ইসলামী আইনে ধর্ষকদের শাস্তির বিধান

মাওলানা এম এ করিম ইবনে মছব্বির - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ১২ অক্টোবর ২০২০, ১৫:২৪,  আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৩৭

মাওলানা এম এ করিম ইবনে মছব্বির: করোনার পাশাপাশি মুখে মাস্ক লাগিয়ে ও করোনা ছোঁয়াচে রোগ জেনেও কিছু কিছু মানুষ সমাজে ধর্ষণের মত জঘন্যতম অপরাধ করছে। করোনার পাশাপাশি আমাদের গোটা মানব সমাজে যে সকল ভাইরাসের উদ্ভব ঘটেছে, যেমন ভায়োলেন্স ভাইরাস, ইকোনমিক ভাইরাস, হাংরি বা ভুখা ভাইরাস, হাউজওয়ার ভাইরাস, যেমন শাটডাউনে অথবা চাকরি হারা হয়ে পারিবারিক কলহ শুরু।

ইদানিং করোনা ভাইরাসের মাঝেও শুরু হয়ে গেছে ভায়োলেন্স ভাইরাস, যা গোটা দেশ ও জাতিকে করে তুলেছে অশান্তির দিকে। সমাজের চতুর্থদিকে শুরু হয়েছে অশান্তির বিরাজমান বাতাস। আর এই সকল অশান্তি থেকেই উৎপত্তি হয়েছে আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি খুন, ধর্ষণ, হানাহানি, মারামারি, চুরি, ডাকাতি, আত্মহত্যার মত জঘন্যতম পাপাচার। যা ইসলামী শরীয়তে ইহকালে এবং পরকালে রয়েছে বিপর্যয়।

মানব হত্যার পরেই সবচেয়ে বড় গুনাহের কাজ হলো ধর্ষণ। আরবিতে ইগতিছাব অর্থাৎ বল প্রয়োগ বা জোরপূর্বক কোন চাহিদা আদায় করে নেওয়া। আরবি যিনা বা আল জিবর এর বাংলা অর্থ হলো ধর্ষণ।

Islamic jurice prodance and muslim law penal code দণ্ডবিধি অনুযায়ী মহাগ্রন্থ পবিত্র আল কোরআনে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন যে, আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল এবং অতি জঘন্যতম পথ। সুরায়ে বণী ইসরাইল, আয়াত ৩২।

আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনুল করিমে আরো ঘোষণা করেন যে, যিনাকারী মহিলা এবং যিনাকারী পুরুষ, তাদের উভয়কে একশত দোর্রা মারো অর্থাৎ বেত্রাঘাত করো একশত টা। আল্লাহর বিধান কার্যকর করার কারণে তাদের প্রতি যেনো তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলমানদের একটি দল যেনো তাদের শাস্তি দেখতে পারে, সুরায়ে নুর আয়াত ২।

ধর্ষণের শাস্তি কেমন হবে? ধর্ষণের বেলায় শুধু মাএ একতরফা যিনা সংঘটিত হয়। আর ওপর পক্ষ হয় নির্যাতিতা অথবা ধর্ষিতা। অতএব নির্যাতিতার উপরে কোন শাস্তি প্রয়োগ করা যাবে না। শুধুমাত্র জালিম ধর্ষকেরই শাস্তি পেতে হবে। ধর্ষণের বেলায় দুটো বিষয় থাকে যে প্রথমত যিনা বা অশ্লীল পাপাচার, দ্বিতীয়ত বল প্রয়োগ, জোর প্রয়োগ বা ভয়ভীতি প্রদর্শনপূর্বক বা দল বল অস্ত্র দেখিয়ে একজন অবলা নারীর সম্ভ্রমহানি। প্রথমটি অর্থাৎ ধর্ষকের শাস্তি বা সাজা হতেই হবে। দ্বিতীয়টির শাস্তি বা সাজা ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের মতে মুহারাবার শাস্তি পাবে।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞরা হলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফিই (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)। আমরা বাংলাদেশের সবাই অধিকাংশই ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর অনুসারী। আমরা বাংলাদেশিরা হলাম হানাফী মাজহাবের অনুগত।

মুহারাবা শাস্তি বা সাজার বিষয়ে আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন যে, যারা আল্লাহ পাক এবং রাসুল হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর সঙ্গে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা বা সংঘাত সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি বা সাজা হচ্ছে তাদের কে হত্যা করা হবে অথবা শূলিতে চড়ানো হবে। অথবা তাদের হাত সমূহ বিপরীত দিক থেকে কর্তন করে দেয়া হবে, অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়া হবে, অর্থাৎ নির্বাসনে পাঠানো হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা। আর তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে কঠোর শাস্তি বা আজাব, সূরা মাইদা আয়াত ৩৩।

ঊল্লেখ যে, মানব হত্যা করলে তার শাস্তি বা সাজা হবে হত্যার বদলে হত্যা, কারো সম্পদ চুরি বা ডাকাতি করলে তার শাস্তি বা সাজা হবে বিপরীত দিক থেকে হাত পা কেটে দেওয়া। চুরি বা ডাকাতির পর গৃহের মালিক কে হত্যা করলে তার সমোচিত শাস্তি বা সাজা হবে ডাকাত কে শূলিতে চড়িয়ে হত্যা করার তাফছীর করেছেন পৃথিবীর চার মাজহাবের চার ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্র বিদ যাদের অনুসারী সারা পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহ। যেমন- ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফিঈ (রহ.) ,ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)। আবার এর চেয়ে লঘু অপরাধ হলে দেশান্তরের শাস্তি বা সাজা দেওয়ার কথা বলেছেন উপরোক্ত পৃথিবী বিখ্যাত এই চার ইমাম। সংক্ষেপের কারণে বিস্তারিত লিখে বা বলে সকল রেওয়ায়েত শেষ করা যাবে না।

