৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১২ জুন ২০২০, ০০:২২,  আপডেট: ১২ জুন ২০২০, ০০:৪৬

আগামীর কাঙ্ক্ষিত ভিত রচনা করে করোনা মহামারীর কারণে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রত্যয়ে জাতীয় সংসদে পেশ করা হয়েছে ২০২০-২১ অর্থবছরের মেগা বাজেট। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মানুষকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি তাদের অন্ন-বস্ত্র জোগাতে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছে এই বাজেটে।

‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’ শিরোনামে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই বাজেট গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অর্থনীতির ঘোর অমানিশা কাটাতে এবারের বাজেটে কালো টাকা ঢালাওভাবে সাদা করার সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো, বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ, বিলাস সামগ্রী এবং তামাকজাতীয় পণ্যে ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে ঘাটতি পূরণে।

অন্যদিকে অভাবগ্রস্ত, বেকার, চাকরি হারানোসহ নানা কারণে আয় কমে যাওয়া মানুষদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। দেশের ৪৯তম, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের ২১তম এবং একাদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এই বাজেটে কমানো হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় অধিকাংশ পণ্যের দামও। করোনা বিপর্যস্ত দেশের মানুষের কথা মাথায় রেখে ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের আশায় এবারের বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। আর পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা।

অর্থাৎ আগের বছরের চেয়ে এবারের বাজেট ৪৪ হাজার ৮১০ কোটি টাকা বেশি। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ১ কোটি ৮৯ লাখ ৯৯৭ কোটি টাকা। মোট আয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৮২ হাজার ১৬ কোটি টাকা। মোট রাজস্ব ৩ কোটি ৭৮ হাজার ৩ কোটি টাকা। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

এর আগে গতকাল বেলা তিনটায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। বাজেট উপস্থাপনকালে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানসহ মন্ত্রী এবং এমপিরা উপস্থিত ছিলেন। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে বেশির এমপিই এবার মুখে মাস্ক পরে বসেছিলেন। বাজেট পেশ উপলক্ষে অন্যান্যবারের মতো অধিবেশন কক্ষ কানায় কানায় পূর্ণ না থাকলেও সরকারি দল আওয়ামী লীগ, সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপিসহ বেশির ভাগ এমপিই সংসদ কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। তবে স্বাভাবিক সময় বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের ক‚টনীতিক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ গণ্যমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। এবার কাউকে দাওয়াতও দেয়া হয়নি।

বাজেট পেশ উপলক্ষে গতকাল জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় নেয়া হয়েছিল বাড়তি নিরাপত্তা। বৈধ পাস ছাড়া আর কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি সংসদ ভবন এলাকায়। গণমাধ্যমকর্মী ও দর্শক গজ্ঝালারিতেও জন্য কোনো পাস ইস্যু হয়নি। র‌্যাব-পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থার বিপুলসংখ্যক সদস্য পুরো ভবনে নিরাপত্তা ঘেরাটোপ গড়ে তোলেন। বেলা ৩টা ১৮ মিনিটে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে মেগা বাজেট প্রস্তাব পড়া শুরু করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বাজেট বক্তৃতায় কালো টাকা ঢালাওভাবে সাদা করার সুযোগ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রচলিত আইনে যা-ই থাকুক না কেন, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা যেকোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর প্রদান করে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না।

এ ছাড়া একই সময় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ করলে, ওই বিনিয়োগের ওপর ১০ শতাংশ কর প্রদান করলে, আয়করসহ কোনো কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন করবে না। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “কোভিড-১৯ মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে ২টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ শীর্ষক প্রকল্প এবং অপরটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় ১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কোভিড-১৯ রেসপন্স ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স’ শীর্ষক প্রকল্প। এ দুটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ফলে কোভিড মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।”

তিনি বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা খাত ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সংক্রান্ত কার্যক্রম ১৩টি মন্ত্রণালয়/বিভাগ বাস্তবায়ন করছে। আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

বাজেট বক্তৃতার আগে সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেয়া হয়। প্রতিবছর বাজেট উত্থাপনের আগে রেওয়াজ অনুযায়ী এই বৈঠকটি সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন পাওয়ার পর বাজেট বিলে স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ।

উৎসবমুখর সংসদে বাজেট বক্তৃতা শুনতে আসেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সংসদে নিজ কক্ষে বসে বাজেট উপস্থাপন প্রত্যক্ষ করেন তিনি। এর আগে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভবনে স্বাগত জানান সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এদিকে করোনাকালীন এই দুঃসময়ে আয়ের মূল উৎস রাজস্ব আদায় তলানিতে ঠেকলেও বেড়েছে ব্যয়ের খাত। তাই প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরে সরকার বৈদেশিক অনুদান পাবে ৪ হাজার ১৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সরকারের আয় হবে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হচ্ছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

এনবিআর-বহির্ভূত কর থেকে রাজস্বে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কর ছাড়া রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আয় ও ব্যয়ের এ বিশাল ফারাকে এবারই প্রথম দেশের ইতিহাসে মোট বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগের বছরগুলোতে সাধারণত জিডিপির ৫ শতাংশ হারে ঘাটতি ধরে বাজেট প্রণয়ন করা হতো।

এবারের বাজেটে সরকার মোট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। চলতি বাজেটে যা ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। আবার সংশোধিত বাজেটে সেটি কমিয়ে করা হয় ৫ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। বাজেটে সরকার পরিচালন ব্যয় বাবদ খরচ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ রাখা হচ্ছে ৫৮ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা।

বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। সম্পদ সংগ্রহ, ভ‚মি অধিগ্রহণ, নির্মাণ ও পূর্ত কাজ, শেয়ার ও ইক্যুইটিতে বিনিয়োগ ইত্যাদি পরিচালন বাবদ মূলধন ব্যয় হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। খাদ্য হিসাব বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ৫৬৭ কোটি টাকা। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে ঋণ ও অগ্রিম (নিট) বাবদ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৪ হাজার ২১০ কোটি টাকা।

এছাড়া উন্নয়ন ব্যয় বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এডিপি বহির্ভূত বিশেষ প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত নয় এবং নিজস্ব উৎসের রাজস্ব থেকে অর্থায়নকৃত উন্নয়নমূলক কর্মসূচি তথা স্কিম বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। এছাড়া এডিপি-বহির্ভূত কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা।

 

 





ads






Loading...