বাবা আদম মসজিদ : মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যের নিদর্শন

রুহিত সুমন

মানবকণ্ঠ
বাবা আদম মসজিদ - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৪ মে ২০২০, ১৯:২৫,  আপডেট: ১৭ মে ২০২০, ০৯:৩১

ঢাকাতেই আমার বেড়ে উঠা। আমার শৈশব, কৈশোর ও শিক্ষাজীবন ঢাকাতেই তবে আমার জন্মস্থান মুন্সীগঞ্জ এ (প্রাক্তন বিক্রমপুর)। আমার এই জেলাতেই আছে বিখ্যাত একটি স্থাপনা, ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শন বাবা আদম মসজিদ। বহুবার নাম শুনেছি মসজিদটির তবে কখনো স্বচোক্ষে দেখা হয়নি। তাই এবার পরিকল্পনা করি সময় বের দেখতে যাবো এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি। ২০১৮ সালের দিকে নিজ গ্রামে যাবার পূর্বমুহূর্তে দর্শন করে নেই মসজিদটি, সেইসাথে নামাযও আদায় করি এখানে।

চলুন জেনে নেই মসজিদর অবস্থান ও ইতিহাস সম্পর্কে-

বাবা আদম মসজিদ মুন্সীগঞ্জ জেলার রামপালের অন্তর্গত রিকাবিবাজার ইউনিয়নের কাজী কসবা গ্রামে অবস্থিত। মুন্সীগঞ্জ শহর থেকে উত্তর-পশ্চিমে চার কিলোমিটার পথ পেরোলেই বাবা আদম মসজিদ আর ঢাকা থেকে সড়কপথে মসজিদের দূরত্ব মাত্র ২৮ কিলোমিটার। মসজিদের নির্মাণসাল ৮৮৮ হিজরি, ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দ। সুলতান ফতেহ শাহের শাসনকালে মালিক কাফুর এ মসজিদ নির্মাণ করেন।

মসজিদটির পশ্চিম দেয়ালের পশ্চাৎভাগ বাইরের দিকে তিন স্তরে বর্ধিত। পেছনের অংশটি খুবই সুন্দর। বাবা আদমের মসজিদটি ছয়টি সমাকৃতির অনতিউচ্চ গম্বুজে আচ্ছাদিত। গম্বুজগুলো পর্যায়ক্রমে দুই সারিতে স্থাপিত। মসজিদের অভ্যন্তরে রয়েছে দুটি দণ্ডায়মান কালো ব্যাসল্ট পাথরের স্তম্ভ। এগুলো প্রাক-মুসলিম যুগের ভগ্ন অথবা পরিত্যক্ত ইমারতের স্তম্ভ বলে ধারণা করা হয়। মসজিদটিতে বাংলায় সুলতানি শাসন আমলে বিকশিত স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও অলংকরণশৈলী প্রকাশ পেয়েছে। বলা যায়, বাংলাদেশে মসজিদ স্থাপত্যে সুলতানি স্থাপত্যরীতি পরিণত রূপ লাভ করেছে বাবা আদম মসজিদে।

ইতিহাস বলে, প্রায় ৫৩৭ বছরের পুরনো বাবা আদম মসজিদ। সুদূর আরব দেশে জন্মগ্রহণ করে ইসলাম ধর্ম প্রচারে ভারতবর্ষে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক বাবা আদম (রহ.)। উপমহাদেশে সেন শাসনামলে ১১৭৮ সালে ধলেশ্বরীর তীরে মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিমে আসেন তিনি। তখন বিক্রমপুর তথা মুন্সীগঞ্জ ছিল বল্লাল সেনের রাজত্বে। ওই বছরই বল্লাল সেনের হাতে প্রাণ দিতে হয় তাঁকে।

এ বিষয়ে নানা কল্পকাহিনী ও স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে। শাহ হুমায়ুন কবির ‘The Battle of Kanai Changue’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বাবা আদম শহীদ (রহ.) আরবের তায়েফ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে খানকাহ নির্মাণ করে ইসলাম প্রচার করেন। বাবা আদম শহীদ (রহ.) ১১৪২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে আসেন। সেখান থেকে ১১৫২ খ্রিস্টাব্দে মুন্সীগঞ্জ সদরের প্রাচীন রামপাল নগরে আসেন। মুন্সীগঞ্জ এলাকার কপালদুয়ার, মানিকেশ্বর ও ধীপুরে তিনটি খানকাহ নির্মাণ করে ইসলাম প্রচার করেন।’

শহীদ বাবা আদমকে মীরকাদিমের দরগাবাড়ীতে দাফনের পর তাঁর কবরের পাশে ১৪৮৩ সালে নির্মাণ করা হয় বাবা আদম মসজিদ। এটি ছিল তাঁর মৃত্যুর ৩১৯ বছর পরের ঘটনা। মসজিদটির উত্তর-দক্ষিণে ৪৩ ফুট ও পূর্ব-পশ্চিমে ৩৬ ফুট। মসজিদে তিনটি মিহরাব রয়েছে। মসজিদের উচ্চতা প্রায় ১৮ ফুট। মসজিদটির দেয়াল আট ফুট চওড়া। ছাদ বাংলাদেশের আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করে উত্তর-দক্ষিণে ঈষৎ ঢালু রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদে প্রবেশের জন্য তিনটি দরজাও রয়েছে। মসজিদটি নির্মাণের সময় লাল পোড়ামাটির ১০ ইঞ্চি, সাত ইঞ্চি, ছয় ইঞ্চি ও পাঁচ ইঞ্চি মাপের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদের ভেতরে দুটি স্তম্ভ রয়েছে।

মসজিদটি ১৯৪৮ সাল থেকে পুরাতত্ত্ব বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯১-৯৬ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বাবা আদম মসজিদের ছবিসংবলিত ডাকটিকিট প্রকাশ করে। কারুকার্য খচিত এ মসজিদ নির্মাণে সময় লেগেছিল চার বছর। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে মাঝখানের দরজার ঠিক ওপরে একটি আরবি শিলালিপি রয়েছে। শিলালিপির ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন ব্লকম্যান।

৫৩৭ বছর ধরে ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে এই মসজিদটি। কিন্তু মুসলিম ঐতিহ্যের চোখ জুড়ানো এই শৈল্পিক স্থাপনার গায়ে এখন শুধুই অযত্ন-অবহেলার ছাপ। আমার মনে হয়, এই মসজিদটির রক্ষণে আরেকটু সচেতন হওয়া প্রয়োজন আমাদের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। পরিশেষে, আমাদের মুন্সীগঞ্জের জন্য সত্যিই গর্ব করার মতো একটি স্থাপনা বাবা আদম মসজিদ।

লেখক- রুহিত সুমন : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ময়ূরপঙ্খী শিশু-কিশোর সমাজকল্যাণ সংস্থা
[email protected]

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads






Loading...