নতুন দশকের নতুন সম্ভাবনা সফটওয়্যার খাত

নাজমুল হক ইমন

মানবকণ্ঠ
নতুন দশকের নতুন সম্ভাবনা সফটওয়্যার খাত

poisha bazar

  • ০৫ মার্চ ২০২০, ১৫:৫৪

নতুন দশক নতুন সম্ভাবনা দেশের সফটওয়্যার খাত। প্রযুক্তি খাতে নতুন সব সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন দশক। আর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এ সময় বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা এই খাতকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন। এরইমধ্যে সফটওয়্যার খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। আর সময়ের সঙ্গে এই গতি হয়তো আরো বাড়বে। দেশের সফটওয়্যার খাতে ছোট-বড় অনেক প্রতিষ্ঠানই বিদেশেও কাজ করছে। এর মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে (আইটি) বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনও বেড়েছে। আইটি খাতে বাংলাদেশের এই আয়কে ‘ডিজিটাল বিপ্লব’ মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর মানসম্পন্ন সেবা ও সাশ্রয়ী হওয়ায় দেশিয় বাজারের পাশাপাশি প্রসারিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারও।

বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশে বাংলাদেশি সফটওয়্যার রফতানি হচ্ছে। পাশাপাশি আয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত পাঁচ বছরে রফতানি বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। নতুন দশকের শুরুতেই ফাইভ-জি প্রযুক্তি মানুষের কাছে চলে আসবে। এ প্রযুক্তির হাতে ধরেই আসবে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, রোবোটিকস ও বিগ ডেটা অ্যানালাইসিসের মতো নানা কাজ। অর্থাৎ, প্রয়োজন হবে দক্ষ কর্মীর। আগামী এক দশকের মধ্যে আরো নতুন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এসে নতুন চাকরি সৃষ্টি করবে। এজন্য যুগোপযোগী দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে। দেশের সফটওয়্যার কর্মীরা সেটাই করছে। জেনেক্স ইনফোসিস, সিনেসিস আইটি, ব্রেইনস্টেশন, ইক্সোরা, বিজেআইটি, প্রাইডসিস, সিসটেক ডিজিটাল, ব্র্যাকআইটি, মাইসফট, মিডিয়াসফট, ইরা ইনফোটেক, নেসেনিয়া, টিকন, পিপপল ’এন টেক, এনআইটিএস, বিভিক্রিয়েটিভস, টেকনোভিস্তা, আমরা টেকনোলজিস, এসসিএসএল, বি-ট্র্যাক, এডিএন, রিভ সিস্টেমস, টাইগার আইটি, ডাটাসফট, দোহাটেক, ই-জেনারেশন, সাউথটেক, ড্রিমঅ্যাপ, সিসটেক ডিজিটালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান ভারত, নেপাল, ভুটান, মালয়েশিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে অফিস খুলে কাজও করছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় সফটওয়্যার খাতের ওপর আস্থা বাড়ছে বলেই সরকারি পর্যায়ে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডিজিটালাইজেশনের বিষয়টি সামনে এসেছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান চাহিদা ও সেবা নিশ্চিত করায় বেসরকারি খাতও স্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ চাহিদাপত্রে প্রাধান্য দিচ্ছে। এলআইসিটির তথ্যমতে, চলতি বছর স্থানীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের আকার ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যা গত বছর ছিল ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। স্থানীয় বাজারের আকার বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য ও সেবা রফতানি ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যা গত বছর ছিল ৮০০ মিলিয়ন ডলার। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য ও সেবা রফতানি বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।বেসিসের সমীক্ষা অনুযায়ী, স্থানীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে। শুধু বেসিস সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মরত আছেন ৩ লাখ ২০ হাজার জনবল। এ ছাড়াও দেশে ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছেন ৯ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। বেসিসের ঐকান্তিক প্রয়াসে দেশের সফটওয়্যার খাতের উন্নতি সম্ভব হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পর ২০১৮ সালে তথ্য ও যোগাযোগ খাতভিত্তিক পণ্য ও সেবা রফতানি আয়ের ওপর ১০ শতাংশ আর্থিক প্রণোদনা চালু করে সরকার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৩টি প্রতিষ্ঠান রফতানি আয়ের ওপর ১০ শতাংশ আর্থিক প্রণোদনা পেয়েছে। পাশাপাশি আবেদনকৃত মোট ১৬৬টি প্রতিষ্ঠানের ১৬২ মিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের ওপর ১৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

