কোন পথে যাচ্ছে ইভ্যালি!


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৮ জুলাই ২০২১, ০৯:০৫

ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ইভ্যালি আসলেই কোন পথে যাচ্ছে? ইভ্যালির ভেলকি এখানেই শেষ, নাকি গ্রাহকদের সর্বহারা করে পালাবে- এখন এমন গুঞ্জনই চলছে গ্রাহকদের মধ্যে। তবে এই গুঞ্জনকে অনেকেই বিশ্বাস করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ডের। শনিবার পর্যন্ত প্রধান কার্যালয়সহ প্রতিষ্ঠানটির সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও বলেছেন, ইভ্যালির গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে অগ্রিম হিসেবে যে পরিমাণ টাকা নিয়েছে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ দুদকের আবেদনে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং তার স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। এছাড়া তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন বলেও দাবি করেছে একটি সূত্র ।

জানা গেছে, গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া অগ্রিম এবং মার্চেন্টের পাওনা ৩৩৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা ‘আত্মসাৎ ও পাচারের’ অভিযোগে ইভ্যালির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। এর অংশ হিসেবে এর আগে গত ৮ জুলাই ইভ্যালির শীর্ষ কর্তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়েছিল দুদক।

আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর দুদকের প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর সাংবাদিকদের বলেন, দুদক যখন জানল, তারা বিদেশ চলে যেতে পারেন, তখন ব্যবস্থা নেয় দুদক। তখন এখতিয়ার সম্পন্ন কোর্ট খোলা ছিল না। গত বৃহস্পতিবার এই কোর্ট থেকে নিষেধাজ্ঞার আদেশ এসেছে।

দুদকের নিষেধাজ্ঞার খবর প্রকাশের পর ইভ্যালির এমডি রাসেল ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘তাদের বিদেশ যাওয়ার নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে সরকার ও দুদকের পদক্ষেপের পর ইভ্যালির কার্যালয়টি বন্ধ রয়েছে কিছু দিন ধরেই। হটলাইনে ফোন করেও কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা।

ইভ্যালির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন দুদকের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী ও উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ শিহাব সালাম। সম্প্রতি দুদক চেয়ারম্যানকে দেয়া এক চিঠিতে ইভ্যালির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

মন্ত্রণালয়ের চিঠির সঙ্গে ইকমার্স প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাত পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদনও যুক্ত করে দেয়া হয়। সেই প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, “গত ১৪ মার্চ দেখা যায়, ইভ্যালি ডটকমের মোট সম্পদ ৯১ কোটি ৬৯ লাখ ৪২ হাজার ৮৪৬ টাকা (চলতি সম্পদ ৬৫ কোটি ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭৩৬ টাকা) এবং মোট দায় ৪০৭ কোটি ১৮ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯৪ টাকা।

দুদকে পাঠানো চিঠিতে আরো বলা হয়, ‘ইভ্যালি ডটকমের চলতি সম্পদ দিয়ে মাত্র ১৬ দশমিক ১৪ শতাংশ গ্রাহককে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে বা অর্থ ফেরত দিতে পারবে। বাকি গ্রাহক ও মার্চেন্টের পাওনা পরিশোধ করা উক্ত কোম্পানির পক্ষে সম্ভব নয়। গ্রাহক ও মার্চেন্টের নিকট হতে গৃহিত ৩৩৮ কোটি ৬২ লাখ ১৮ হাজার ১৭৮ টাকার কোনো হদিস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে গ্রাহক ও মার্চেন্টের নিকট হতে গৃহিত ৩৩৮ কোটি ৬২ লাখ ১৮ হাজার ১৭৮ টাকা আত্মসাৎ কিংবা অবৈধভাবে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের আলোকে ইভ্যালির বিরুদ্ধে তদন্ত করে কোনো আর্থিক অনিয়ম পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠিতে দুদককে অনুরোধ করা হয়।

এদিকে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ইভ্যালি গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে অগ্রিম যে পরিমাণ টাকা নিয়েছে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি বলেন, ‘তারা মানুষের কাছ থেকে যে পরিমাণ টাকা নিয়েছে এবং তাদের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ টাকা নিয়েছে, তার মোট অঙ্ক প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে তাদের কাছে সেই টাকার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করে। তদন্ত শেষে গ্রাহকদের ও সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে নেয়া টাকার খুব সামান্য অংশের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সেজন্যই প্রশ্ন উঠেছে যে এই বিশাল দায় কীভাবে তারা শোধ করবে?’

ইভ্যালি এর মধ্যে যেই পরিমাণ টাকা গ্রাহক ও ব্যবসায়িক পার্টনারদের কাছ থেকে নিয়েছে, তা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন বাণিজ্য মন্ত্রী। তাদের ফান্ড কোথায় রেখেছে, অন্য কোনো উৎস আছে কিনা সেটা তদন্তের পর জানা যাবে। তবে এখন সেই পরিমাণ টাকার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

এ বছরের জানুয়ারি মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ও ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে যে পণ্য বেচাকেনার ক্ষেত্রে ইভ্যালি আইন ভঙ্গ করেছে। এরপর জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি তদন্ত দল ইভ্যালির কার্যক্রমের কিছু অনিয়ম চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দাখিল করে। এর পরদিনই বেশ কয়েকটি ব্যাংক ইভ্যালিসহ আরো কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার ভিত্তিতে সেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন বাতিল করে।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির বিরুদ্ধে দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থা যখন নানা অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে, তখন আগাম টাকা দিয়েছেন- এমন গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহ পাওয়ার ব্যাপারে নতুন করে উদ্বেগ বা সংকট তৈরি হয়েছে। গ্রাহকদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, ইভ্যালির সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনো সাড়া মিলছে না এবং তারা প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় বন্ধ পাচ্ছেন।

রুবাইয়াত হাসান নামের একজন গ্রাহক জানান, মে মাসের শেষদিকে একটি মোটরসাইকেল কেনার জন্য ইভ্যালিতে প্রায় তিন লাখ টাকা দেন। প্রতিশ্রুতি মত ৪৫ দিনের মধ্যে পণ্য ডেলিভারি না দেয়ায় ইভ্যালির কাস্টমার কেয়ার নম্বরে যোগাযোগ করেও সাড়া পাননি।

তবে ইভ্যালির মুখপাত্র শবনম ফারিয়া বিবিসি বাংলাকে জানান, তাদের কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস এখনো ২৪ ঘণ্টা চালু আছে। লকডাউন থাকার কারণে আমাদের অফিসে কেউ যাচ্ছে না, আমরা হোম অফিস করছি। কিন্তু আমাদের ডেলিভারি চালু আছে এবং কাস্টমার কেয়ার ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে। এসময় কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে কোনো উত্তর না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে

তিনি বলেন, ‘আমরা খুব কঠিন সময় পার করছি। অনেকে অনেক কিছু নিয়ে ভীত, তারা ফোন করে বিভিন্ন বিষয়ে খবর জানতে চাইছে। তাই ফোন অনেক সময় ব্যস্ত দেখাচ্ছে। কিন্তু আসলে সবসময় ফোন ব্যস্ত থাকছে, বিষয়টা তেমন নয়।’



poisha bazar

ads
ads