‘লন টেনিসের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল’: বাঁধন শরীফ

পৃষ্ঠপোষকদের এগিয়ে আসার অনুরোধ বাঁধনের


  • ক্রীড়া প্রতিবেদক
  • ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৮

ক্রিকেটটা ভালোই বুঝেন বাঁধন শরীফ। খেলতেনও চমৎকার। ছেলেবেলায় গ্রামের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে সারাক্ষণ ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকবেন। ‘একদিন বড়মাপের ক্রিকেটার হবেন’- এমন স্বপ্ন তখন থেকেই আঁকিবুকি কাটত তার মনে। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে একদিন ভর্তি হোন ক্রীড়াঙ্গনের আঁতুরঘর বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি)। ভর্তি হয়ে অবশ্য রণে ভঙ্গ দেননি। ক্রিকেটের বয়সভিত্তিক ক্যাম্পেও যোগ দেন।

তবে বিধিবাম! বাঁধনের কপালে ক্রিকেট সুখটা বেশিদিন সয়নি। দুর্ঘটনায় পা ভেঙে খেলাধুলা থেকেই ছিটকে পড়েন। তবে হাল ছাড়েননি গোপালগঞ্জের ছেলে বাঁধন শরীফ। ক্রিকেট থেকে ভাগ্যবিধাতা মুখ ফিরিয়ে নিলেও খেলা ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন তিনি। তাই তো সেই বিকেএসপিতেই ক্রিকেট ছেড়ে বেছে নেন লন টেনিসকে। এক্ষেত্রে বাঁধনের বন্ধুরা বিশেষ করে অমিয়, আরিফরা গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখেন। যে বাঁধন খেলার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন; তাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখান বিকেএসপির বন্ধুরা। বিকেএসপির লন টেনিসের প্রশিক্ষকরা।

লন টেনিস বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল, জনপ্রিয় একটি খেলা হলেও বাংলাদেশে এটি বেশ অবহেলিত। এখানে টুর্নামেন্টই হয় কালেভাদ্রে। এটিএফ, আইটিএফ ব্যতিত জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্ট সেভাবে হয় না বললেই চলে। বাঁধনের কথাই ধরুন। বিকেএসপিতে টেনিস খেলাকে বেছে নিলেও পেশাগত জীবনে টেনিস নিয়ে খুব বেশিদূর এগুতে পারেননি। ইনজুরি তার ক্যারিয়ারে যত না প্রভাব ফেলেছে; তার চেয়েও বেশি ফেলেছে বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশন। খেলা না থাকলে কিভাবে এগিয়ে যাবেন বাঁধনরা! টেনিস ফেডারেশন বছরে মাত্র দু’চারটা খেলার আয়োজন করে। সেটাও প্রতি বছর না। কালেভাদ্রে। এমন একটা ব্যয়বহুল খেলায় শেষ পর্যন্ত কে টিকে থাকবে! বাঁধনও পারেননি। ইচ্ছা ছিল না এমন নয়। কিন্তু ফেডারেশনের উদাসীনতায় আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে টেনিসকে এক প্রকার বিদায়ই বলে দিয়েছেন! শুধু বাঁধনই না; দেশের অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ-মেধাবী টেনিস খেলোয়াড় আজ বাংলাদেশ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন বিশ্বের নানান দেশে।

বিশেষ করে চীন, অস্ট্রেলিয়াতে। সেখানে গিয়ে বাংলার ছেলেরা খেলা ছেড়ে কোচিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করেছেন সেইসব খেলোয়াড়রা।

বাঁধন শরীফ দেশ ছেড়ে চলে যাননি। খেলাটাও পুরো ছেড়ে দেননি। তিনি এখনো আশাবাদী একদিন ঘুরে দাঁড়াবে দেশের টেনিস। পেশা হিসেবে টেনিস একেবারে মন্দ নয় সেটাও জানান তিনি। বর্তমান প্রজন্ম খেলাটির প্রতি যে আগ্রহ সেটাও উল্লেখ করেন। তবে প্রতিবন্ধকতা যে এখানে রয়েছে তা অস্বীকার করছেন না। বাঁধন শরীফ বলেন, ‘টেনিসের প্রতি বর্তমান প্রজন্মের ঝোঁক নেই এটা আমি বিশ্বাস করি না। আমাদের দেশে প্রশিক্ষণের অভাব আছে সেটা বললে অত্যক্তি হবে না। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) ছাড়া কোথাও প্রশিক্ষণের সুযোগ কিন্তু নেই। এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটা খেলা। তরুণদের এই খেলায় আগ্রহী করে তুলতে হলে প্রচুর টুর্নামেন্ট-ম্যাচ আয়োজন করতে হবে; যা আমাদের হচ্ছে না। আমি বিকেএসপির সাবেক ছাত্র। আমরা এখন দু’চারজনবাদে টেনিসে সেভাবে কাউকে খুঁজে পাবেন না।’

টেনিসে এই অবস্থা কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বাঁধন শরীফ বলেন, ‘টেনিসের প্রধান বাধাই হচ্ছে পৃষ্ঠপোষকতা। এটার প্রচণ্ড অভাব। যে কারণে আমাদের দেশের টেনিস খেলোয়াড়রা বাধ্য হয়ে খেলা ছেড়ে অন্য পেশায় নিজেদের মনোনিবেশ করছেন। করোনাকালীন সময়ে ফেডারেশন কোনো টুর্নামেন্টই আয়োজন করতে পারেনি। এটা তারা হয় তো বলবে বৈশ্বিক মহামারী তাই সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু করোনার আগেও সেভাবে টেনিসের কোনো কার্যক্রম আমরা দেখিনি। এটিএফ, আইটিএফ ব্যতিত জাতীয় পর্যায়ের কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন এখানে হয় না। আমি সবশেষ জাতীয় টুর্নামেন্ট খেলেছি ২০১৫ সালে। এরপর দু’চারটা টুর্নামেন্ট হয়েছে। তবে আলোচনা করার মতো জাঁকজমকপূর্ণ কোনো টুর্নামেন্ট ফেডারেশন আয়োজন করতে পারেনি। প্রতিযোগিতাই যদি না থাকে তাহলে টেনিসে ভালো খেলোয়াড় কিভাবে বেরিয়ে আসবে। এটা অনেক বড় প্রতিবন্ধকতা।’

সমস্যা থাকলে উত্তরণের উপায়ও আছে। সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিয়েছেন বাঁধন শরীফ। তিনি জানালেন, ‘টেনিস একটা সম্ভাবনাময় খেলা। এখানে পৃষ্ঠপোষকরা কেন আসবেন না! আমাদের যারা সিনিয়র খেলোয়াড় অমল রায়, দীপু লালসহ ভাই-বন্ধু আছেন, তারা সবাই কিন্তু অত্যন্ত ভালো প্লেয়ার ছিলেন। শুধুমাত্র পৃষ্ঠপোষকতা এবং ফেডারেশনের গাফিলতির কারণে তারা আজ টেনিস থেকে এক প্রকার নির্বাসনে। এখন যারা টেনিস কোর্টে আসেন তারা শুধু শখের বশে ঘাম ঝরাতে আসেন। কোর্ট ভাড়া নিয়ে খেলতে আসেন। সেখানে ফেডারেশনের নির্ধারিত কোচেরা টাকার বিনিময়ে তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। টেনিসকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তৃণমূল থেকে নজর দিতে হবে। যা ফেডারেশনের পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় বাছাই করে, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের পাইপলাইন সমৃদ্ধ করতে হবে। এক বিকেএসপির দিকে চেয়ে থাকলে হবে না। এখানে সরকার, ফেডারেশন, পৃষ্ঠপোষক সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবেই ঘুরে দাঁড়াবে আমাদের স্বপ্নের লন টেনিস।’

মানবকণ্ঠ/এমএ


poisha bazar

ads
ads