জীবন-জীবিকায় নদ-নদীর প্রভাব


  • সামসুজ্জামান
  • ২২ নভেম্বর ২০২২, ২১:১৫

নদীর দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু কালের আবর্তে আমাদের নদীমাতৃক পরিচয়টা হারিয়ে ক্রমেই মরুভ‚মির দেশের বৈশিষ্ট্যে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের আবহাওয়া পরিবর্তন সেই ইঙ্গিত বহন করে। অথচ এই নদীর সাথেই বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা, সুখ-দুঃখ, আবেগ-ভালোবাসা জড়িত রয়েছে। নদীর সাথে আমাদের নীবিড় প্রাণের সম্পর্ক জড়িত। শুধু তাই নয়, নদী পথ আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে থাকে। আজ যে যানজটের কারণে মানুষের জীবন থমকে দাঁড়িয়েছে নদী পথকে সুষ্ঠুভাবে চালু রাখতে পারলে এমনটি হয়তো হতো না। মিসরের নীল নদ যেমন মিসরের প্রাণ, তেমনি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের দুই তৃতীয়াংশ ফসলি জমি নদী থেকে সেচের ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের এই সুবিধাকে কোনো রকমে ব্যাহত করা যাবে না। তাহলে আমাদের উৎপাদনের ওপর তার প্রভাব পড়বে।

এই নদীকে কেন্দ্র করে যুগে যুগে রচিত হয়েছে কালজয়ী গান। রচিত হয়েছে নদী ও নদীপারের মানুষের জীবন সংগ্রাম নিয়ে ‘পদ্মানদীর মাঝির’ মতো কালজয়ী উপন্যাস। কিন্তু দখল, দূষণ কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে নানা কারণে আমাদের নদ-নদীর এই হাল হয়েছে। দেশের প্রভাবশালী একটি মহল রাজনৈতিক ছয় ছায়ায় বালু উত্তোলন, নদীর পাড় দখল করে আবাসন প্রকল্প গড়ে গহিত কাজ করেই চলেছে প্রতিকারহীন ভাবে। এমনি ভাবে দখল অভিযানে নদীপথ সংকুচিত হয়ে স্রোতহীন যাচ্ছে। পরিণত হচ্ছে ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে। সরকারের নির্লিপ্ততায় দখলকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কঠোরভাবে এদের মোকাবিলা করে স্রোতহীন নদ-নদীগুলোকে স্রোতিস্বীনি করতে হবে। মনে রাখতে হবে এ সব নদ-নদীই দেশের প্রাণ। আর দেশের প্রাণ মানে দেশের মানুষের প্রাণ। মাদকের মতো এ সব দখলকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। নদ-নদী দখলকারীদের দেশের সবধরনের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণ পাওয়ারও অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও থেমে নেই দখলকারীরা। দোর্দণ্ড প্রতাপে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কাজ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অভ্যন্তরে বহমান নদনদী ও খালসমূহ সুরক্ষায় কোনো পরিকল্পনা না থাকায় নদীর ইতিহাস ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। নদ-নদী খনন না করায় প্রধান নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়। সে সব নদীর স্থলে এখন ফসলের আবাদ অথবা প্রান্তরজুড়ে ধু ধু বালি। বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে ১৩টি নদী। সাতটি নদী এখন মৃতপ্রায়। এভাবে একের পর এক নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। হয়তো একদিন অনেক নদীর নাম কেবল বইয়ের পাতায় থেকে যাবে। সে ভাবে ২১ হাজার কিঃ মিঃ নীপথ হারিয়ে গেছে।

প্রতি বছর নদীগুলো দেশের ওপর দিয়ে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন টন পলি বহন করে নিয়ে যায়। এ পলি নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলে। ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত লেদারল্যান্ডসের নদী বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় নদী জরিপ করে ‘নেডেকো’ রিপোর্ট তৈরি করা হয়। ১৯৭৫ সালে বি.আই.ডবিøউ.টি.এর জরিপ থেকে দেশে ২৪ হাজার নৌ পথের তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৪৬ সাল থেকে বিভিন্ন নৌপথের নাব্য কমতে শুরু করে। ১৯৭৭ সালে ২১৬ মাইল নৌপথ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে আরো ২১ কিঃ মিঃ নৌপথ বন্ধ হয়। দেশে বর্তমানে সকল নৌপথের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ ফুট গভীরতা সম্পন্ন প্রথম শ্রেণির নৌপথ রয়েছে মাত্র ৬৮৩ কিলোমিটার। ৭-৮ ফুট গভীরতার দ্বিতীয় শ্রেণির নৌপথ রয়েছে এক হাজার কিলোমিটার। ৫-৭ ফুট গভীরতার তৃতীয় শ্রেণির নৌপথ রয়েছে ১ হাজার ৮৮৫ কিলোমিটার।

নদ-নদী মানুষ ছাড়াও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে থাকে। বহু প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল রয়েছে নদীতে। নদী তাঁর আপন সৌন্দর্য হারানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থলও বিলুপ্ত হচ্ছে। প্রভাব ফেলছে জীববৈচিত্র্যে। একের পর এক নদী শুকিয়ে যাবার ফলে এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের জীবনধারণে আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। মানুষের অত্যাচারের পরও যে নদীগুলো এখন জীব-মৃত অবস্থায় রয়েছে তার তলদেশও ভরাট হয়ে যাচ্ছে পলি পড়ে। সৃষ্টি হচ্ছে অকাল জলাবদ্ধতা। ধ্বংস হচ্ছে ঘরবাড়ি ভাঙছে রাস্তাঘাট। নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ।

নদীমাতৃক এ দেশে নদীর অস্তিত্বের সাথে আমাদের জীবন যাত্রা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ ভাবে নদী যদি তার স্বাভাবিক গতিপথ হারায় তবে তার বিরূপ প্রভাব আমাদের ওপর পড়বে নিঃসন্দেহে। তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় নদীপথগুলো টিকিয়ে রাখা জরুরি। নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে সরকারকে আরো কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। অন্তত যে সব নদ নদী এখনো প্রবহমান সে সব নদ নদী রক্ষার উদ্যোগ কর্তৃপক্ষকে আশু নিতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদ নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে। যদি নদীগুলো এভাবে তাদের অস্তিত্ব হারাতে থাকে তাহলে অচিরেই পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘিœত হবে। যা আমাদের চিরায়ত জলবায়ুর বিরুদ্ধে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। আর এসব কারণেই দেশের নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থেকে দখল মুক্ত করতে হবে। এ কাজে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফ‚র্ত সমর্থন দিবে। আমাদের সেচ কার্য পরিচালনা এবং দেশের জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নদীর গুরুত্ব সর্বাধিক। ফলে যে কোনো মূল্যে নদীর প্রবাহ অব্যাহত রাখতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট


poisha bazar