করোনায় কঠিন সংগ্রামে ডায়বেটিস রোগীরা


poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৫ নভেম্বর ২০২০, ১০:২১

নিয়ন্ত্রিত জীবনাচারণ ডায়বেটিস রোগীর জন্য বাধ্যতামূলক। এ ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও সুস্থ থাকতে নিয়মতান্ত্রিকতার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সেই সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলেছে করোনাভাইরাস। ফলে মহামারীর কারণে ব্যাহত হচ্ছে তাদের চিকিৎসা। এমনকি নিয়মিত হাঁটাচলাও করতে পারছেন না তারা।

গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিস রোগীদের কোভিডে আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি। ডায়াবেটিস রোগীরা কোভিড থেকে সেরে উঠলেও তাদের মধ্যে নতুন সব জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম) তাদের নিজস্ব ল্যাবে শনাক্ত হওয়া ১০১৬ জন কোভিড রোগীকে নিয়ে গবেষণা করে দেখেছে, মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে ডায়বেটিস, কিডনি, ফুসফুসের রোগসহ বিভিন্ন ধরনের কো-মর্বিডিটি রয়েছে, এমন রোগীর সংখ্যা বেশি। সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ডায়াবেটিসের রোগীরা।

ডায়াবেটিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

উদ্বেগে বিষয় হলো, আগে ডায়াবেটিস ছিল না এমন কোভিড রোগীরা সেরে ওঠার পর এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো চিহ্নিত করা যায়নি।

ডায়াবেটিক সমিতির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, 'ডায়াবেটিস করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়, আবার সংক্রমিত হওয়ার পর বাঁচার সম্ভাবনাও কমিয়ে দেয়। এজন্য ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের পাশাপাশি কোভিড থেকে সুরক্ষিত থাকতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক পরাসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।'

কিন্তু চেষ্টা করলেও এই মহামারিতে ডায়াবেটিস রোগীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

৩৫ বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক খান (৫৪)। দীর্ঘদিন ধরে ইনসুলিন নেওয়া ও সকালে নিয়মিত হাঁটার কারণে রোগটি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখন তা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কোভিড সংক্রমণের আগে তার ব্লাড সুগার ৫.৭ mmol/L থাকলেও এখন তা বেড়ে ১৩ mmol/L হয়েছে।

তিনি বলেন, 'কোভিড সংক্রমণের শুরুতে নিয়মিত হাঁটা-চলা ও ডাক্তার দেখানো বন্ধ হয়ে যায়। টেলিমেডিসিনে একবার মাত্র ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছি। ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়ার মেন্টাল প্রেসার, ক্লান্তিসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছি।'

কোভিড শাটডাউন শেষ হয়েছে অনেক আগেই। তবে এখনো ঠিকমতো হাঁটাহাঁটি করতে পারেন না তিনি। 'রাস্তায় মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানে না। এ কারণে রাস্তায় বের হতেও ভয় পাই,' জানান আব্দুর রাজ্জাক।

চলমান করোনাভাইরাস মহামারিতে আব্দুর রাজ্জাকের মতোই সময়মতো চিকিৎসক দেখাতে না পারা বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না অধিকাংশ ডায়াবেটিস রোগী।

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও রিসার্চ সেন্টারের প্রধান, অধ্যাপক রিদওয়ানুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'ডায়াবেটিস রোগীদের নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করে ওষুধের ডোজ বাড়াতে-কমাতে হয়। নিয়মিত হাঁটতে হয়। কোভিডের কারণে এসব বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোভিড ডায়াবেটিস রোগীদের ভোগান্তি ও ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।'

মহামারির এই সময়ে নতুন সংকট হলো, কোভিড থেকে সুস্থ হওয়ার পর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া।

কোভিডে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছেন, চট্টগ্রামের এমন ৭৩৪ জন রোগীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এদের মধ্যে ১.৪% ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এসব রোগী ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কালে চট্টগ্রামের চারটি কোভিড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, আগে অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিলতা ছিল, এমন রোগীরাই কোভিড থেকে সেরে ওঠার পর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন।

গবেষণাটির প্রধান এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. আদনান মান্নান বলেন, 'কোভিড রোগীরা সুস্থ হওয়ার পর কেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন, তার নির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। তবে তারা কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার আগে ডায়বেটিসের ঝুঁকিতে ছিলেন।'

তিনি জানান, কোভিডের চিকিৎসায় স্টেরয়েডসহ যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো রোগীর রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। কোভিড থেকে সেরে ওঠার পর ডায়বেটিস আক্রান্ত রোগীদের সুগার লেভেল আমরা অনেক বেশি পেয়েছি। এ নিয়ে আরও নিবিড় গবেষণা দরকার।'

এদিকে, অধ্যাপক রিদওয়ানুর রহমান জানিয়েছেন, যেসব কোভিড রোগীর ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) বা হাই ফ্লো অক্সিজেন প্রয়োজন হয়, দেখা গেছে তারাই পরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর সুনির্দিষ্ট কারণ তার জানা নেই।

দু'বার কোভিড পজিটিভ হন গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ড. মহিব উল্লাহ খন্দকার। মে মাসে প্রথমবার কোভিড পজিটিভ হওয়ার আগে তার ডায়াবেটিস ছিল না। গত মাসে দ্বিতীয় দফা কোভিড নেগেটিভ হওয়ার পর তার ব্লাড সুগার বেড়ে দাঁড়ায় ২২ mmol/L-এ। এখন তাকে নিয়মিত ইনসুলিন নিয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হচ্ছে।






ads