হজের ফজিলত এবং করোনা ভাইরাসে এবারের হজ


poisha bazar

  • মাওলানা এম. এ. করিম ইবনে মছব্বির
  • ২৩ জুন ২০২০, ১৮:৩৬

করোনা ভাইরাসে এবারের হজ হবে, কিন্তু সীমিত আকারে হবে। শুধু মাত্র সৌদি আরবে অবস্থানকারীরা হজ পালন করতে পারবেন। রাসুল পাক (সা.) বলেন, ইননামাল আমালু বিন নিয়াত, অর্থ, সকল আমলই নিয়তের উপর নির্ভরশীল।

মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে অনেকেই হজ থেকে মাহরূম। আল্লাহপাক আমাদের অন্তরের সবকিছু শুনছেন এবং দেখছেন। আমাদের নিয়ত হলো যে আমার রব আল্লাহকে রাজি-খুশি করা। মহামারীর কারণে হজে যেতে না পারলেও লকডাউনে আল্লাহর নিকট তাওবা করতে থাকুন।

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে মূল হলো ঈমান তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই)। সালাত ও রমজান হলো দৈহিক ইবাদাত। জাকাত হলো অর্থনৈতিক ইবাদাত। আর হজ হলো দৈহিক ও আর্থিক ইবাদাত। হজের মাধ্যমে মুমিনদের দেহের পাপসমূহ পরিস্কার হয়ে যায়।

রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, মানুষ গোসল করলে যেমন শরীরের ময়লা আবর্জনাসমূহ দূর হয়ে যায়। তেমনি হজ করলে মানবজাতির পাপাচারসমূহ মুছে যায়। হজের সাথে দৈহিক এবং অর্থনৈতিক উপাসনার সংমিশ্রণ, আর জাকাত শুধু ধন সম্পদের পবিত্রতার খাজনা। পাপ মানুষকে জাহান্নামের উপযুক্ত করে তোলে, কিন্তু হজ মানবজাতির অতীতের সকল পাপসমূহকে মুছে দেয়। তাই হজে মাবরুর (মাকবুল হজ) শেষে সকল হাজীদের ইহজগতের সকল দৃশ্যপট পাল্টে যায়।

হজ করার পর হাজীগণ মহান রব্বুল আলামীনের ভয়ে, তাকওয়ার জ্ঞান আসে তখন বায়তুল্লাহ তাওয়াফের কারণে আল্লাহ পাকে হাজীদেরকে রহমতের চাদরে পরিবেষ্টিত করে তোলেন। হজের ধারা বান্দা আল্লাহর নিকট জান এবং মাল নিয়ে সাদা কাপড় পরে স্যারেন্ডার করে, মহান রবের মেহমান হওয়ার পূর্ণাঙ্গ সুযোগ লাভ করে। আল্লাহর ঘর এবং রসূল (স.) এর রওজা মোবারক তাওয়াফ শেষে বান্দা দুনিয়া বিমুখ হয়ে যায়।

অনেকেই নিয়ত করেন যে, পৃথিবীর সকল ঝামেলা, ঝড়-ঝঞ্জা মুক্ত হয়ে হজব্রত পালন করা চাই। কেন না হজের আনুষ্ঠানিকতা বান্দার মাঝে বিশাল আমানতের জিম্মাদারি তৈরি করে ঈমানকে মজবুত করে। ফলে হাজিরা হজ পূর্ব অবস্থার চেয়ে প্রকৃত মুমিন হিসেবে পরহেজগারী নিয়ে চলতে সক্ষম হয়। ঐ কারণে অনেক সময় জীবন-ভাটির সন্ধিক্ষণে অনেকেই হজ করতে চায়, যাতে করে সে হজ থেকে ফিরে এসে জগত-সংসার অর্থাৎ দুনিয়াবিমুখ হয়ে যেতে পারে।

হজে যাবার আগে একজন হজযাত্রী রাফাছ অর্থাৎ অশ্লীলতা, ফুছুক অর্থাৎ পাপাচার এবং জিদাল অর্থাৎ ফিৎনা, ফাসাদ থেকে মুক্ত থেকে তাকওয়া অর্জনের অনুশীলন করবে। হজে মাবরুর বা কবুল হজের জন্য যেমন তাকওয়া বা খোদাভীতি অপরিহার্য, তেমনি একজন সকল ও স্বার্থক হাজীর, হজ-পরবর্তী আগামী জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক হওয়া অপরিহার্য। হাজী উপাধিধারী ব্যক্তি আল কোরআন ও সুন্নাহ বিরোধী সর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার কোন সুযোগ নেই। (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২০৩-২০৬)।

রসূল (স.) এরশাদ করেন, হজ শেষে হাজীগণ নিষ্পাপ-মাছুম শিশুর মত হয়ে যায়। হাজী নিজে সিবগাতাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর রঙে রঙিন হয়ে যায়। আল্লাহর প্রিয়বান্দা হিসেবে পরিণত হয়, যা মৃত্যু পর্যন্ত কখনো মুছে যায় না। হজের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, আরাকাতে অবস্থান, তাওয়াফে জিয়ারাহসহ রসূল (স.) এর স্মৃতিবিজড়িত পূত-পবিত্র স্থানসমূহ প্রত্যক্ষ করার ফলে হাজীদের চিন্তা চেতনা, চরিত্র ও কর্ম এবং জীবন বৈশিষ্ট ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়ে যায়।