স্থানীয়ভাবেও অনলাইনভিত্তিক কেনাকাটা, আবেদন-নিবন্ধন ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) পরিশোধ; বিভিন্ন ব্যাংক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও মুঠোফোন কোম্পানির প্রয়োজনীয় অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত (আইটি) অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায়ও সফটওয়্যারের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। দেশি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, আইটি-সংক্রান্ত সেবা বা আইটিইএস, ই-কমার্সভিত্তিক ওয়েবসাইট সেবা, মুঠোফোনের অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়ন, আইটি অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি সেবা দিচ্ছে। তবে দেশি-বিদেশি বাজারের এই সম্ভাবনা ভালোভাবে কাজে লাগাতে শিগগিরই সঠিক নীতি-পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা। সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশ থেকে বছরে ২৫ কোটি ডলারের সফটওয়্যার রফতানি হয়; যা ২০০৯ সালে ছিল ৩ কোটি ২৯ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘দেশের সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে-বিদেশে বড় প্রকল্পে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। তাই স্থানীয় কোম্পানিদের গুরুত্ব দিতে হবে বেশি করে। তাহলে আমাদের দেশিয় বাজারের পাশাপাশি আমরা সফটওয়্যার রফতানির পাঁচ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব। পোশাকশিল্পের পরেই তথ্যপ্রযুক্তি খাত রফতানির দ্বিতীয় বৃহৎ খাত হিসেবে ২০২১ সালের মধ্যে আবির্ভূত হবে বলে আশা করি।’

তিনি আরো বলেন, কয়েক বছরের মধ্যে লোকাল মার্কেটে সফটওয়্যারের চাহিদা আরো বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়াও সরকারি সব ধরনের নাগরিক সেবাও সফটওয়্যার কেন্দ্রিক হবে। বড় ধরনের সম্ভাবনা এই সফটওয়্যার বাজার নিয়ে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মোকাবিলায় বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিয়েছে। বেসিস এ দশকের জন্য প্রস্তুত। দেশের সফটওয়্যার খাতকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছে বেসিস। ডিভাইন আইটি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল রাসেল বলেন, ‘দেশিয় সফটওয়্যার শিল্পে বিগত বছরগুলোতে ধীরগতি হলেও অনেক খানি উন্নয়ন হয়েছে। সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি সফটওয়্যার প্রত্যাখান করে দেশিয় ইআরপি ও অন্যগুলো নিচ্ছে। ২০২৫ সাল নাগাদ সফটওয়্যার শিল্পে সক্ষমতা অর্জন সম্ভবপর করার জন্য দেশীয় সফটওয়্যারের মান উন্নয়নের পাশাপাশি নিয়ম বহির্ভূত বিদেশি সফটওয়্যার আনা বন্ধ করা উচিত। ওয়েব ও ক্লাউড টেকনোলজিতে দেশের অগ্রগতির ফলে সফটওয়্যার পাইরেসি অনেক কমে যাচ্ছে, যদি ও ডেস্কটপসহ অনেক ক্ষেত্রে জোরালভাবে পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। জাতীয় রাজ্য বোর্ড ২০১৯ সালের ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় দেশীয় নিবন্ধিত সফটওয়্যার বাধ্যতামূলক করনের ফলে দেশীয় সফটওয়্যার রাজস্ব বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভ‚মিকা পালনে করছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে দেশীয় ডোমেইন ও ইমেইল ব্যবহার নীতিমালার মাধ্যমে ডিজিটাল যোগাযোগ নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে যেটা দেশীয় সফটওয়্যার প্রযুক্তি গ্রহণে উদ্ভুদ্ধ করবে। সফটওয়্যার শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারি ও বেসরকারি সফটওয়্যার টেকনোলোজি পার্কগুলোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সরকারের ভ‚মিকা আবশ্যক।’ স্টার কম্পিউটার সিস্টেম লিমিটেডের সিইও এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রেজওয়ানা খান বলেন, ‘দেশের সফটওয়্যার বাজার বড় হচ্ছে। এই বাজারে টিকে থাকতে এখন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ জনবল বাড়ানোর বিকল্প নেই। শিক্ষাসহ আর্থিক খাতে বেড়েছে দেশি সফটওয়্যারের চাহিদা। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে সফটওয়্যার ও সেবা পণ্য রফতানি করে ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের যে স্বপ্ন দেখছে তা বাস্তবায়ন সম্ভব। আমাদের সে ধরনের প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী তৈরি করে বেশি বেশি সেবা পণ্য রফতানি করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘শুধু তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য ও সেবা চালুর মধ্যেই সীমিত থাকবে না নতুন দশক। প্রতিনিয়তই নিত্যনতুন ও অধিকতর উন্নত প্রযুক্তি আসবে। পুরনো পণ্যসেবাগুলোর জায়গায় হালনাগাদ পণ্যসেবা দ্রুত চালু হবে।

এরই ধারাবাহিকতায় স্মার্টফোনের সক্ষমতা, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, ক্লাউড কম্পিউটিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, রিয়েল-টাইম স্পিচ রিকগনিশন, ন্যানো কম্পিউটার, ওয়্যারেবল ডিভাইস ও নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন, সাইবার সিকিউরিটি, স্মার্ট সিটিজ, ইন্টারনেটে সব পণ্যসেবা আরো উন্নত হবে।’ বিশ্বে বর্তমানে বছরে প্রায় ২৫ হাজার কোটি ডলারের সফটওয়্যার রফতানির বাজার রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবেশী ভারত একাই রফতানি করে আট হাজার কোটি ডলারের। শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন প্রভৃতি এশীয় দেশও এ খাত থেকে ভালো আয় করছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনার ২০১১ সালে এ খাতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ৩০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশকেও রেখেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ৩০টি দেশে সফটওয়্যার সেবা রপ্তানি করে। সবচেয়ে বড় পাঁচটি বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ডেনমার্ক।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...