সংকটের অজুহাতে বাড়ল চালের দাম


poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:২৫

নানা উছিলায় বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। পেঁয়াজের পর এবার বাড়ার তালিকায় যুক্ত হয়েছে চাল। গত কয়েকদিনে বাজারে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। চালের বাজারে নতুন সংকট দেখা দিয়েছে, আর সেটি হচ্ছে- গরিব মানুষের মোটা চালের সরবরাহ কম। ফলে চাপ পড়েছে সব ধরনের চিকন চালের ওপর।

তবে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার আবারো হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘চালের বাজার নিয়ে কেউ কারসজি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। পর্যাপ্ত চাল মজুদ আছে। তাই চাল নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি সরকার বরদাশত করবে না।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ কারণেই নাকি বেড়েছে চালের দাম। বাজার ও মান ভেদে প্রতিকেজিতে চালের দাম বেড়েছে ৪ থেকে ৬ টাকা। ৫৪ টাকা কেজি দরের মাঝারি মানের মিনিকেট চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে। আর ৫৬ টাকা কেজি দরের নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৬২ টাকা করে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে চিত্র তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, চালের এই মূল্য বৃদ্ধির পেছনে কোনো ধরনের কারসাজি নেই। চালের দাম বাড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে- প্রথমত, চালের চলতি মৌসুম শেষের দিকে। দ্বিতীয়ত, এবার সারাবছর কেটেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে। প্রথমে হলো শিলাবৃষ্টি। এরপর ঘূর্ণিঝড় আমফানের ছোবল। তারপর দেশের ৩৩ জেলাজুড়ে বন্যা, যা এখনো চলছে।

বছরজুড়ে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) তাণ্ডব তো রয়েছেই। এর বাইরে এ বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণও বেশি। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। এসব কারণে বাজারে ধানের সরবরাহ কমে গেছে বিধায় দামও বেশি। ধানের দাম বেশি হলে চালের দাম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক- এমন দাবি ব্যবসায়ীদের।

রাজধানীর চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিনিকেট চালের দাম বাড়লে তা সব ধরনের চালের দামের ওপরে প্রভাব ফেলে। কারো কারো অভিযোগ, মিনিকেট চালের দাম বাড়ানোর পেছনে এই চালের উদ্ভাবক কুষ্টিয়ার আবদুর রশিদ দায়ী, যিনি ‘মিনিকেট রশিদ’ নামে পরিচিত। আবদুর রশিদ তার মিনিকেট চালের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন বলে বাজারে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে আবদুর রশিদ বলেন, ‘গত ছয় মাসে আমরা মিনিকেট চালের দাম বাড়াইনি। বাজারে যদি আমার মিনিকেট চালের দাম বেড়ে থাকে, তাহলে তা অন্য কারো কারসাজিতে বেড়েছে। যা আমি জানি না। তবে ধানের সংকট রয়েছে। কারণ, সিজন শেষ। এতে চালের বাজার কিছুটা বাড়তি হতে পারে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির হিসাবে, গত এক বছরে গরিব মানুষের মোটা চালের দাম বেড়েছে ২৭ শতাংশ। চিকন চালের দামও বেড়েছে ১৪ শতাংশ। মাঝারি মানের বিভিন্ন চাল বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ৪৮ থেকে ৫৩ টাকা। আর প্রতিকেজি চিকন মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে বাজারভেদে ৫৬ থেকে ৬০ টাকা। টিসিবির হিসাবে, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এখন মাঝারি মানের চালের দাম ৯ শতাংশ ও সরু চালের দাম ১৫ শতাংশ বেশি।

টিসিবির তথ্যমতে, শুধু চালই নয়, ডাল, তেলসহ সব ধরনের পণ্যের দাম এখন বাড়তি। সরকারি এই সংস্থা জানায়, গড়ে ২০টি পণ্যের মধ্যে ১৭টি পণ্যের দামই বেশি ও বাড়তি।

জানা গেছে, আড়তে চিকন চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, যা আগে ছিল ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা। আর মাঝারি মানের চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৪ টাকা, যা আগে ছিল ৪০ থেকে ৪২ টাকা।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী জানিয়েছেন, চালের বাজারে কারোর কোনো কারসাজি নাই। ধানের মৌসুম শেষের দিকে। এখন বাজারে ধান নাই। এবার বছরজুড়েই একটার পর একটা দুর্যোগ লেগেই রয়েছে। প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে। কারোনার তাণ্ডব তো আছেই। এসব কারণে বাজারে ধানের সরবরাহ কম, দামও বেশি। ধানের দাম বেশি হলে তো চালের দাম বাড়বে।

আইসিডিডিআর,বি এবং ওয়াল্টার এলিজা হল ইনস্টিটিউট-অস্ট্রেলিয়ার এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় বছরজুড়ে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সারাদেশ লকডাউনে থাকার কারণে ৯৬ শতাংশ পরিবারের গড় আয় কমেছে। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে গত মার্চের শেষের দিকে সাধারণ ছুটি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ার কারণে দেশে ৯৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। ব্র্যাকের জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫১ শতাংশের কোনো আয় নেই এবং কাজ হারিয়েছেন ৬২ শতাংশ নি¤œ আয়ের মানুষ। এছাড়া, ২৮ শতাংশ মানুষ মহামারীর কারণে অর্থনৈতিকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘করোনার কারণে মানুষ নানা ধরনের সংকটে রয়েছেন। মানুষের আয় নাই। হাতে জমানো টাকা শেষ হয়ে গেছে। এ সময় অনেকেই কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এমন অবস্থায় কোনো মহলের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়াটা দুঃখজনক। এক্ষেত্রে সরকারের নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করি।’

 





ads