আমাদের দেশের আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় উল্লেখ রয়েছে যে, যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ছাড়া ষোল বছরের অধিক বয়সের কোন মহিলার সহিত তাহার সম্মতি ছাড়া অথবা ভয়ভীতি প্রদর্শনপূর্বক বা জোর পূর্বক অথবা প্রতারণামূলকভাবে উক্ত নারীর সম্মতি আদায় করেন, অথবা ষোল বছরের কম বয়সী কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ অথবা সম্মতি ছাড়া যৌন সংগম করেন তাহলে তিনি উক্ত মহিলাকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হবেন।

আল কোরআন, আল হাদিস এবং ইসলামী ফিকাহের সংজ্ঞার সাথে বাংলাদেশের ধর্ষণের বিচারের ম্যানেজমেন্ট সব সময় ই একমত পোষণ করে। ইসলাম বিবাহ বহির্ভূত নারী এবং পুরুষের সম্মতি বা অসম্মতি উভয় দিক থেকে অবৈধভাবে দৈহিক মিলন কে দণ্ডণীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। বিবাহ ছাড়া অবৈধ দৈহিক মিলনকে ইসলামী আইন এবং আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে উভয়ের চোখে অপরাধ। পক্ষান্তরে ইসলামে বিবাহিত কেউ ধর্ষণ বা যিনা করলে তার শাস্তি বা সাজা পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদণ্ডের কথা আল কোরআন এবং হাদিসে বলা হয়েছে।

রাসুল (সা.) বলেন যে, অবিবাহিত পুরুষ এবং নারীর উভয়ের যিনার শাস্তি বা সাজা হলো একশত দুররা মারা অর্থাৎ একশত বেত্রাঘাত মারতে হবে। এবং এক বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠাতে হবে। আর যদি বিবাহিত নারী পুরুষ যিনা করে, তাহলে উভয়ের শাস্তি বা সাজা হলো একশত দুররা অর্থাৎ একশত বেত্রাঘাত এবং রজম অর্থাৎ পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা। মুসলিম শরীফ।

এ বিষয়ে আমাদের মাজহাবের ইমাম আবু হানিফা (রহ.), এর মত অনুযায়ী হুদুদ অর্থাৎ ইসলামী শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি বা সাজা। আর ধর্ষককে নির্বাসনে পাঠানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ বিচারকের এখতিয়ারাধীন।

ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণের প্রণিধানযোগ্য নীতিমালা হলো- যিনা প্রমাণের জন্য দুটি বিষয় অতীব জরুরি। এক. চারজন সাক্ষী। দুই. ধর্ষকের জবানবন্দি। তবে সাক্ষী পাওয়া না গেলে মডার্ন ডিএনএ টেস্ট, সিসি ক্যামেরা, মোবাইল ভিডিও রেকর্ড, ধর্ষিতার বক্তব্য অনুযায়ী ধর্ষককে গ্রেফতার করে জবানবন্দি অনুযায়ী তার উপর শাস্তি বা সাজা প্রয়োগ করা হবে।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষকের যতটুকু শাস্তি প্রাপ্য রয়েছে, তা প্রয়োগে বিলম্ব আর রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ধর্ষণের উপযুক্ত বিচার হয় না। সবই ধামাচাপা হয়ে যায়। তবে আল্লাহর আদালত কিয়ামত দিবসে কেউ ধামাচাপা দিতে পারবে না। দুনিয়াতে ধর্ষিতার বিচার না হয়ে উপরন্তু অবলা লাজুক ধর্ষিতা সমাজে বাঁকা চোখে দেখা হয়। ধর্ষিতাকে এক ঘরে করে রাখা হয়। এমনকি ধর্ষিতার পরিবারকে উল্টো হুমকী ও প্রধান করা হয়। ইসলাম এ সমস্ত কর্মকাণ্ডকে পছন্দ করে না। যদি পাপাচার করে একজন তাহলে আল্লাহর আজাব এবং গজব গোটা সমাজের কাঁধের উপরে পড়ে যায়। এক ঘরে আগুন লাগলে যেমন একশত ঘর পুড়ে যায়। ঠিক একই ভাবে কিছু কিছু মহাপাপীদের কারণে গোটা সমাজে আল্লাহর আজাব এবং গজব শুরু হতে থাকে।

শিশু ও নারী নির্যাতনের জন্য রয়েছে ওয়ান স্টপ সার্ভিস। কিন্তু ওইগুলা আর কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোতে তারা যৌনশক্তি ধ্বংসের ইনজেকশন দিয়ে অনেক দেশে ধর্ষকদের শাস্তি বা সাজা প্রদান করে থাকে। পরিশেষে মহান আল্লাহ পাক যেনো আমাদেরকে ইনছাফ ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের তাওফিক দান করেন। আমীন

লেখক পরিচিতি: সাবেক ইমাম ও খতীব বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ মসজিদ।

মানবকণ্ঠ/এসকে






ads