দ্রব্যমূল্য ‘পাগলা ঘোড়া’


poisha bazar

  • এস এম মুন্না
  • ১৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:৩৯

‘দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া ছুটছে তো ছুটছেই। লাগাম পরানো যাচ্ছে না। এর পদতলে প্রতিনিয়তই পিষ্ট হচ্ছে জনজীবন। ব্যয় বাড়ার কারণে অন্যান্য চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যেটা ধরি সেটারই দাম আকাশছোঁয়া। অথচ পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই। থরে থরে সাজানো সব পণ্য। কিনতে গেলে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে।’

সখেদে কথাগুলো বললেন রাজধানীর মগবাজারের আবদুল কুদ্দুছ। আর বাড্ডার সালমা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আজ আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা পড়েছি মহাবিপাকে, যারা কারো কাছে যেতে পারি না, অভাবের কথা বলতে পারি না। তার ওপর আবার রয়েছে করোনার ভয়।

অনেক পরিবারে বাবা-মা ও ছেলেমেয়েসহ কমপক্ষে ছয়-সাতটি পেট, তাহলে সারা দিনে দাঁড়ায় ১৮ থেকে ২১টি প্লেট। চালের টাকা জোগাড় করতেই তো জান শেষ! তার ওপর কাঁচাবাজারে তো এখন ঢোকাই যায় না।’ মধ্যবিত্ত ঘরের এই দুজনের কথায়ই স্পষ্ট কিভাবে কাটছে সাধারণ মানুষের দিন। আর নিম্নবিত্তের অবস্থা তো আরো করুণ।

কাঁচাবাজার পরিস্থিতি: কিছু কিছু সবজির দাম গত সপ্তাহের চেয়ে কিছুটা কমলেও, প্রায় সব ধরনের সবজির দামই বাড়তির দিকে। কার্যকর হয়নি আলুর বেঁধে দেয়া দাম। কমেনি পেয়াজের ঝাঁজও। ফলে সপ্তাহের বাজার করতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা যায় সব সবজির দামই স্বাভাবিকের তুলনায় কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা বেশি। পেঁপে, করলা, বরবটি, ঢেঁড়শের মতো সবজিগুলো বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে।

শীতকালীন সবজি এখনো বাজারে আসেনি। তাই গুনতে হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত দাম। সরকার নির্ধারণ করে দেয়ার পরও আলু গতকাল শুক্রবার বিক্রি হয়েছে ৫০-৫৫ টাকা কেজি দরে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তে দাম না কমার কারণে তাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এবং বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশিতে।

করোনা মহামারীর কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের মানুষের আয় কমে গেছে। তার ওপর প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতেই হিমশিম খাচ্ছেন দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষ। কারো কারো জন্য পরিস্থিতি এতটাই করুণ যে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ন্যূনতম চাল, আলু, ভোজ্যতেল, কাঁচামরিচ, পেঁয়াজও যেন আজ বিলাসবহুল পণ্যের কাতারে।

এই পাঁচটি মূল নিত্যপণ্যের দাম গত দুই মাসে কেজিপ্রতি পাঁচ থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি তিন থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে। বেড়েছে ভোজ্যতেলের দামও। সয়াবিন তেলের পাঁচ লিটার বোতলের দাম ছিল ৪৯৫ থেকে ৫০৫ টাকার মধ্যে। এখন বিভিন্ন বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৫১৫ থেকে ৫৩০ টাকায়।

জয়নাল আবেদিন নামে এক দিনমজুর বলেন, ‘অবস্থা যুদি এমুন থাকে, তাইলে সামনে তো না খায়া থাকন লাগবো।’ রামপুরায় দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন তিনি। স্ত্রী হামিদা বেগম একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। কিন্তু মহামারীর কারণে এখন সেটি বন্ধ। হামিদা এখন একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তিলপাপাড়ার রসুলের বস্তিতে দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন নৈশপ্রহরী রুস্তম আলী।

তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ই পোলাপানের লাইগা ভালো খাওন জোগাড় করা আমাগো জইন্যে কঠিন। এহন অবস্থা আরো খারাপ হইছে।’

আলু এখন ‘স্টার’: হঠাৎ করে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে আলুর দাম। দুই মাস আগেও কেজিপ্রতি আলুর দাম ছিল ২৬ টাকা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ৫০-৫৫ টাকায়। যদিও সরকার ৩০ টাকা কেজি দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তার পরও দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই।

ভারত থেকে রফতানি নিষিদ্ধ হওয়ার পর ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পেঁয়াজের দাম রাতারাতি দ্বিগুণ হয়। এখনো কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম ৯০ টাকা থেকে কমেনি। গত ১৫ আগস্ট কাঁচামরিচের কেজি ছিল ১০৫ টাকা করে। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২৮০-৩০০ টাকা কেজি দরে।

করোনার কারণে এরই মধ্যে আয় কমেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের। বাসাবাড়িতে ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতেন জাহানার বেগম। কিন্তু এখন তেমন এটা বিক্রি-বাট্টা নেই। জীবিকার জন্য বিকল্প উপায় খুঁজছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘৭০ টাকার নিচে তো কোনো সবজিই নাই। শাকের দামও বাড়ছে। কোনোমতো শাক-ডাইল দিয়া দিন চালাই।’

