প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে করণীয়


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:০২

সাদিয়া ইসলাম: বিবেক-জ্ঞান-বুদ্ধি ও মনুষ্যত্বের কারণে মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীব বলা হয়। সততা, নীতি-নৈতিকতা, দেশপ্রেম, পরোপকার এবং আদর্শ চরিত্রবান মানুষ হওয়ার মূল ভিত্তি সুশিক্ষা। উন্নত জাতি গঠন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব সর্বাধিক।
অন্যদিকে বলা যায়, সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার বীজ হলো প্রাথমিক শিক্ষা। বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও মানবিক গুণসম্পন্ন আদর্শবান মানুষ হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে প্রাথমিক শিক্ষা।

মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার অবদান অপরিসীম। একটি দেশ ও জাতির অগ্রগতির মূলে রয়েছে শিক্ষা। ব্যক্তি জীবন তথা সামাজিক জীবনের পাশাপাশি আমাদের জাতীয় জীবনের দৈনন্দিন কাজে কর্মে নৈতিক, মানবিক, ধর্মীয় বোধ, সাংস্কৃতিক চিন্তাধারা ও সামাজিক মূল্যবোধকে উজ্জীবিত করার মূল হাতিয়ার শিক্ষা। এই বোধ থেকেই ইংরেজ কবি জন মিল্টন বলেছেন, ‘Education is the harmonous  development of mind, bodz and soul’ মানুষ শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত নতুন জ্ঞান, দক্ষতা ও নবতর দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজে লাগিয়ে নিজের ও পারিবারিক জীবনকে আরও সুন্দর, অর্থবহ করার পাশাপাশি সমাজ ও দেশের জন্য অবদান রাখতে সক্ষম। আর এই শিক্ষাদানের বিষয়টি শুরু হয় পরিবার থেকেই। শিশুর শিক্ষার মূল বুনিয়াদ গড়ে ওঠে অপ্রাতিষ্ঠানিক কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষ পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গমন করে।

শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক তথা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনের মধ্য দিয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় শৈশবে এবং শেষ হয় মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শুরু হওয়ার আগে। প্রাথমিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সকল শিশুর জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের অক্ষরজ্ঞান, পঠন ও লিখন দক্ষতা এবং গাণিতিক সংখ্যার ধারণা তৈরি হয়। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমেই শিশুদের মাঝে বিজ্ঞান, মানসিক দক্ষতা, ভ‚গোল এবং অন্যান্য সামাজিক জ্ঞান বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে দেয়া হয় যা তার ভবিষ্যৎ জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করে।

প্রাথমিক শিক্ষা শিশুর সামাজিক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বুনিয়াদি শিক্ষা করে তাকে আগামী দিনের কাণ্ডারি হওয়ার পথ তৈরি করে দেয়। তাই এ শিক্ষাকে মানুষ গড়ার আঁতুড়ঘর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিশুকে ভবিষ্যতের দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা হলো প্রথম ও প্রধান সোপান। প্রতিটি শিশুর সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ, আনন্দময় বর্তমান, সৃজনশীল ভবিষ্যৎ ও প্রগতিশীল উৎপাদনমুখর উন্নত সমাজ বিনির্মাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ কাজই সম্পাদন করে প্রাথমিক শিক্ষা।

প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতির দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তৃতিতে গত ১০ বছরে অগ্রগতি হয়েছে ব্যাপক। যার শুরুটা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই। ১৯৭৩ সালে ৩৬ হাজার ১৬৫ প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা করেছিলেন তিনি।

এরই ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের গৃহীত আরও পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে চার দফার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই রঙিন বই তুলে দেয়া, উপবৃত্তি কার্যক্রম, অনগ্রসর এলাকায় স্কুল ফিডিং চালু, সরকারি বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করতে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হচ্ছে। শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টিসহ লক্ষাধিক শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু, পুল শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগও প্রশংসা পাচ্ছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৯ বছরে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে, যা বিশ্বের বহু দেশের কাছে অনুকরণীয়। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগ, ছাত্র-ছাত্রীর সমতা, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, ঝরে পড়ার হার দ্রæত কমে যাওয়াসহ শিক্ষার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোল মডেল এখন বাংলাদেশ।
শিক্ষকরা নিজেরা শিশুদের সঙ্গে উচ্চারণ করে পাঠ করবেন, এতে শিক্ষার্থীদের উচ্চারণ জড়তা দূর হবে এবং প্রমিত উচ্চারণশৈলী সৃষ্টি হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্চারণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মনোবল প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি শব্দ পড়া, বলা ও লেখা শেখাতে হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ভাষার ব্যবহার বাড়বে এবং এতে শিশুরা বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে ও লিখতে পারবে।

শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও আমরা নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের মাঝে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে পারছি না। শিক্ষা হয়ে উঠেছে পরীক্ষা নির্ভর। পরীক্ষা নির্ভরতা কমিয়ে, মেধা যাচাই করিয়ে প্রাথমিক স্তরেই ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম, পরোপকারিতা ও ন্যায়পরায়ণতা শেখানো উচিত।

শিক্ষার্থীদের মাঝে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য সকলের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন একটি পরিচ্ছন্ন স্কুল পাবে তেমনি তারা কর্মঠ, উদ্যমী ও স্বাবলম্বী হবে এবং পরিচ্ছন্ন থাকার জ্ঞান লাভ করবে।

গ্রামের স্কুলগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা দুপুরে খাবার আনে না। দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার কারণে দুপুরের পরে শিক্ষার্থীরা ঝিমিয়ে পড়ে। পড়ালেখার প্রতি অনাগ্রহ চলে আসে। এ সমস্যা দূর করার জন্য স্কুলেই রান্নার ব্যবস্থা করা উচিত অথবা শিক্ষার্থীরা যেন বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসে সে বিষয়ে তাদের উৎসাহ দেয়া জরুরি।

শিক্ষকতা মহান পেশা। এটাকে শুধু আয়-রোজগারের উপায় হিসেবে না দেখার জন্য শিক্ষকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে তারা সময়োপযোগী মানসম্মত পাঠদান করতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শিক্ষকদের প্রতি সম্মানজনক জায়গা তৈরি হবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের তুলনায় শিক্ষকের আনুপাতিক হার খুবই কম। বর্তমান সরকার শূন্য পদ পূরণের জন্য অনেক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে আরও পদ শিক্ষার মান নিশ্চিতকরণে খুবই কার্যকর ভ‚মিকা পালন করবে।
বিদ্যালয়গুলোতে যে ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে তারা অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার মান বৃদ্ধির বিষয়ে মোটেও সচেতন নয়। তাদের অনেকেই এটিকে ক্ষমতা বা আধিপত্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটিরও মান বৃদ্ধির প্রয়োজন। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া উচিত।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সার্বিক উন্নয়ন ও সমন্বয় সাধনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদের মাধ্যমে শিক্ষাকে সার্বজনীন ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নড়াইল সদর উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা জরিপ ২০২১-২২ অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার হার ৬৮.৭৯% এবং ঝরে পড়ার হার ৪.১৪%। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবে আশার কথা এই যে, নড়াইল সদর উপজেলায় ভর্তির হার ৯৮.৭৮%।

যেহেতু বাবা-মাসহ পরিবারের অন্য সদস্য অপেক্ষা শিশুরা বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের তত্ত¡াবধানে অধিকতর গুণগত সময় অতিবাহিত করে সেহেতু বিদ্যালয়ই হবে একজন শিক্ষার্থীর নিজেকে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করার উপযুক্ত স্থান। শিশুর শিখন দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জনের যথার্থ কৌশল সৃষ্টি করে শিশুকে আজীবন শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করার প্রধান দায়িত্ব একজন শিক্ষকের। প্রাথমিক অবস্থায় শিশু মনের বিকাশ ঘটাতে শিক্ষকের অবদান অপরিসীম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভর্তি শতভাগ নিশ্চিত ও উপস্থিতি নিয়মিত করণের পাশাপাশি বিদ্যালয়কে শিশুদের নিকট আগ্রহী করে তুলতে শিক্ষকগণ যে সকল ভ‚মিকা রাখতে পারেন-
শিশুর চেতনার প্রকৃত বিকাশ ঘটে থাকে প্রাথমিক স্তরেই। আমরা যদি শিক্ষার ভিত শক্তিশালী করতে চাই তাহলে অবশ্যই প্রাথমিক শিক্ষার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন যোগ্যতাসম্পন্ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, সচেতন অভিভাবক, সুশীল সমাজের ভূমিকা এবং সরকারের সার্বিক সহযোগিতা। তাহলেই একদিন শিশুর চেতনার প্রাথমিক শিক্ষা পরিপূর্ণতা লাভ করবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পাবে একটি আলোকিত জাতি।

লেখক: উপজেলা নির্বাহী অফিসার
নড়াইল সদর, নড়াইল।


poisha bazar