কাতার বিশ্বকাপ-২০২২

আর্জেন্টিনা ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায়


  • মো. মোজাহিদুল ইসলাম নয়ন
  • ২৪ নভেম্বর ২০২২, ১৬:০৩

কাতার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটন কী সৌদি-ই ঘটালো? এ বিশ্বকাপে আর কী এমন ম্যাচে হবে? এমনতরো নানা কথা এখন ক্রীড়ামোদি দর্শক ও বিশ্লেষজ্ঞদের মনে। আর হবেই না বা কেন? যা করেছে সৌদি আরব তাতে এমন বিশেষণসহই যে আলোচনার দাবি রাখে। গতকাল আল ইসাইল স্টেডিয়ামে দুদল যখন খেলতে নামে তখন সৌদি আরব যেমনভাবে নাই তারা আর্জেন্টিকাকে হারিয়ে এমন অঘটনের জন্ম দেবে তেমনি মেসির দলও নিশ্চয়ই চিন্তা করে নাই তাদের এমন হতশ্রী সূচনা হবে। কিন্তু যা ভাবে নাই তাই হয়েছে। এ আসরে কাপ জয়ে যে কয়েকটি দল তাদের পূর্ববর্তী পারফরমেন্স বিচারে অন্যতম দাবিদার সাতবারের ব্যালন ডিও’র জেতা মেসির আর্জেন্টিনা যে ছিল অন্যতম। লিওনেল স্কালোনির ম্যানেজমেন্ট দলটি গত ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত ছিল। উপরন্তু তারা গত আসরে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারিয়ে ১৯৯৪ সালের পর প্রথম কোপা আমেরিকা জিতেছে। দলে রয়েছে ডি মারিয়া, মার্টিনেজ, দিবালা, ওটামেন্ডি ও গোলরক্ষণে মার্টিনেজের মতো খেলোয়াড়। তারা সবদিক বিবেচনায় অবশ্যই শিরোপার দাবিদার তো হতেই পারে। কিন্তু না, এটা বিশ্বকাপ। এখানে দলগুলোর শক্তির পার্থক্য শুধু কাগজ-কলমে দেখলে হবে না। এখানে মাঠের পারফরমেন্স, মনস্তত্ত¡ এবং সার্বিক বিচারে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো আরও অনেক ডায়নামিকস কাজ করে।

 ফিফা রেঙ্কিং এর ৫১তম দল সৌদি আরব ৩ নম্বর রেঙ্কিং এর দল আর্জেন্টিনাকে যেভাবে হারিয়েছে তা কোনো ফ্লুক নয়। খেলায় দেখা গেছে তারা দ্বিতীয়ার্ধে যেভাবে মাত্র পাঁচ মিনিটে দুটি গোল করেছে সেখানে পরিকল্পনার সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে। তারা নিশ্চয়ই হিসাব করেছে যে ১-০ তে এগিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা নিশ্চয়ই আরও বড় জয়ের জন্য গোলমুখে ভিড় করবে। তাই তারা কিছুটা কাউন্টার এ্যাটাকের সুযোগ নিয়ে এবং দলীয় সমন্বয়ের ভিত্তিতেই দুটি গোল করেছে। সৌদি আরবের প্রথম গোলটি করার সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার কিন্তু তার গায়ে গায়ে লেগে ছিল আর গোলরক্ষক মার্টিনেজ যে অ্যাঙ্গেলে দাঁড়িয়েছিল তাতে সেখান থেকে গোল পাওয়া কঠিন। কিন্তু আল শেহেরি সালেহ কোণাকুণি শটে সেকেন্ডবারের একেবারে গা-ঘেঁষে বল জালে পাঠায়। পরের গোলটিও অনেকটা একইরকমভাবে মার্টিনেজকে বোকা বানিয়ে আদায় করে নেয় আর দাওশারি সালেম।

যে সৌদি আরব ইতিপূর্বে চারবার বিশ্বকাপ খেলে মাত্র একবারই দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে পেরেছিল তাও ২৮ বছর আগে ১৯৯৪ সালে। সেই দলের ৪৮ ও ৫৩ মিনিটের যে মরুঝড় তাতে আর্জেন্টিনার চোখ-মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। খেলা শেষে প্রেসের কাছে মেসি নিজেই স্বীকার করেছে তারা ঐ পাঁচ মিনিটের ঝড়ের পর খেই হারিয়ে ফেলে। এমন একটি অভিজ্ঞ দল, যারা দীর্ঘদিন একসাথে খেলছে। রয়েছে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ স্কালোনি-তারপরও র‌্যাঙ্কিং-এর তলানিতে থাকা একটি দলের বিরুদ্ধে যেভাবে পরাজিত হল তা অবিশ্বাস্য। 

