সরিষায় ভূত থাকলে সমাধান কি


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৯ নভেম্বর ২০২২, ১৬:২২

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আর শিক্ষকদের কর্মকাণ্ডে ছোটবেলায় শোনা সেই গল্পটাকে নতুন করে দেখছি। যাদের দেশ গড়ার কারিগর মনে করা হয়। যারা শিক্ষার আলো দিয়ে সকল অন্ধকারের অবসান ঘটাবে আজ তাদের কর্মকাণ্ডই প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশ্নবিদ্ধ বোর্ড পরীক্ষার মতো প্রশ্নও। ভুল মানুষের হয় এবং হবেও। সেটা মেনে নেয়ার মতো। কিন্তু তাই বলে যে প্রশ্নপত্র হবে সম্মানহানীকর, উস্কানিমূলক সেটা তো একদমে মেনে নেয়া যায় না। যেখানে শিক্ষা সাম্যের কথা বলে, কেউকে যেন হেয় করা না হয় সেটা শিখানো হয়, কারও কথা যেন ধর্ম, গোত্রকে উস্কানি দেয়ার মতো না হয় তা শেখানো হয়, নম্রতা, ভদ্রতা শেখানো হয়। সেই শিক্ষার মান নির্ণয়ে যে প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে সেই প্রশ্নই হয়ে গেছে উস্কানিমূলক। যা নিয়ে তোলপার হচ্ছে সচেতন জনতাদের মাঝে।

এমন প্রশ্নবিদ্ধ প্রশ্নপত্রের দায় নিবে কে? এই দায় কি শিক্ষাবোর্ড এড়িয়ে যেতে পারে? পঞ্চম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বোর্ড পরীক্ষা থেকে শুরু করে অর্ধ-বার্ষিক, নির্বাচনী, বার্ষিক যতগুলো পরীক্ষা দিয়েছি আর দিচ্ছি কোনো না কোনো ভুল পেয়েছি আর পাচ্ছি। বানানে ভুল, অংকের নিয়মে ভুল, সঠিক উত্তর অপশনে না রেখেই করা প্রশ্ন। এরকম বহু ভুল হয়ে এসেছে আর আসছে। পরে এই ভুল জানিয়ে দেয়া হয়েছে ঐ প্রশ্নের অমুক, অমুক নম্বর প্রশ্নটি ভুল আছে। যারা যারা ঐভুল প্রশ্নের উত্তর করেছে তাদের সঠিক নম্বর দেয়া হবে। যদিও এটা প্রকৃত সমাধান নয়। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যথেষ্ট হয় তো। কিন্তু এবার যশোর বোর্ডের সৃজনশীলের নাম করে তৈরি করা প্রশ্নের দায় কিন্তু শিক্ষা বোর্ড থেকে শুরু করে প্রশ্নকর্তা পর্যন্ত এড়িয়ে যেতে পারবে না। আর এটাকে এড়িয়ে যাওয়া যেতে দেয়া যায় না। যে শিক্ষার মাধ্যমে আমরা সমাজের অন্ধকার মুছে দিতে চাই, সেই শিক্ষায়ই যদি ভুল থাকে তাহলে অন্ধকার মুছে যাবে কি করে? শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু করা হলো ২০১০ সালে। তখন আমি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। শুরু হয়ে যায় সৃজনশীল প্রশ্নের আনাগোনা। বলা হয়ে থাকে সৃজনশীল মানে সৃষ্টিশীল।

শিক্ষার্থী বুঝে পড়বে, মুখস্ত না করেই নিজেদের মেধা দিয়ে তৈরি করে ফেলবে উত্তরপত্র। ফলে শিক্ষার্থীরা শিখবে বেশি বেশি। কারণ মুখস্ত করতে হবে না, কোনো গাইড বা অনুশীলন বই থাকবে না, কোচিং সেন্টারে যেতে হবে না এবং কি লাগবে না গৃহশিক্ষক। নিজেদের মেধায় শিখবে অনেক কিছু, পাবেও পর্যাপ্ত সময়। কিন্তু গুড়ে বালি। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বাজারের গাইড বই, গৃহশিক্ষক ও কোচিং সেন্টারের রমরমা ব্যবসা চলমান। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক প্রতিবেদনে বলেছেন সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি চালুর এক দশক পরও দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এখনও সঠিকভাবে এই পদ্ধতিতে প্রশ্ন করতে পারেন না। তারা বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেন বা অন্য বিদ্যালয়ের সহায়তায় সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন করেন। যেখানে সকল শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরিতে দক্ষ না সেখানে তারা শিক্ষার্থীদের কি শিখাবেন আর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই বা কি আশা করবেন! যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ চলমান এইচএসসি শিক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র।