নাগালের বাইরে মাছ-মাংস-ডিম: দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য প্রোটিনের অন্যতম উৎস ডিমের দামও নাগালের বাইরে। এখন একেকটা ডিমের দাম প্রকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ১২-১৪ টাকায়।

খিলক্ষেতের বরুরা টেম্পোস্ট্যান্ডের মুদি দোকানি আলাউদ্দিন মিয়া জানান, এক সপ্তাহ আগে ৮৯০ টাকায় ১০০টি ডিম কিনেছিলেন তিনি। এখন পাইকারি বাজার থেকে ১০০টি ডিম কিনতে হয় ৯২০ টাকায়।

তিনি বলেন, ‘আগে প্রতি ডজন ডিম ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি করলেও এখন ১৪৪ টাকায় বিক্রি করতেছি।’

তবে একটু স্বস্তি দিচ্ছে প্রোটিনের আরেক উৎস ব্রয়লার মুরগি। এক ডজন ডিমের দামে মিলছে এক কেজি ব্রয়লার মুরগি। তবে বরাবরের মতো চড়া রয়েছে দেশি মুরগি, গরু ও খাসির গোশতের দাম। দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে।

গরুর গোশত আকাশ ছুঁইছুঁই। মালিবাগ বাজারে গতকাল ৬৮০ টাকা কেজি দরে গরুর গোশত বিক্রি হতে দেখা গেছে। আবার মেরাদিয়া ও রামপুরা সেই গরুও গোশত বিক্রি হতে দেখা গেছে ৬৪০-৬৫০ টাকায়। খাসির গোশত ৯০০ টাকা।

ইলিশ ধরা বন্ধ হওয়ার পর বাজারে মাছের দাম কিছুটা বেড়েছে। বাজারভেদে গতকাল চাষের কই ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, পাঙ্গাশ ১৫০ টাকা ও তেলাপিয়া ১৬০-১৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে দেখা যায়। দুই কেজি আকারের রুই মাছের কেজি চাওয়া হয় ৩৫০-৩৮০ টাকা।

চিংড়ি, বেলে, বোয়াল, চিতল, আইড়, বাইম ইত্যাদি মাছের প্রতি কেজি ৫০০-৮০০ টাকা। ছোট চিংড়িও ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন বিক্রেতারা। টাকি ৩২০-৩৫০ টাকা, পুঁটি ৩০০ টাকা, পাবদা ২৮০-৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

বিক্রেতারা বলেন, ইলিশ ধরা বন্ধের পর বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। হারুন মিয়া নামের এক বিক্রেতা বলেন, বিভিন্ন জায়গায় বর্ষার পানি নামতে শুরু করেছে। ফলে কিছুদিন পর থেকে মাছ বেশি ধরা পড়বে। তখন দেশি মাছের দাম কমতে পারে।

রামপুরার বাজারে কথা হয় বেসরকারি চাকুরে নজরুল ইসলাম নঈমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাজারে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস উঠেছে। চালের দামও প্রতিদিন বাড়ছে। আলুর কেজি ৫০ টাকা। বাজারে ভালো মানের সবজি ৮০ টাকার নিচে নেই। মুলাও বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে। একটা লেবু ১২টা। তাহলে বোঝেন আমাদের নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের অবস্থা কী রকম।’

ক্রেতারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়াচ্ছেন। সরকারকে কঠোর হাতে অতিলোভী অসাধু এসব ব্যবসায়ীকে দমন করতে হবে। বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যতালিকা টাঙানো এবং নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে কিনা, সেটি পর্যবেক্ষণের জন্য সব বাজারে মনিটরিং কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে।

খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার সালেহীন বাবু বলেন, ‘সব জিনিসের দামই বেড়েছে। কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলব! যেটা ধরি সেটার দামই চড়া। সামনের দিনগুলোর পরিস্থিতি ভেবে রাতে ঘুম হয় না। আগে আলুতে কিছুটা স্বস্তি ছিল, এখন সেটাও তরতর করে বাড়ছে। সরকারের উচিত এখন দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়া।’

স্বস্তি নেই চালের বাজারেও: খাদ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে গত ২৯ সেপ্টেম্বর মিলগেটে সরু ও মাঝারি চালের দাম নির্ধারণ করে দেয়। ঢাকার খুচরা বাজারে অবশ্য দাম কমেনি। প্রতি কেজি ভালো মানের মোটা চালের দাম ৪৯-৫০ টাকা, মাঝারি চাল ৫২ থেকে ৫৪ টাকা এবং সরু চাল ৫৮ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, এ বছর আমন মৌসুমে ৫৬ লাখ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। তা অর্জিত হয়েছে। নভেম্বরের শেষ দিকে নতুন মৌসুমের চাল বাজারে আসতে শুরু করতে পারে। অবশ্য দাম কমা নির্ভর করছে আমনের ফলনের ওপর।

 





ads