শয়তানকে পাথর মারার পর হাজীর অন্তরে তাবৎ শয়তানি শক্তি দূর হয়। রসূল (স.) কে জনৈক সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রসূল্লালাহ (স.) গোনাহ বা পাপের রং কি রকম? রসূল (স.) উত্তরে বললেন, গোনাহ বা পাপের রং হলো কালো, কেন না হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথরটি) ভিত্তি প্রস্তরকালীন সময়ে হাজরে আবইয়াজ (সাদা পাথর) ছিল। ঐ ‘সাদা পাথর’ মানবজাতি খেতে খেতে পাথরটি মানুষের গোনাহসমূহ চুম্বকের মত নূরের আলো দ্বারা মানুষের পাপসমূহ চুষতে চুষতে পাথরটি কালো হয়ে যায়। এবং মানবজাতি গোনাহমুক্ত হয়ে আল্লাহর জমিনে প্রত্যাবর্তন করে।

হজ পরবর্তী সময়ে সকল হাজীদের তাকওয়া ভিত্তিক জীবন একমাত্র পাথেয়। অনেকে হজ থেকে ফিরে এসে হালাল-হারাম যাচাই বাছাই না করে সেই অতীতের জীবনে চলে যায়। সাফা-মারওয়াতে ‘ছায়ী’ হাজীর মনে দৃঢ় আশা ও মহান আল্লাহর রহমতের অবারিত প্রত্যাশা বৃদ্ধি করে।

হজ পরবর্তী দুনিয়া বিমুখ হাজিদেরকে আল্লাহর পক্ষথেকে অনেক কঠিন পরীক্ষারও সম্মুখীন হতে হয়। মুসলিম জাতির আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর জন্য কঠিনতম পরীক্ষা শিশুপুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) ও বিবি হাজেরা (আ.) কে শুষ্ক মরু প্রান্তরে ক্ষুধার জ্বালা প্রাণ বিনাশের আশঙ্কাসহ অনেক পরীক্ষা দিতে হয়েছে।

সাফা-মারওয়াতে ‘ছায়ী’ প্রত্যেক হজ ও উমরাহ পালনকারীকে পবিত্র কোরআনুল কারীমের সূরায়ে বাকারাহ এর ১৫১-১৫৭ আয়াতে বর্ণিত সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে অগ্নিপরীক্ষায় টিকে থাকতে নিদের্শ দেয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই সাফা-মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৫৮)।

অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেছেন, “আর যারা আল্লাহকে স্মরণ করবে, আল্লাহপাকও তাদেরকে স্মরণ করবেন।” (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৫১)। মহান রব্বুল আলামীনকে জিকিরের সাথে স্মরণ এবং তাঁর সাথে সকল ইসলাম বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে হবে।
আল্লাহর রাস্তায় কার্যরত থাকা অবস্থায় বান্দার পরীক্ষা করা হবে, ভয়-ভীতি, ক্ষুধা, অনাহার, জান-মাল ও ফসলাদির ক্ষতি সাধন করে। (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৫৫)।

আর সত্যিকারের মুমিনরা বিপদে পতিত হলেও তাঁরা কোন ভয়-ভীতি না করে বলবে. “আমরা তো আল্লাহর জন্যই, আর নিশ্চিত আমরা আল্লাহর নিকটেই ফিরে যাবো।” (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৫৬)। “আর এ পরীক্ষায় যারা টিকে থাকবে সেই দৃঢ়বিশ্বাসীরা মহান আল্লাহর সমগ্র দয়া, রহমত ও হিদায়াত প্রাপ্ত।” (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৫৭)।

সূরা বাকারার ১৫১-১৬৩ আয়াত থেকে বুঝা যায়, ছায়ী’র তাৎপর্য মুসলিম উম্মাহ’র দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য কতটুকু অপরিহার্য। সকল হাজীদের জীবন হোক রহমতের চাদরে পরিবেষ্টিত, চোখের গুনাহমুক্ত, হাতের গোনাহ, পায়ের গোনাহ, কথার গোনাহ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পাপাচারমুক্ত। জঙ্গলে অনেক কাঁটা কিন্তু চলা-ফেরা করতে যেন পায়ে কাঁটা না বিঁধে, এই হলো তাকওয়ার মূল তত্ত্ব। তাহলেই সৌভাগ্যময় হয়ে যাবে একজন হাজীর মৃত্যুপূর্ব জীবনযাত্রা। তাহলে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা পঞ্চ স্তম্ভবিশিষ্ট গৃহের মত পূর্ণতা পাবে, আর চুতুর্থ স্তম্ভ হজও তাকওয়া ভিত্তিক জীবন যাত্রার সহায়হক ভূমিকা পালন করবে, ইন শা আল্লাহ!

লেখক : সাবেক ইমাম ও খতীব: জাতীয় সংসদ মসজিদ।





ads






Loading...