 ২-১ গোলে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা তার আক্রমনের ধার বাড়ায়। দলে তিনটি পরিবর্তন আনেন স্কালোনি তাতে দল কিছুটা গতি পেলেও সৌদি গোল রক্ষক আল ওয়াইস এর অতিমানবীয় দৃঢ়তায় সে দেয়াল ভাঙতে পারেনি লাতিন দলটি। ম্যাচের মাত্র ২ মিনিটে মেসির নেয়া জোড়ালো শর্ট যেভাবে সৌদি গোলরক্ষক ঠেকিয়েছে তা সত্যিই প্রশংসা করার মতো। এছাড়া খেলার ৮৪ মিনিটে আলভারেজের নেয়া হেড-ও কিন্তু গোলরক্ষকের দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছিল। ৩২ বছর বয়সী এ গোলরক্ষক গত রাশিয়া বিশ্বকাপের দলেও ছিলেন। কিন্তু গতকালের ম্যাচটিকে নিশ্চয়ই সে তার খেলোয়াড়ি জীবনের সেরা হিসেবে স্মৃতিতে রেখে দেবে।

 খেলায় আর্জেন্টিনা কিন্তু স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই শুরু করে। অর্থাৎ, একদিকে মার্টিনেজ আর অন্যদিকে মেসি, উইংয়ে ডি মারিয়া ও পাপু গোমেজকে নিয়ে ৪-৪-২ ফরমেটে দল সাজিয়ে আক্রমনাত্মক ভঙ্গিঙ্গেই শুরু করে। ১০ মিনিটের মাথায় আদায় করে নেয় প্যানাল্টি এবং তার মাধ্যমে গোল সূচনা করে বড় কিছুর আভাসই দিচ্ছিল দলটি। প্রথর্মার্ধে আরও তিনটি গোল কিন্তু আর্জেন্টিনা পেয়ে যায় কিন্তু অফসাইড ও ভিএআর এর বিচারে তা বাতিল হলে বড় হাতাশা নেমে আসে দলটির মধ্যে। অন্যদিকে সৌদি আরব ৪-১-৪-১ ফরর্মেশনে খেলে আর্জেন্টিনার আক্রমনভাগকে ভালোভাবেই ঠেকিয়ে রাখে। বিশেষ করে মার্টিনেজ, মেসি, আলভারেজের যে আগুয়ান মুড সেটাকে তারা অফসাইডের ফাঁদে ফেলতে সফল হয়।

বিশ্বকাপে কী এটাই বড় অঘটন? সময়ের বিচারে হয়তো তাই। কিন্তু বিশ্বকাপে এমন অঘটন হয়েছে প্রচুর। আর্জেন্টিনাই তো এর আগে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে নেমে সেই সময়ের তলানির নবাগত দল ক্যামেরুনের কাছে ০-১ গোলে হেরে বসে। ১৯৯০ সালের সেই ম্যাচে অধিনায়ক তখন দূর্দান্ত ফর্মে থাকা এবং শতাব্দির অন্যতম ফুটবল তারকা দিয়াগো ম্যারাডোনা। এছাড়া, ১৯৫০ যুক্তরাষ্ট ১-০ গোলে ইটালিকে হারায়; ১৯৬৬ উত্তর কোরিয়া ১-০ ইটালিকে, ২০০২ সেনেগাল ১-০ গোলে ফ্রান্সকে; ১৯৮২ আয়ারল্যান্ড ১-০ গোলে স্পেনকে এবং ২০০২ দক্ষিন কোরিয়া ২-১ গোলে ইটালিকে হারিয়ে এমন বড় অঘটনের জন্ম দিয়েছিল।

আর্জেন্টিনার গ্রুপের অপর খেলায় পোল্যান্ড ও মেক্সিকো’র মধ্যকার খেলাটি গোলশূণ্য ড্র হয়েছে। বার্সেলোনার তারকা খেলোয়াড় লেভানদোভস্কি প্যানান্টি মিস না করলে হয়তো ফলাফল ভিন্ন হতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। আর এতে গ্রুপের হিসাব-কিতাব আরও জটিল হয়ে গেল। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার জন্য। ফলে, আগামী দুই ম্যাচে পোল্যান্ড ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার জয়ের কোনো বিকল্প থাকালো না। আর এতে, খেলার শুরুতে আর্জেন্টিনা পর পর দু ম্যাচ জিতে দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে পারবে কি না তেমন শঙ্কা কিন্ত অলরেডি দেখা দিয়েছে।

এদিন আরও আরও দুটি খেলায় ফ্রান্স অঘটনের শঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে ৪-১ গোলের প্রত্যাশিত জয়ই পেয়েছে। করিম বেনজেমা, পল পগবা, কন্তেকে হারিয়ে অনেকটা দূর্বল হয়ে পড়া ফ্রান্স যে মোটেও শক্তি হারায়নি তা কিন্তু ভালোভাবেই দেখা গেছে। খেলায় প্রথমে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে তারা ফিরে এসে দাপুটে জয় তুলে নিল সেটা সামনের দিনে আরও ভালো কিছুরই ইঙ্গিত দেয়। খেলায় অন্যতম তারকা এমবাপ্পে গোল পেয়েছে, অলিভার জিরু জোড়া গোল করেছে।

ডেনমার্ক ও তিউনিশিয়ার খেলাটি খুব কিছু উত্তেজনা ছড়াতে পারেনি। দুই দলই আক্রমন-প্রতি আক্রমনে গেলেও কেউই গোলের দেখা পায়নি। ফলে, গত ইউরো আসরে ভালো পারফর্ম করা এরিসেনের দল একপয়েন্ট নিয়েই খেলা শেষ করতে বাধ্য হয়।

লেখক: অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন সন্ধানী ও ক্রীড়া বিশ্লেষক

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar