এবারের ঈদের অর্থনীতি


poisha bazar

  • ০১ আগস্ট ২০২০, ১০:১০

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজের পাশব প্রবৃত্তি, অসৎ উদ্দেশ্য ও হীনম্মন্যতাকেই কোরবানি করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই বিশেষ ঈদ উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তিকে সংশোধন করার সুযোগ আসে। জীবজন্তু উৎসর্গ করাকে নিছক জীবের জীবন সংহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের পাশব প্রবৃত্তিকে অবদমন প্রয়াস প্রচেষ্টারই প্রতীকী প্রকাশ।

বিগত চার মাস করোনা ভাইরাসে ব্যক্তি পরিবার সমাজ দেশ ও অর্থনীতি গৃহবন্দি, আতঙ্ক আশঙ্কার জীবনযাপনে মৃত্যুর মিছিল যখন তুঙ্গে তখন বন্যা বাংলাদেশে প্রলয়ঙ্করী রূপে অগ্রসরমান তখন এবারের ঈদুল আজহার উৎসব সত্যই ম্রিয়মাণ। এমন বিব্রতকর অবস্থায় ঈদ এর আগে কখনো আসেনি।

করোনাকালের এই সম্মোহিত সময়ে এবার ঈদুল আজহা কিভাবে পালিত হবে তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনা। ঈদ উৎসবে উৎসর্গের সকল আয়োজন আপ্যায়নের মর্মবাণীই হলো সামাজিক সমতা -সখ্যতা বৃদ্ধি এবং সম্পদ, সুযোগ ও সৌভাগ্যকে বণ্টন ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা, ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে যা নিয়ামক ভূমিকা পালন করে।

করোনা ও বন্যার দাবিও তাই। কিন্তু কোথায় সেই মূল্যবোধের সম্মিলন। করোনা মোকাবিলার নামে বা সময়ে ‘নিজের আখের গোছানোর’ অন্ধ প্রবৃত্তির প্রকাশ দেখে, স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনায় মানুষের অসহায়ত্ব দেখে, সামাজিক ট্যাবু সৃষ্টির উম্মাদনা দেখে, বানভাসি মানুষের অসহায়ত্ব দেখে, বেদনার্ত বন্যার্তদের দুর্দশার বিবরে ঈদ উদযাপন প্রকৃতপ্রস্তাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিই নির্দেশ করে।

ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি উপলক্ষে জাতীয় অর্থনীতিতে এক ব্যাপক আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে হয়ে থাকে। গত বছর ২০১৯ সালে ঈদুল আজহার অর্থনীতি ছিল পিআরআইয়ের তথ্যমতে, ৪৫ হাজার কোটি টাকা; সেবার ১ দশমিক ০৫ কোটি গবাদি পশু জবাই হয়েছিল, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মতে, গবাদি পশু বিক্রি হয়েছিল ২৮ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার; বাকি ১৫-১৬ হাজার কোটি টাকা ছিল পরিবহন, পর্যটন এবং বিভিন্ন পণ্যাদি বিক্রি থেকে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব মতে, এবার ২০২০ সারে কোরবানির জন্য তৈরি প্রাণীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ। করোনাকালীন গত কয়েক মাসে অবিক্রীত পশুর সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ লাখ, যা বাজারে আসার অপেক্ষায় আছে। তার সঙ্গে গত বছরের হাটে তোলা অবিক্রীত প্রায় ১০ শতাংশ। অর্থাৎ এমনিতেই এবার চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ অনেক বেশি।

মাংস বিক্রেতা সমিতির সূত্র মতে, করোনায় আয় কমে যাওয়ার কারণে গবাদি পশুর চাহিদা প্রায় ৩০ শতাংশ কমবে বলে ধরে নেয়ার পরও পশুর চাহিদা হবে ৮০ লাখেরও বেশি। চাহিদা কমে যাওয়ায়, পশু বিপণন, কোরবানি ও মাংস বিতরণ তিন পর্যায়েই স্বাস্থ্য বিধি পরিপালনের আবশ্যকতাহেতু কোরবানির পর প্রায় সমপরিমাণ পশু অবিক্রীত থেকে যাবে। এর ফলে খামারিসহ ক্ষুদ্র ব্যক্তি উদ্যোগে বিনিয়োগকৃত অর্থ উদ্ধার সীমিত হয়ে যাবে। এমন আপৎকালীন পরিস্থিতিতে উদ্বৃত্ত পশু সম্পদকে বিকল্প কোন ব্যবস্থাপনায় মাংস রফতানির পথ পন্থা অনুসন্ধান উদ্যোগ গৃহীত হতে পারে।

সরকারি ও বেসরকারিভাবে অনলাইনে পশু ক্রয় বিক্রয় এমনকি মাংস ব্যবস্থাপনার যে উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে তা স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাবে, তবে সে ব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে উঠতে সময় লাগবে। আশা করা যায় আগামী বছরের মধ্যে দেশে এ ধরনের পদ্ধতি প্রক্রিয়াকরণ পরিবেশ গড়ে উঠবে। অনলাইন ব্যবস্থাপনায় যাতে প্রতারণা ও অব্যবস্থাপনা অনুপ্রবেশ না করতে পারে সেদিকে সকলকেই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে ব্যবস্থাপনাটি টেকসইকরণের স্বার্থে।

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। আমাদের অথীনীতিতে বিশেষ করে রফতানি বাণিজ্যে, পাদুকা শিল্প, পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই চামড়া সংগ্রহ সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণের সাথে ১০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো প্রতি বছর প্রায় ৮০০ কোটি এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো ১০০-১২০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ দিয়ে থাকে। চামড়া ব্যবসাকে উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। পত্রিকান্তরে প্রতিবেদনে প্রকাশ প্রতিবেশী দেশ থেকে বাকিতে গরু সরবরাহ করা হতো কম দামে কাঁচা চামড়া পাচারের প্রত্যাশায়। সেই চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করে বেশি দামে বিদেশে রফতানির মুনাফা অর্জন হতো তাদের।

এবার এ খাতে সে সুযোগ বাংলাদেশকে কাজে লাগাতে হবে। দেশে নিজেদের চামড়া প্রক্রিয়াকরণ এবং উপযুক্ত মূল্যে তা রফতানির প্রণোদনা সৃষ্টি করেই এ পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতিলাভ ঘটতে পারে। লবণ চামড়া সংরক্ষণের একটি অন্যতম উপাদান। সরকারকে সাধারণত প্রায় ৪০ হাজার টন লবন শুল্কমুক্ত আমদানির উদ্যোগ নিতে হয় যাতে সিন্ডিকেট করে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়।

লেখক : সাবেক সচিব এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান





ads






Loading...