পরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন প্রয়োজন


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৬:৩৮

মাজহার মান্নান: ২২ বছর যাবৎ শিক্ষকতা পেশায় আছি। শিক্ষার নানাদিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা একেবারে কম হয়নি। শিক্ষা খাতের গভীরের ক্ষতগুলো খুব কাছ থেকে দেখার ও বুঝার সুযোগ হয়েছে।  ছোটবেলায় কবিগুরুর তোতাকাহিনী পড়েছিলাম। তখন বিষয়টির গভীরতা নিখুঁতভাবে বুঝতে না পারলেও শিক্ষকতা পেশায় এসে সেটা বুঝতে পেরেছি। শিখন এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির দুর্বলতাগুলো কোথায় তা তোতাকাহিনী পড়েই বুঝতে পেরেছি। উপমহাদেশের মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে কবিগুরু সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি মনে করতেন মুখস্থনির্ভর শিক্ষা জীবনের কোনো কাজে আসে না, শুধু একটি স্বীকৃত সনদ অর্জিত হয় মাত্র। পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়েও কবিগুরুর অনেক বিশ্লেষণী পর্যবেক্ষণ ছিলো।

শিখন, প্রশ্নের ধরন, পরীক্ষা পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। শিক্ষার অ-আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে  মৌখিক প্রশ্ন করার মাধ্যমে মেধা ও যোগ্যতা ও জ্ঞান যাচাইয়ের প্রচলন ছিল যেটাকে আমরা সক্রেটিয় পদ্ধতি বলে থাকি। কিন্তু আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা পদ্ধতির প্রচলন দেখতে পাই এবং এটি সারা বিশ্বে প্রচলিত। কালচক্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একটি মানসম্মত শিখন ও মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রবর্তন করতে সক্ষম হলেও আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের এই পিছিয়ে পড়ার বহুমাত্রিক কারণ থাকলেও শিক্ষার রাজনীতিকরণ, পরীক্ষায় দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং নৈরাজ্যের মতো বিষয়গুলো শিক্ষা বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তোলে। স্বাধীনতার ৫১ বছর পার হলেও আমরা একটি মানসম্মত এবং সাসটেইনেবল প্রশ্ন প্রণয়ন ও পরীক্ষা পদ্ধতি দাঁড় করাতে পারিনি। পরতে পরতে পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন, প্রশ্ন প্রনয়ণের ক্ষেত্রে নির্বিচার সংযোজন ও বিয়োজন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ানোর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ, দুর্নীতি এবং গুণগত শিক্ষার প্রতি চরম অবহেলা সমগ্র শিক্ষা পদ্ধতিকে অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরে রেখেছে। একজন চিকিৎসকের কাছে যখন কোন রোগী যান তখন চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা দিয়ে থাকেন। চিকিৎসকের উদ্দেশ্য থাকে  প্রকৃত রোগ শনাক্ত করা।

পরীক্ষার মাধ্যমে যদি রোগ শনাক্ত সম্ভব হয় তবে সেটাকে সঠিক পরীক্ষা বলে। অন্যথায় সেটা ব্যর্থ পরীক্ষায় পর্যবসিত হয় এবং রোগী মৃত্যুর পথে আগাতে থাকে। যাহোক শিক্ষার্থীদেরকে পরীক্ষা নেয়ার উদ্দেশ্য কি সেটা আগে জানা প্রয়োজন। পরীক্ষা নেয়ার উদ্দেশ্য হলো একজন শিক্ষার্থীর মেধা, যোগ্যতা এবং দক্ষতা খুঁজে বের করা এবং সেটার প্রমাণস্বরূপ একটি দলিল প্রদান করা। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে আমাদের একাডেমিক পরীক্ষাগুলো নেয়ার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদেরকে পাস করানো এবং একটি সনদ দিয়ে দেয়া।

প্রবন্ধের শুরুতেই আমি বলেছি এই পাসের সাথে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দুনীতি এবং পরীক্ষা পদ্ধতির দুর্বলতাগুলো নানা দিক থেকে সম্পৃক্ত। পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কোনো প্রতিষ্ঠানে পাশের হার কত সেটার একটা চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং জরিপ লক্ষ্য করা যায় এবং অন্যান্য অনুষঙ্গগুলোর জরিপ বা বিশ্লেষণ হয় না। যার পাসের হার বেশি সে বাহবা পেতে থাকে সব পর্যায় থেকে আর যার পাসের হার কম তাকে তুলাধোনা করা হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শিক্ষার্থীদের যেনতেনভাবে পাস করাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর।

স্কুল ও কলেজ জীবনে পরীক্ষা দিতে দিতে তারা ক্লান্ত হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু তাদের স্বার্থটুকই বিবেচনায় রাখে, গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে তাদের মাথা ঘামানোর কোন ইচ্ছা বা সময় কোনোটিই নেই। পরীক্ষা শাসিত শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন একটি শিক্ষাক্রম চালু হতে চলেছে। কিন্তু সেখানেও পরীক্ষা পদ্ধতির বিষয়টি যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তাতে বেশ কিছু দুর্বলতা দৃশ্যমান। শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক এবং বছরব্যাপী মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। পদ্ধতিটি ভাল কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটি মনোপলির শিকার হতে পারে। শিক্ষকদের প্রাইভেট এবং কোচিং এর সরাসরি প্রভাব এর ওপর পড়তে পারে যেটা বুমেরাংও হয়ে যেতে পারে। আবার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এটার অপব্যবহার করতে পারে। কলেবর বৃদ্ধি করতে চাই না। দু চারটি দুর্বল দিকের প্রতি আলোচনা সীমিত রাখতে চাই। পাঠ্য বই, প্রশ্ন এবং পরীক্ষার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দৃশ্যমান। 

পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার্থীরা সাবলীলভাবে পাঠ্য বইয়ে খুঁজে পায় না বা বুঝতে পারে না। এর ফলে তারা গাইড ও নোট বই নির্ভর হয়ে পড়ে যেটা শিক্ষা এবং পরীক্ষার বাণিজ্যিকীকরণকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে। ইংরেজি বিষয়ের কথাই বলা যাক। ইংরেজি পাঠ্যবইকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা সাবলীলভাবে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে পারে না। এর ফলে গুটিকয়েক গাইড বইয়ের ওপর তারা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এমনকি ইংরেজি বিষয়ের প্রশ্নের ধরণ এমন হয়ে গেছে যে শিক্ষার্থীদের মাইন্ড সেটআপ হয়ে গেছে যে এখন আর গ্রামার পড়ার দরকার নেই। তাদের এই মাইন্ড সেটআপ ইংরেজিতে দুর্বলতা আরো প্রকট করে তুলছে যার প্রমাণ মিলছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়। বহু বছর ধরে রচনামূলক প্রশ্নে বোর্ড পরীক্ষার প্রচলন ছিল এবং সেটা ১৯৯১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তখন বোর্ড পরীক্ষায় একই দিনে দুই পত্র (সকাল -বিকাল) অনুষ্ঠিত হতো।

১৯৯২ সালে পরীক্ষা পদ্ধতি ও প্রশ্নপত্রে আমূল পরিবর্তন আনা হয়। বহুনির্বাচনী ও রচনামূলক  প্রশ্নের প্রবর্তন করা হয়। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত প্রতি বিষয়ে ৫০০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন নির্ধারিত ছিলো এবং বহুনির্বাচনী ও রচনামূলক মিলে একত্রে পাস নম্বর ৩৩ এ নির্দিষ্ট ছিল। রচনামূলকে ১০ নম্বর তুলতে পারলেই পাস সুনিশ্চিত।  এর ফলে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই পাস নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হতে থাকে। প্রথম বিভাগে পাসের হারও ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।  পাসের হারে আসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন যা অভিভাবক, শিক্ষার্থীসহ পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একটি ভিন্ন ধরনের স্বস্তির সঞ্চার করেছিলো। একই সাথে শিক্ষা বিশ্লেষকদের সমালোচনাও ছিল। আর এই সমালোচনার ফলে বহুনির্বাচনী ও রচনামূলকে পৃথকভাবে পাশের বিধান করা হয় যেটার প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর পড়তে থাকে।

৯২ থেকে ৯৫ এ সহজে পাস হয়ে গেলো কিন্তু বিধান পরিবর্তন করায় ফলাফলের তারতম্য প্রকট হতে লাগলো।  নির্দিষ্ট ৫০০ বহুনির্বাচনী প্রশ্নকে অনির্দিষ্ট করে দেয়া হলো।  নব নব পরীক্ষা পদ্ধতি আর বিধানের কারণে শিক্ষার্থীদের উপকারের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা বেড়ে গেলো। ২০০৯ সাল থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা চালু হলো যেটা মোটেও প্রয়োজন ছিল কিনা প্রশ্ন থেকে যায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা ভীতি বাড়তে লাগলো। ২০১০ সাল থেকে জে এস সি শুরু হলো যেটাকে শিক্ষা বিশ্লেষকরা সাধুবাদ জানাতে পারেননি। কারণ প্রাথমিক ও জে এস সি পরীক্ষা ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত চাপ।

প্রশ্ন ও পরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন করতে হলে কিছু বিষয় অবশ্যই মেনে চলতে হবে। পাঠ্য বই, সিলেবাস এবং প্রশ্ন প্যাটার্নের ঘনঘন পরিবর্তন বন্ধ করতে হবে। একটি সাসটেইনেবল এবং মানসম্মত সিলেবাস, প্রশ্ন প্যাটার্ন ও পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করতে হবে। আমাদের পরীক্ষার আরেকটি দুর্বলতা হলো সময় নির্ধারণ। একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ের জন্য তিন ঘণ্টা সময় ধরে পরীক্ষা নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। দু ঘণ্টাই যথেষ্ট। পাস নম্বর ৩৩  বহু বছর ধরে চলছে। এটাকে সংস্কার করে ৪০ এ উন্নীত করা যেতে পারে। স্বাধীনতার এত বছর পরেও পাঠ্য বইয়ে একটি মানসম্মত প্রশ্ন ব্যাংক তৈরি করা সম্ভব হলো না কেন? উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে পাঠ্য বইয়ের শেষে প্রশ্ন ব্যাংক তৈরি করে দেয়া হয় এবং সেখান থেকে কৌশলে পরীক্ষার প্রশ্ন করা হয়। এতে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইমুখী হয় এবং তাদের সৃজনশীলতা বিকশিত হয়।  প্রতিটি পাঠ্য বইয়ের সাথে এটি প্রশ্ন ব্যাংক সংযুক্ত করে দিয়ে সেখান থেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে। বিভিন্ন শ্রেণিতে পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। বেশি বেশি পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীরা শিখে এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পরীক্ষা ভীতি দূর করা অতি জরুরি। প্রশ্ন প্রণয়নে অবশ্যই মান বজায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আপোষের সুযোগ নেই। এমনভাবে প্রশ্ন করতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বই পড়তে বাধ্য হয় এবং গাইড বই বর্জন করে। একাডেমিক ধারাবাহিক মূল্যায়নে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষার উদ্দেশ্য হোক জ্ঞান অর্জন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি।

লেখক:  কলামিস্ট ও গবেষক

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar