মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অনুপস্থিতির কারণে চামড়ার দামে ভাটা


  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ২৫ জুলাই ২০২১, ০৭:০৫

মাঠ পর্যায়ে আগের মতো মৌসুমি কারবারি না থাকায় এবার সারাদেশে চামড়ার ন্যায্য দাম পাননি কোরবানিদাতারা। এর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় থাকার কারণেও এবার চামড়ার দাম ছিল কম। এজন্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় চামড়া দান করে দিয়েছেন অধিকাংশ কোরবানিদাতা।

অন্যদিকে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের দাবি, গতবারের চেয়ে এবার তারা অন্তত দেড়শ’ থেকে দুইশ’ টাকা বেশি দিয়ে প্রতি পিস চামড়া কিনছেন। তবে চামড়ার এ বাড়তি দাম আড়ত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকায় এতে লাভবান হয়নি কোরবানিদাতারা। অন্য বছরে তুলনায় এবার চামড়া তেমন নষ্ট হয়নি বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

কেনায় দাম কম থাকলেও চামড়া খাতে রফতানি আয় বাড়ছে। চার বছর পর সদ্য সমাপ্ত অর্থবছর প্রবৃদ্ধিতে ফিরেছে চামড়াজাত পণ্যের রফতানি। বাংলাদেশে করোনার প্রভাব থাকলেও এর প্রধান বাজার ইউরোপের দেশগুলোতে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে শুরু করেছে। এ কারণে রফতানি আদেশও বেড়েছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, গত অর্থবছর (২০২০-২১) চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে ৯৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছিল ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। ফলে বছরের ব্যবধানে রফতানি বেড়েছে ৩১ শতাংশ।

তথ্য বলছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে ১১৩ কোটি ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১৬ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ আয় আরো বেড়ে হয় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে চামড়াশিল্প থেকে সবচেয়ে বেশি রফতানি আয়। এবার চামড়ার দাম নিয়ে ট্যানারি মালিকদের কারসাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কোরবানিদাতারা বলেছেন, লাখ টাকার গরুর চামড়া আড়াইশ’ টাকায়ও বিক্রি করা যায়নি। অথচ বছর দুয়েক আগেও মাঝারি সাইজের একটি গরুর চামড়া এর চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। এবার বড় ধরনের চামড়া আগের দামে বিক্রি করা যায়নি। সরকার প্রতি বছরই কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। অথচ সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি হয় না। এর জন্য চামড়া সিন্ডিকেটদের দায়ী করা হয়। তাদের কারসাজিতে চামড়ার প্রকৃত দাম পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে ঢাকায় চামড়ার পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র পুরান ঢাকার পোস্তায় মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দামে বিক্রি হয়। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এ বছর তারা প্রতিটি চামড়ার দাম গত বছরের চেয়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি পেয়েছেন। যদিও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে।

বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষও মনে করেন, এবার দামের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দু-একটি জেলা থেকে কম দামে বিক্রির অভিযোগ এসেছে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছি। ঈদুল আজহার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে এ বছর ঢাকার ক্ষেত্রে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৩ থেকে ৩৭ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। এ দর গত বছরের চেয়ে বর্গফুটপ্রতি ৫ টাকা বেশি। এ ছাড়া খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৫ থেকে ১৭ টাকা ও বকরির চামড়া ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এদিকে সাধারণত মাঝারি আকারের একটি গরুর চামড়ার আকার হয় ২৫ বর্গফুটের মতো। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবার যে দাম ঠিক করে দিয়েছে, তাতে এই আকারের একটি লবণযুক্ত গরুর চামড়া ঢাকায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। ঢাকার বাইরে দাম হওয়ার কথা ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা। একটি গরুর চামড়া সংরক্ষণে এবার লবণের পেছনে ৫০ থেকে ৬০ টাকার মতো ব্যয় হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা আরো জানান, সাধারণ মানুষ চামড়ার ভালো দাম না পাওয়ার কারণ ক্রেতা না থাকা। একাধিক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কিনতে চাইলে বিক্রেতা বাড়তি দাম চাওয়ার সুযোগ পান। এবারো যেহেতু মাঠপর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীর সংখ্যা একেবারেই কম ছিল, সেহেতু বিক্রেতা দাম চাওয়ার সুযোগ পাননি। মূলত কোরবানির পশুর চামড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করেন মৌসুমি ব্যবসায়ী আর ফড়িয়ারা। তারা সেই চামড়া বিক্রি করে আড়তদারদের কাছে। সেখান থেকে চামড়া যায় ট্যানারিতে। ট্যানারি মালিকরা কত দামে আড়তদারদের কাছ থেকে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে। সে দাম নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

ঈদুল আজহার দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পশু জবাইয়ের পর চামড়া অনেক সময় পড়ে ছিল। ক্রেতা যায়নি। পরে তা মাদ্রাসায় দান করেন কোরবানিদাতারা। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই চিত্র ছিল একই। ঢাকার মাদ্রাসাগুলো চামড়া তেমন একটা ভালো দামে বিক্রি করতে পারেনি। জেলা পর্যায়ের মাদ্রাসাগুলো আরো কম দাম পায়।

ফেনী সদর উপজেলার দমদমা হাফেজিয়া মাদ্রাসার সভাপতি আলতাফ হোসেন জানান, তারা প্রতিটি চামড়া ১০০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি করেন। ছাগলের চামড়ার দাম ছিল না বললেই চলে। কোরবানিদাতারা ছাগলের চামড়া বিনা মূল্যেই দিয়ে দেন। সেগুলো বিক্রি করতে গিয়ে সামান্য দাম পাওয়া যায়।

রাজধানী একটি মাদ্রাসার শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ১৮টি ছাগলের চামড়ার দাম হিসেবে তার হাতে ২০০ টাকা ধরিয়ে দিয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সে হিসাবে প্রতিটি চামড়ার দাম পড়েছে ১১ টাকা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবার কোরবানির চামড়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠন করে দেয়। কমিটিগুলোর কাজ হচ্ছে, কোরবানির চামড়া যথাযথভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, ক্রেতা-বিক্রেতা পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি, মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা এবং অন্যান্য স্থানে সংরক্ষিত চামড়ায় যথাসময়ে প্রয়োজনীয় লবণ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি। এই কমিটি কতটা দায়িত্ব পালন করেছে, সেটা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। অথচ করোনার এই সময়ে সরকারের উচিত ছিল, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে দেশের দুর্দশাগ্রস্ত লাখ লাখ মাদ্রাসা-এতিমখানার শিক্ষার্থী ও দরিদ্র মানুষের হক নিশ্চিত করা। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার চামড়ার দাম বাড়ালেও আড়তদাররা কৌশলে দাম দিচ্ছেন না তাদের। ঈদের দিন সকালে যে দাম ছিল, দিনের শেষে সেই দাম আরো কমতে শুরু করে।

এদিকে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা বলছেন, গতবারের চেয়ে এবার তারা অন্তত দেড়শ’ থেকে দুইশ’ টাকা বেশি দিয়ে প্রতি পিস চামড়া কিনছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, সরকারের পাশাপাশি সবার প্রচেষ্টায় এবার চামড়ার বাজারের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত বছরের চেয়ে প্রতি পিস চামড়া দেড় থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে আমরা কিনছি। বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন বলেন, এবার প্রতি পিস অন্তত ২০০ টাকা বেশি দিয়ে আমরা কাঁচা চামড়া কিনছি।

 



poisha bazar

ads
ads