যাদের নিজেদেরই সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করার পাকা-পোক্ত ভিত্তি তৈরি হয়নি এখন পর্যন্ত তাদের কাছে প্রশ্ন তৈরি করতে দিলে তো প্রশ্নপত্র প্রশ্নবিদ্ধ হবেই। এই কথা বলে যদি প্রশ্নকর্তাদের পক্ষ নেই; তবে এইখানে আবার একটা কথা বলতে হয়, চলুন মনে করি যারা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া প্রশ্নপত্র তৈরি করছেন তারা সৃজনশীল পদ্ধতি বুঝে না তাই প্রশ্ন তৈরি করতে ভুল করছে। এটা মেনে নিলাম। কিন্তু আবার প্রশ্ন আসে, না হয় তারা সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করতে পারে না কিন্তু কোনটা উস্কানিমূলক হতে পারে সেটা তো তাদের বোঝার কথা। কিন্তু তারা বুঝলো না কেন! তারা কিভাবে এরকম একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করল? বোর্ড পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র তৈরির জন্য যাদের আহহ্বান করা হয় তারা প্রশ্নপত্র তৈরি করা মাত্রই তা চূড়ান্ত বলে বিবেচ্য হবে না। তারা প্রশ্নপত্র তৈরি করে পুনর্নিরীক্ষকদের হাতে দেন। তারপর চারজনের একটি কমিটি সকল বোর্ডের প্রশ্নপত্র বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেন। যা চূড়ান্ত বোর্ড থেকে দেশের বিভিন্ন বোর্ডে চলে যায়। তাহলে প্রশ্নকর্তার করা এরকম উস্কানিমূলক প্রশ্নপত্রের মূল্যায়ণ তার কেমনে করল! যে প্রশ্নপত্র প্রশ্নবিদ্ধ হলো। তবে কি প্রশ্নকর্তা থেকে শুরু করে পুনর্নিরীক্ষকরা বিষয়টাকে উদাসীনতার সাথে বিবেচনায় নিয়েছে নাকি তাদের কাছে প্রশ্নপত্রের কোন গুরুত্ব নেই? আমরা জানি, শিক্ষকরাই আমাদের প্রথম শেখায় সামাজিক সম্প্রীতি কিভাবে বজায় রাখতে হয়। সেই শিক্ষকরাই যদি নিজেদের উদাসীনতার সাথে সামাজিক সম্প্রীতিকে নষ্ট করে দেয় তাহলে এইচএসসি পড়–য়া শিশু, কিশোরগুলো কিভাবে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা শিখবে? তাই বলতে হচ্ছে এমন উস্কানিমূলক প্রশ্ন করে তারা পার পেতে পারে না। তাদের এই দায় নিতে হবে। আর যথাযথ শাস্তিরও ব্যবস্থা করতে হবে যাতে পরবর্তীতে তামাক পাতা খেয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে এরকম প্রশ্ন তারা তৈরি করে ছোট ছোট শিশু ও কিশোরদের মনে হিংসা, বিদ্বেষের জন্ম না দেয়।

শিশু-কিশোর বয়সে এমনিতেই তারা নানা রকমের অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হয়, ভুল করে অন্ধকার পথে পাড়ি জমায়। তাদের শিক্ষার প্রকৃত আলো দিয়ে ভালোর পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই পরবর্তীতে যাতে এরকম প্রশ্নপত্র তৈরি না হয় তার জন্য বর্তমানের আলোচিত প্রশ্নকর্তা ও পুনর্নিরীক্ষকদের হেয়ালিপনার বিষয়টা মার্জনা করা যাবে না। মার্জনা করাটা অযৌক্তিকও হবে বটে। কারণ এটা কোন সাধারণ ঘটনা না। এটা সামাজিক সম্প্রীতির সাথে জড়িত। এটার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে আর একটি দিক তুলে ধরতে চাই। যারা প্রশ্ন তৈরি করেছেন অর্থাৎ প্রশ্ন কর্তা টিমের দুজন ছিল কিন্তু বিসিএস ক্যাডারভুক্ত শিক্ষক। বিসিএস ক্যাডার হওয়াটাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। যে বিসিএস ক্যাডারভুক্ত হয়েও কিভাবে এরকম একটি ভুল করল? তাদের উদ্দেশ্যে আমার ভাবনাকে তুলে ধরলাম।

ক্যাডার মানেই সব জানেন, বুঝেন এমনটা না। এমনটা হলে এত বড় একটা ভুল হয় তো হতো না। বর্তমানে আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এই বিসিএস ক্যাডার জ্বরে আক্রান্ত। তাই তারা সবসময় বইয়ের পাতায় আটকে থাকে। ফলে সৃজনশীলের বিষয়গুলো তারা প্রাক্টিক্যালি বুঝতে পারে না। তার প্রমাণ সবাই পেয়ে গেছেন আশা করি। তবে এবার এই বিষয়গুলোর সমাধান জরুরি। সেই সাথে দক্ষ শিক্ষকদের দ্বারা অদক্ষ, কম দক্ষ শিক্ষকদের যেন যথাযত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে সৃজনশীলতার বিষয়গুলো আগে শেখানো হয়। তবেই তারা শিক্ষার্থীদের এটা বুঝাতে পারবে বলে আশা করি। সর্বোপরি এমন ভুল আমরা আর দেখতে চাই না। এমনিতেও শিক্ষা পদ্ধতির বেহাল দশা, শুধু বেকার সনদ তৈরি হচ্ছে। তাই মনে করি শিক্ষা পদ্ধতির এই সৃজনশীল এবং শিক্ষকদের দক্ষ করার দিকে বিশেষ নজর দেয়া উচিত। তবেই শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ তারা ঘটাতে পারবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ।


poisha bazar