খুচরা বাজারে ঝাঁজ কমেনি পেঁয়াজের 


poisha bazar

  • এস এম মুন্না
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:০৫,  আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:৩৮

পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম কমলেও খুচরা বাজারে কোনো প্রভাব পড়েনি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকা কেজি দরে। বড়-ছোট মেলানো পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৯০ টাকায়। আমদানি করা পেঁয়াজ ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারিতে দেশি পেঁয়াজ ৭০-৭৭ টাকা বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে। ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি ৬০ টাকা।

রাজধানীর প্রধান দুই পাইকারি বাজার শ্যামবাজার ও কারওয়ান বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, গত দুই দিনে কেজিতে দেশি পেঁয়াজের দাম ৫-৭ টাকা কমেছে। সবচেয়ে ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭৭ টাকা কেজি দরে। ছোট সাইজের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। বুধবার দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ৮০ থেকে ৮৫ টাকা।

পাইকারিতে দাম কমার পরও খুচরা বাজারে দাম না কমার কারণ উল্লেখ করে শাহজাহানপুর কাঁচাবাজারের আবদুর রহমান বলেন, ‘পেঁয়াজ আমরা প্রতিদিন আনি না। মঙ্গলবার কেনা ছিল ৯০ টাকার ওপরে। সে কারণে এখনো সেই পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি করছি। আজও (গতকাল) মোকাম থেকে জেনেছি, তারা ৮৫ টাকা করে বিক্রি করছে। ফলে সব খুচরা ব্যবসায়ী পেঁয়াজ ১০০ টাকা করেই বিক্রি করছেন।ভারত থেকে আসা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গত সোমবার থেকে মঙ্গলবারের মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় দাম বাড়িয়ে দেশি পেঁয়াজ ১০০ টাকা আর  আমদানি করা পেঁয়াজ ৭৫-৮০ টাকায় বিক্রি করছে। অথচ আড়ত, পাইকারি বাজার, খুচরা বাজার কোথাও পেঁয়াজের ঘাটতি নেই।

গত মঙ্গলবারের সেই আতঙ্কের কেনাকাটা শুক্রবার দেখা যায়নি। করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আয় কমে যাওয়া ভোক্তা এখন পণ্য কিনছেন খুব হিসাব করে। বেশ কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে আধা ঘণ্টায় এক কেজি পেঁয়াজও বিক্রি করতে দেখা যায়নি অনেক দোকানিকে।

মিয়ানমার থেকে এসেছে ২৭ টন: আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধি ফরহাদ ইকবাল জানান, কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে ২৭ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। স্থলবন্দর কাস্টমস সূত্র জানায়, গতকাল মিয়ানমার থেকে স্থলবন্দরে ২৭ মেট্রিক টন পেঁয়াজ বোঝাই একটি ট্রলার বন্দরে ভিড়েছে। মেসার্স আরাফাত ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান পেঁয়াজগুলো আমদানি করে।

আমদানিকারক মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য পেঁয়াজ আমদানির এই ধারা অব্যাহত থাকবে।টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন জানান, মিয়ানমার থেকে ২৭ মেট্রিক টন পেঁয়াজভর্তি একটি ট্রলার টেকনাফ স্থলবন্দরে এসে পৌঁছলেও এখনো খালাস করা হয়নি।

টেকনাফ স্থলবন্দরের ব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘২৭ মেট্রিক টন পেঁয়াজ দ্রুত সময়ে খালাসের চেষ্টা চলছে।’ 

সীমান্তে ট্রাকে ‘পচছে’ পেঁয়াজ: ভারত সরকার রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার আগে খোলা এলসির পেঁয়াজ নিয়ে সীমান্তের ওপারে আটকে আছে বহু ট্রাক। পেঁয়াজে পচন ধরলেও সেগুলো বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে না।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান জানান, ‘সোমবার যখন পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা এলো, তখন পেট্রাপোল বন্দরে পেঁয়াজবোঝাই পাঁচটি ট্রাক আটকা পড়ে। এসব ট্রাকের গেটপাস থাকলেও এখন আর এপারে আসার অনুমতি দিচ্ছে না ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।’ 

বনগাঁয় আরো ৩৯টি ট্রাক এবং রানাঘাট রেলস্টেশনে তিনটি রেল ওয়াগন পেঁয়াজ নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত এক সপ্তাহ আগে রেলের এই পেঁয়াজগুলো ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে রানাঘাট স্টেশনে আনা হয়। ওয়াগনগুলো সরাসরি বেনাপোলে আসবে না; সেখান থেকে ট্রাকে তুলে বেনাপোল আনার কথা ছিল। কিন্তু ভারত সরকার রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত দেয়ার পর সেগুলো আটকা পড়ে বলে জানান সাজেদ।

তিনি বলেন, ‘আটকে থাকা এসব পেঁয়াজে পচন ধরেছে। দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে বলে রফতানিকারকরা আমাকে জানিয়েছেন।’দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের ওপারেও এ রকম প্রায় ২০০ ট্রাক পেঁয়াজ নিয়ে আটকে আছে বলে খবর দিয়েছে ভারতীয় বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার।

হিলি এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক অশোক মণ্ডলের বরাতে পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সেসব ট্রাকে প্রায় দশ কোটি রুপির পেঁয়াজে পচন ধরার অবস্থা হয়েছে।’বাংলাদেশের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রয়েল এন্টারপ্রাইজের মালিক রফিকুল ইসলাম রয়েল বলেন, প্রতি মেট্রিক টন ২৫০ ডলার মূল্যে ৭৪০ মেট্রিক টন পেঁয়াজের ঋণপত্র (এলসি) দেয়া আছে তাদের। কিন্তু গত সোমবার মাত্র এক ট্রাক পেঁয়াজ বেনাপোলে ঢোকার পর বন্ধ হয়ে যায়। এখন বন্দর এলাকায় থাকা পেঁয়াজ বোঝাই ট্রাকগুলোর বিষয়ে তারা দু-এক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত না নিলে পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যাবে। তাতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

পেট্রাপোল বন্দর সিঅ্যান্ডএফ স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চ্যাটার্জি বলেন, ‘পেঁয়াজের কতগুলো ট্রাক আটকে আছে তা তারা দিল্লিকে জানিয়েছেন। কিন্তু সেখান থেকে কোনো নির্দেশনা এখনো তারা পাননি।’

ওপারের ব্যবসায়ীদের বরাতে বেনাপোল আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি করতে তাদের আপত্তি নেই। বাজারদরে এলসি পেলে তারা আবার রফতানি শুরু করবেন। তারা বলছেন, প্রতি মেট্রিক টন ২৫০ ডলার দরে আগে যেসব এলসি খোলা হয়েছিল, তা সংশোধিত মূল্যে এবং নতুন এলসি ৭৫০ ডলার দরে করা হলে পেঁয়াজের আমদানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হতে পারে।’

বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক মামুন কবির তরফদার বলেন, ‘সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যেও পেঁয়াজ নেয়ার জন্য আমরা সবসময় প্রস্তুত আছি। তবে এখন পর্যন্ত পেট্রাপোল বন্দর আমাদের কিছু জানায়নি।’

আটকে থাকা পেঁয়াজ ছাড়া পাবে আজ: আমাদের হিলি (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, আজ শনিবার হিলি স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশ করতে পারে সীমান্তের ওপারে অপেক্ষমাণ পেঁয়াজবাহী ট্রাক। পাঁচ দিন আটকে থাকার পর অনুমতি সাপেক্ষে ট্রাকগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। ভারতীয় রফতানিকারকরা বাংলাদেশি আমদানিকারকদের এই তথ্য জানিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে ভারত সরকার গত সোমবার থেকে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করায় এসব ট্রাক বাংলাদেশে ঢুকতে পারেনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাপ সৃষ্টি করছি ও ভারতীয় রফতানিকারকরাও চাপ সৃষ্টি করছেন, অন্তত যে ট্রাকগুলো পেঁয়াজ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই পেঁয়াজগুলো আপাতত দেয়া হোক। আমাদের যে ১০ হাজার টনের এলসি দেয়া ছিল, আমরা সে বিষয়ে চেষ্টা করছি ও রফতানিকারকদের চাপ সৃষ্টি করছি যাতে দ্রুত সেই পেঁয়াজগুলোও যেন বাংলাদেশে রফতানি করা হয়। শুধু ভারতের ওপর মুখাপেক্ষী হয়ে না থেকে আমরা ইতোমধ্যে পাকিস্তান, মিসর, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে পেঁয়াজের এলসি খুলেছি, যা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে চলে আসবে। তাতে পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।’

