খেলার ৬৮ মিনিটে মেক্সিকোর ডি-বক্সের কিছু বাইরে বল পেয়ে গোল বরাবর আড়াআড়ি শর্ট নেয়। এবং গোল পেয়ে যায়। মেসি হয়ত জানতো, মেক্সিকোর সাফল্যের অন্যতম কারিগর এবং গোলরক্ষায় বিস্তর হাত ফাঁকি দিতে হলে তাঁকে বোকা বানাতে হবে। সে কারণে যে জায়গায় সে বল পায় তার নরমাল ডিরেকশনে শর্ট না নিয়ে অনেকটা কোনাকুনি তাঁর জায়গা থেকে দ্বিতীয় বারের কানায় বল পাঠায়। সাথে সাথে উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টাইন সমর্থকরা। মেসিও কিন্তু গোল পেয়ে যে উল্লাস প্রকাশ করে তাতে প্রকাশ পায় তার স্বস্তির মাত্রা। সাধারণত মেসি যেভাবে গোল সেলিব্রেট করে তার থেকে কয়েকগুন উচ্ছ¡াস সে প্রকাশ করে। মাঠের কোণায় গিয়ে সঙ্গীদের নিয়ে বিজয় উল্লাসই প্রকাশ করতে দেখা গেছে মেসিকে।

এই একটি গোল শুধু গোলই নয়। আর্জেন্টিনার জন্য যেন বিশেষ কিছু। যদি কোনো কারণে তারা হেরে যায় বা ড্র করে তাহলে এ আসর থেকে একপ্রকার ছিটকে পরবে। যার কারণে গোলের জন্য বা জয়ের জন্য তারা মরিয়া হয়ে খেলছিল। আর এই গোলটি তাদের কনফিডেন্স লেভেলও কিন্তু তাৎক্ষণিক বাড়িয়ে দেয়া। খেলোয়াড়দের বডি ল্যাঙ্গুয়েজও সাথে সাথে পাল্টে যায়। দ্বিগুন উৎসাহে জয় ধরে রাখতে তারা খেলতে থাকে। মাঠের খেলায় যখন আর্জেন্টিনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তখনই অথাৎ ৮৭ মিনিটে তারা দ্বিতীয় গোলটি পায় ফার্নান্দেজের অসাধারণ নৈপুণ্যতায়। ছোট শর্টে কর্নার কিকে বল মেসির নিকট এলে সে আলতো করে ফার্নান্দেজের দিকে বাড়ায়। ফার্নান্দেজ কাল বিলম্ব না করে সেকেন্ড বারের উপরের কোণায় ধনুকবাঁকা শর্টে গোলরক্ষক ওচোয়াকে পরাস্ত করে। তার এই গোল পাওয়ায় দর্শক ও ধারাভাষ্যকারদের উচ্ছ¡াস ও প্রশংসা শুরু হয়। কেউ কেউ গোলটিকে এখন পর্যন্ত হওয়া সেরাগোলগুলির মধ্যেই রাখতে চায়। 

এ ম্যাচে আর্জেন্টিনা কিন্তু আগের ম্যাচের ভুল আর করেনি। অর্থাৎ, ম্যাচে এগিয়ে গিয়ে কিভাবে তা ধরে রাখতে হয় সেটা কিন্তু তারা খুব দক্ষতার সাথে করেছে। ডিফেন্সে তারা সবসময় চার থেকে পাঁচজন খেলোয়াড়কে রেখেছে। কেউ যখনই বল নিয়ে উপরে উঠে এসেছে তখনই কেউ না কেউ রক্ষণের সেই জায়গা ফিলাপ করে নিয়েছে। ফলে স্কালোনির দলকে বাকী সময়টায় খুব একটা কঠিন পরিস্থিতে পড়তে হয়নি। কখনও কখনও মেসিকেও নীচে নেমে আসতে দেখা গেছে।

জয়টি যে তাঁদের বিশেষ কিছু সেটা মেসি তাঁর বক্তব্যে বলেছে। সে বলেছে এই জয় দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ মিশন নতুন করে শুরু হল। এখন ধাপে ধাপে তারা এগুতে চায়। আগামী ম্যাচে ভালো করার জন্য তাদের দলীয় সংহতি ধরে রাখতে হবে। আরও পরিশ্রম করে যেতে হবে।

একই গ্রæপের অপর খেলোয় পোল্যান্ড জয় পেয়েছে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। তারা জিতেছে ২-০ গোলে। এই ম্যাচে সাবেক বায়ার্ন ও বর্তমানে বার্সেলোর স্ট্রাইকার লেভানদোভোস্কে প্রথম গোল পায়। খেলায় যখন পোল্যান্ড ১-০ গোলে এগিয়ে তখন সৌদি আরব  পেনাল্টি পায় কিন্তু পোল্যান্ড গোলরক্ষক তা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ঠেকিয়ে দেয়।

দিনের অপর খেলায় ফ্রাান্সও কাক্সিক্ষত জয় পেয়েছে। কিলিয়ান এমবাপ্পের দেয়া দুটি গোলে ফ্রান্স এগিয়ে যায়। পরে ডেনমার্ক একটি গোল শোধ করলেও সমতা ফেরাতে পারেনি। ফলে, টানা দ্বিতীয় খেলায় জয় নিয়ে ফ্রান্স পূর্ণ ৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে একপা দিয়ে রাখল।

লেখক: অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন সন্ধানী ও ক্রীড়া বিশ্লেষক।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar