ইভ্যালির প্রতারণায় ভোগান্তি


  • শাহীন করিম
  • ২৫ জুন ২০২১, ১০:০৭

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ডটকম লিমিটেডের কাছ থেকে পণ্য পেতে গ্রাহকদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। টাকা আগে দিয়েও নির্দিষ্ট সময়ে মেলে না চাহিদাকৃত পণ্য। নানা অজুহাতে ক্রেতাদের মাসের পর মাস ঘুরানোর অভিযোগ রয়েছে ইভ্যালির বিরুদ্ধে। তবে এখন থেকে ইভ্যালিও আলেশা মার্টসহ সব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে হবে।

পণ্য বুঝিয়ে দেয়ার পর বিক্রেতা মূল্য পাবেন। গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় গতকাল বৃহস্পতিবার এমন নতুন সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এদিকে ব্র্যাক ব্যাংকের পর ব্যাংক এশিয়া ও ঢাকা ব্যাংকও ইভ্যালিও আলেশা মার্টসহ ১০টি ই-কমার্সের সঙ্গে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রি-পেইড কার্ডের লেনদেন বন্ধ করার কথা জানিয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক গত সপ্তাহে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ডটকম লিমিটেডের ওপর একটি প্রতিবেদন পাঠায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। আট পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে গতকাল বিকালে বৈঠকের পর নতুন এ সিদ্ধান্ত আসে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিবেদনটি তৈরি করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইভ্যালি লোকসানে পণ্য বিক্রি করছে। এর ফলে ই-কমার্স ব্যবসায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এতে সৎ ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং এক সময় এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে। অগ্রিম পণ্যমূল্য নিয়ে ও উচ্চহারে ছাড় দিয়ে ইভ্যালি গ্রাহকদের অর্থকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।

ইভ্যালির ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি পরিদর্শন প্রতিবেদন নিয়ে গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে আলোচনা হয়। বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষের সভাপতিত্বে ‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা’ বিষয়ে ওই সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ও ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইক্যাব) প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমান জানান, গ্রাহক পণ্য বুঝে পাওয়ার পর ডেলিভারি মেসেজ দিলে বিক্রেতা মূল্য পাবেন। আর এ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গেটওয়ের মাধ্যমে এই অর্থ লেনদেন হবে। তবে তার পরামর্শ, গ্রাহকরা যেন ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ বা নগদের মতো মাধ্যম ব্যবহার করে কেনাকাটা করেন। তারা যেন আগাম নগদ অর্থ পরিশোধ না করেন।

অতিরিক্ত সচিব বলেন, শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি এসওপি সার্ভিস ডেভেলপ করা হবে। যাতে পণ্য ডেলিভারির আগে পেমেন্ট নেয়া না হয়। ব্যাংক বা ক্রেডিট কার্ড যাদের আছে, তারা পেমেন্ট কন্ট্রোল করবে।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তাদের কাছ থেকে জামানত রাখার কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি-না জানতে চাইলে অতিরিক্ত সচিব বলেন, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, আলোচনাও হয়নি। বৈঠকের পর ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অভিনেত্রী শমী কায়সার বলেন, এক-দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ই-কমার্স খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এটা কারো কাম্য নয়। ভোক্তা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থের জন্য এ খাতে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা পরিচালন নির্দেশিকা দরকার। এ ছাড়া পেমেন্টের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি প্রয়োজন। নীতিমালা হওয়ার পর ডিজিটাল কমার্স আইনের দিকেও যেতে হবে।

আরো দুই ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা: ইভ্যালি ও আলেশা মার্টসহ ১০টি ই-কমার্সের সঙ্গে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রি-পেইড কার্ডের লেনদেন বন্ধ করেছে ব্যাংক এশিয়া ও ঢাকা ব্যাংক। এর আগে ব্র্যাক ব্যাংকও এই ১০ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে দেয়। ব্যাংক এশিয়া ও ঢাকা ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হল- ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, সিরাজগঞ্জ শপিং, আলাদিনের প্রদীপ, বুম বুম, কিউকম, আদিয়ান মার্ট ও নিডস ডটকম বিডি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুই ব্যাংকের কার্ড বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এটি সাময়িক পদক্ষেপ।

ইভ্যালি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন: বাংলাদেশ ব্যাংক গত বৃহস্পতিবার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ডটকম লিমিটেডের ওপর একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। আট পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

জানা গেছে, ইভ্যালি কার্যক্রম নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিবেদনটি তৈরি করতে ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার একটি দল পাঁচ দিনব্যাপী পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। পরিদর্শন টিমের দলনেতা ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-মহাব্যবস্থাপক। সদস্য ছিলেন- একজন যুগ্ম পরিচালক, তিনজন উপ-পরিচালক ও একজন প্রোগ্রামার। পরিদর্শন দলকে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল, নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ খান, সান সারওয়ার চৌধুরী ও মুরাদ হাসান খুরশীদ এবং ইভ্যালির চিফ মার্কেটিং কর্মকর্তা আরিফ আর হোসাইন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দিন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইভ্যালির কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কর্মকর্তাদের দেখান। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাহকের কাছে এবং পণ্য উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারীদের কাছে বকেয়া বাড়ছে কোম্পানিটির। কোম্পানিটি চলতি দায় ও লোকসানের দুষ্টচক্রে বাধা পড়েছে। ক্রমাগতভাবে এমন দায় তৈরি হয়েছে যে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব টিকে না থাকার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম বছর কোম্পানিটির নিট লোকসান হয় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। গত ১৪ মার্চ প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভ‚ত লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৩১৬ কোটি টাকায়। আগের দায় পরিশোধ ও লোকসান আড়াল করার জন্য কোম্পানিটি ‘সাইক্লোন’, ‘আর্থকোয়েক’ নামের আকর্ষণীয় অফার দিয়ে যাচ্ছে।

এতে আরো বলা হয়েছে, ক্রয়াদেশের ৪৫ কর্মদিবসের মধ্যে পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহককে তার পরিশোধিত মূল্যের পরিবর্তে পণ্যটির বাজারমূল্য ফেরত দিচ্ছে। তাই বিপুলসংখ্যক গ্রাহক বেশি অর্থ ফেরত পাওয়ার আশায় ইভ্যালির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। অদূর ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির দেনা কাটিয়ে ওঠার কোনো গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা বা সম্ভাবনা দেখতে পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল।

গ্রাহকের ২১৪ কোটি টাকা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইভ্যালির গ্রাহক ছিল ৪৪ লাখ ৮৫ হাজার। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির দেনা দাঁড়ায় ৪০৩ কোটি টাকায়। চলতি সম্পদ ছিল মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। এই সম্পদ দিয়ে কোনো অবস্থাতেই কোম্পানিটি দায় পরিশোধ করতে পারবে না। এ ছাড়া পণ্যমূল্য বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম ২১৪ কোটি টাকা নিয়েও পণ্য সরবরাহ করেনি ইভ্যালি। আবার যেসব কোম্পানির কাছ থেকে ইভ্যালি পণ্য কিনেছে, তাদের কাছেও এর বকেয়া পড়েছে ১৯০ কোটি টাকা। চলতি সম্পদ দিয়ে বকেয়া অর্থের মাত্র ১৬ শতাংশ পরিশোধ করা সম্ভব।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনভিত্তিক কোম্পানিটির মোট গ্রাহক ৪৪,৮৫,২৩৪ জন। ক্রয়াদেশ বাতিল, ক্যাশব্যাক, বিক্রিত গিফটকার্ডের সমন্বয়ে এসব গ্রাহকদের ইভ্যালি ভার্চুয়াল আইডিতে মোট ৭৩.৩৯ কোটি টাকা মূল্যমানের ই-ভ্যালু সংরক্ষিত ছিল। অথচ ওই দিন শেষে ইভ্যালি ডটকম লিমিটেডের ১০টি ব্যাংক হিসাবে ছিল ২ কোটি ৪ লাখ টাকা।

একজনের বেতন আট লাখ: ইভ্যালির পরিশোধিত মূলধন এক কোটি টাকা। এর মধ্যে ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেলের মালিকানা ৪০ শতাংশ এবং তার স্ত্রী চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের ৬০ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিপুল লোকসানে থাকলেও এমডি প্রতি মাসে সাড়ে চার লাখ এবং চেয়ারম্যান প্রতি মাসে পাঁচ লাখ টাকা হারে বেতন নিচ্ছেন। এর বাইরে কোম্পানিতে কিছু কর্মকর্তা উচ্চহারে বেতন পান। এমন কর্মকর্তাও আছেন যিনি মাসে আট লাখ টাকা বেতন পান। কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসে বেতন পেয়েছেন ৬২৬ জন।

এক টাকার জন্য সাড়ে তিন টাকা: বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২০ সালের জুলাই থেকে গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত ইভ্যালির মোট আয় (রেভিনিউ) ২৮.৫৪ কোটি টাকা। এই সময়ে কোম্পানিটির সেলস ব্যয় ২০৭ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করেছে, কোম্পানিটি প্রতি এক টাকা আয়ের জন্য তিন টাকা ৫৭ পয়সা ব্যয় করেছে বলে স্টেটমেন্টে প্রদর্শন করেছে এবং এই অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।



poisha bazar

ads
ads