পেট্রাপোলে ১৫০ পেঁয়াজবাহী ট্রাক: আমাদের বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি ফারুক হাসান জানায়, ‘ঋণপত্র বা এলসিতে মূল্যবৃদ্ধি করা হলে ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি করবে বলে বেনাপোলের একজন আমদানিকারক নিশ্চিত করেছেন।

ভারতীয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী টেলিফোনে জানান, এর আগে ৩০০ ডলারে যেসব এলসি দেয়া ছিল সেসব এলসির পেঁয়াজ রফতানির সিদ্ধান্ত জানতে বৃহস্পতিবার দিল্লিকে চিঠি দেয়া হয়েছে। আজ শনিবার সুখবর পাওয়া যেতেও পারে। বাংলাদেশে রফতানির অপেক্ষায় ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১৫০টি পেঁয়াজবাহী ট্রাক।’

গতকাল শার্শা উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কঠোর নজরদারির মাধ্যমে পেঁয়াজের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে বেশ কিছু পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

ক্রেতাদের দায়ী করল দোকান মালিক সমিতি: গতকাল ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতি আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আমদানিকারক ওমর ফারুক বলেন, ক্রেতাদের হুড়োহুড়ির কারণে দাম বেড়েছে। তারা যদি একটু সহনীয় আচরণ করতেন তবে এতটা দাম বাড়ত না।

তিনি বলেন, ‘কারওরান বাজারে যতটুকু চাহিদা ততটুকুই মাল আসে। আর আপনি-আমি কী করেছি, আমার দুই কেজি দরকার, কিন্তু কিনে ফেলছি ১০ কেজি। আপনি যদি আমাকে ২০০ টাকার জিনিসে ৩০০ টাকা দেন, তাহলে আমার নিতে অসুবিধা কোথায়? ঠিক যারা বিক্রি করছে তারা যখন দেখল, ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এবং যত দাম চায় তত দিয়েই নিচ্ছে, যে কারণে এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। এটা আমার এবং আপনার বা জনগণের কারণেই ঘটছে। জনগণ এত বেশি নেয় কেন? একটু কমিয়ে নেন।’

এই আমদানিকারক অভিযোগ করে বলেন, ‘বিদেশ থেকে বন্দরে পেঁয়াজ আসার পর সারাদেশে যদি ১০০ কন্টেইনার প্রয়োজন হয়, সেখানে মাত্র ২০টি কন্টেইনার খালাস করা হয়। ফলে বাজারে যেখানে দাম কেজিতে ২০০ টাকা উঠেছে, সেটা থেকে আর নামতে দেয় না। সেখানে সরকারের করণীয় হচ্ছে বন্দরে পেঁয়াজের কন্টেইনার তিন দিনের বেশি থাকতে পারবে না। সরকার কোটি টাকা ভর্তুকি না দিয়ে আমদানিকারকদের ভর্তুকি দিতে পারে।’

সমিতির সভাপতি তৌফিক এহসান বলেন, ‘আমরা সারা দেশে মনিটরিং সেল গঠন করতে যাচ্ছি। যেখানে দাম সীমারেখার বাইরে চলে যাবে, সেখানে তাদের পর্যবেক্ষণে এনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হবে।’

মতবিনিময় সভায় সমিতির সহ-সভাপতি আবুল কাশেম ঝন্টু, এমএ ইসলাম, ইসহাক ভূঁইয়া, সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

 





ads