টাকাও এখন দামি


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৬:৫৬

কবিতা রাণী মৃধা: মার্কিন ডলারের মতো টাকার দামও ধীরে ধীরে বাড়ছে। ডলারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার দরও বেড়েছে। ব্যাংকগুলো আগের চেয়ে বেশি সুদে অন্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার করছে। আবার কোনো কোনো ব্যাংক আমানতের সুদও বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতি হয়েছে মূলত ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের জন্য। কারণ, ডলার বিক্রি করে ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক তুলে নিয়েছে।

এ ছাড়া নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সঞ্চয় কমিয়ে দিয়েছেন মানুষ। অনেকে সঞ্চয় ভেঙে জীবন চালানোর খরচ সামাল দিচ্ছেন। ব্যাংকের ঋণ আদায়ও তলানিতে নেমেছে। এতে ব্যাংকগুলো পড়েছে বিপাকে। কারণ, ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ নির্দিষ্ট করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে সব ব্যাংক চাইলেও আমানতে বেশি সুদ দিতে পারছে না। পরিস্থিতি সামলাতে খুচরা ঋণে (রিটেইল) সুদহার ১২ শতাংশ পর্যন্ত নিতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা বা চিঠি দিচ্ছে না। ফলে সুদহার বাড়ানো নিয়ে ব্যাংকগুলোও সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিকে সামাল দিতে সুদহার বাড়ানো জরুরি হলেও এতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সম্মতি মিলছে না। তাই কোনো লিখিত নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব নয়। ডলার কিনতে ব্যাংকগুলোর অনেক টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। ইতিমধ্যে ডলার কিনতে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে গেছে।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, এমডি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ডলার কিনতে ব্যাংকগুলোর অনেক টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। ইতিমধ্যে ডলার কিনতে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে গেছে। আবার জীবন চালানোর খরচ বেড়ে গেছে। ফলে মানুষ সঞ্চয় কমিয়ে দিয়েছেন, অনেকে সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। এ জন্য আমানতের সুদহার বাড়াতে হচ্ছে অনেক ব্যাংককে। তবে ব্যাংক খাতে কোনো তারল্য সংকট নেই।’

টাকার চাহিদা বাড়ায় অনেক ব্যাংক আমানতে সুদ বাড়িয়েছে। যে ব্যাংক যত দুর্বল ও বেশি চাহিদা, তাদের সুদও তত বেশি। আবার এসব ব্যাংক এ সময়ে আমানত ধরতে নিয়ে এসেছে বিশেষ আয়োজন। কর্মকর্তাদের আমানত আনার জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। আবার ৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত আনছে তারা।

এখন ঋণে সর্বোচ্চ সুদ ৯ শতাংশ। ৮ শতাংশ সুদে যেসব ব্যাংক আমানত আনছে, তারা কীভাবে ব্যবসা করছে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, আমানতের সুদের সঙ্গে রয়েছে পরিচালন খরচ। আবার মুনাফাও করতে হয়। এদিকে এখন এক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে কলমানিতে টাকা ধার করতে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। এক বছর আগে যা ছিল ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর ৭ দিন মেয়াদের জন্য টাকা ধারে সুদ সাড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকও নিয়মিত ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে রেপোর মাধ্যমে টাকা ধার দেওয়া বাড়িয়েছে। প্রয়োজনে বিশেষ তারল্য সহায়তাও দিচ্ছে। এতে সুদহার ধরছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এভাবে গত বৃহস্পতিবার টাকা ধার দিয়েছে ১১ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। ‘মূল্যস্ফীতি বাড়ায় আমরা ইতিমধ্যে কিছু আমানত পণ্যের মুনাফার হার বাড়িয়েছি। আশা করছি, বিনিয়োগের মুনাফার হারও বাড়বে।’

তাছাড়া বাংলাদেশে বাড়ছে অর্থপাচার। এতে সাধারণ জীবনে আসছে নানা অসুবিধা। আর করোনার সময় আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল কৃষি। কিন্তু এবার সময়ও প্রতিক‚ল। বন্যা, অনাবৃষ্টি, দাবদাহ, পানির স্তর নেমে যাওয়া, সরঞ্জামের দাম বৃদ্ধি-এসব কারণে এবার আশানুরূপ ফলন হবে না। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই বিপৎসংকেত জারি করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, তেলের দাম বৃদ্ধি, কোভিড, জলবায়ুর জন্য প্রায় ৮২ কোটি মানুষ সারা বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় আছে। ফলে অনেক দেশ খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অর্থ আর আমরা অনেক কিছুর জন্যই বাইরের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আর কেবল তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর ভরসা করে আমরা বিলাসিতা দেখিয়েছি। কিন্তু সব ব্যবসারই উন্নয়নের পর মন্দা পর্যায় আসে, আরও খারাপ হলো ডিপ্রেশন। আমাদের দেশ এখন যদি খারাপ দিকে যায়, মন্দা পর্যায়ে যাবে, শ্রীলঙ্কা আছে ডিপ্রেশনে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে টাকার দাম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে আর টাকার মূল্য কমছে।

আর এই প্রতিকূল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের করণীয় হচ্ছে, ব্যাংক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডলারের প্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করা। প্রণোদনা ও বিভিন্ন সুযোগ দিয়ে আনার চেষ্টা করা বাইরে থেকে রেমিট্যান্স আর পাচার করা টাকা ফেরত আনার মাধ্যমে। এগুলোতে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ হলেও বেশি সময় নিয়ে টিকিয়ে রাখা কঠিন আমাদের এই দুর্ভোগ। তাই এখন সময় সবার ঐক্যের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা, সঠিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা। কৃষিতে গুরুত্ব দেওয়া, বিলাসপণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা, অদরকারি খরচ বাদ দেওয়া, অপচয় কমানো, নতুন রপ্তানির খাত খুঁজে বের করা, তার চেয়ে বেশি দরকার বিভিন্ন বিষয়ের সরকারি, বেসরকারি এক্সপার্ট আর একাডেমেশিয়ানদের নিয়ে কমিটি করে সম্ভাব্য বিপদের আগেই যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রাখা। আমরা সাধারণ মানুষ শুধু অপচয় আর খরচটাই কমাতে পারি, বাকি সব সরকারের হাতেই। যেকোনো বিপদ নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করে, কথা হচ্ছে আসন্ন বিপদ থেকে আমরা সুযোগ বের করে নিতে পারব কি না!

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar