সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাক পাঠ্যবই


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:০১

আহসান হাবিব: বই উৎসব বাংলাদেশ সরকারের একটি মহতি উদ্যোগ। প্রতিবছরে এ উৎসব পালিত হয়। ১ জানুয়ারি প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি এবং পর্যায়ক্রমে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়। এটি পাঠ্যপুস্তক উৎসব বা পাঠ্যপুস্তক উৎসব দিবস নামেও পরিচিত।

শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের সংকট কমাতে ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার বিনামূল্যে বই বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়।  শিক্ষাবর্ষের শুরুর দিনে বই উৎসব করে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো হলে শিক্ষার্থীদের যেমন আনন্দের সীমা থাকে না, তেমনি পড়াশোনায়ও আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু গত বছরে যে সংকট দেখা গিয়েছিল এবারও সে সংকটের কথা শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ সময়মতো শিক্ষার্থীরা হাতে বই না পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বই ছাপানোর কার্যাদেশ দিতে দেরি করাসহ তিনটি কারণে এবারও সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত সব বই তুলে দেয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কাও।

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে মাত্র সাড়ে তিন মাস বাকি। কিন্তু জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) এবং মুদ্রণকারীদের সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত পত্রিকা পড়ে জানা যায়, আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করে এখন পর্যন্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই ছাপানোর কার্যাদেশই দিতে পারেনি এনসিটিবি। তাহলে প্রায় ৩৫ কোটি বই কীভাবে ছাড়ানো সম্ভব। এমতাবস্থায় ২০২৩ সালে ১ জানুয়ারি কমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছাবে তো। যদি বই সময়মতো হাতে না আসে বা কয়েক শিফটে এলোÑ এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের আনন্দ মরে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাদানের কথা।

গত বছর থেকে যে অনিয়ম শুরু হলো তা এবছরেও হবে- এভাবে দেখা যাবে অনিয়মগুলো নিয়মে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বই উৎসবের আনন্দ মাটি করে আসছে বই। এমন কেন হয়? মানুষ এক বছরের সংকট থেকে কাজের শিক্ষা নেয়। শিক্ষা নেওয়া তো দূরের কথা, আমাদের উচ্চপর্যায়ে যারা আছেন, তারা এই সংকটকে কীভাবে আরও দীর্ঘমেয়াদি করা যায় সেই চেষ্টায় মত্ত থাকেন। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এমন হচ্ছে কেন? তাহলে কী আমরা ধরে নেব, আমাদের সৎ ইচ্ছার অভাব। এইসব অনিয়মের কোনো জবাবদিহিতা নেই বলে? পাঠ্যপুস্তকের ছাপা, কাগজ নিম্নমানের এসব প্রকাশের পর প্রকাশকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের নজির আজও তৈরি হয়নি। তাহলে আমরা কি ধরে নেব যে ভুত শর্ষেতে?

গত ২০১০ সাল থেকে উৎসব করে বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দেয়ার যে রেওয়াজ শুরু হয়েছিল গত বছর থেকে তাতে ভাটা পড়েছে। গত শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বই বিতরণ শুরু করা গেলেও সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই দেয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়নি। এদিকে নতুন বছরের জন্য প্রায় ৩৫ কোটি বই ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে মাত্র ২ লাখ ৪০ হাজার (ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় রচিত বই) ছাপানোর কার্যাদেশ দেয়া সম্ভব হয়েছে। আবার বই ছাপার কাজ পেতে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে গড়ে ২২ থেকে ২৫ শতাংশ কম দাম দিয়েছে মুদ্রণকারীরা। যদিও কাগজ, কালি ও কাগজ তৈরির মণ্ডের (পাল্প) দাম বাড়তির দিকে। এ দুটি কারণেও মানসম্মত বই ছাপানো নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এনসিটিবির কর্মকর্তা ও মুদ্রণকারী উভয়েরই আশঙ্কা, কার্যাদেশ দিতে বিলম্বসহ তিন কারণে সময়মতো মানসম্মত বই ছাপিয়ে আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে বিতরণ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থাৎ গত বছরে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে জাতীয় শিক্ষা শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কোনো শিক্ষাই নেয়নি। যে কারণে এবারেও একই সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়াও কার্যাদেশ শুরুর আগেই মুদ্রণকারীদের পক্ষ থেকে দাবি-দাওয়া দেয়া শুরু হয়েছে। দরপত্র অনুযায়ী মোট সময়ের প্রথম ভাগে ৫০ শতাংশ এবং বাকি ৫০ শতাংশ বই পরের ভাগে দেয়ার কথা থাকলেও এখন মুদ্রণকারী চাইছে এই শর্ত না রাখতে। অতীতেও দেখা গেছে, শেষ সময়ে কিছুসংখ্যক মুদ্রণকারী নানা ফন্দিফিকির করে নি¤œমানের কাগজে বই দেয়। এবারও একই আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনার দু’বছর বই উৎসব হয়নি। চলতি শিক্ষাবর্ষে বছরের শুরুতে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব পাঠ্যবই তুলে দিতে পারেনি এনসিটিবি। ফেব্রæয়ারি-মার্চেও কোনো কোনো মুদ্রণকারী বই দিয়েছিল। বইয়ের কাগজের মান নিয়েও অভিযোগ উঠেছিল। এবারের পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সাধারণত বছরের মে মাস থেকেই দরপত্রের প্রক্রিয়া শুরু হতো। কিন্তু এ বছর এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদ শূন্য থাকা সংক্রান্ত জটিলতার জেরে এ দরপত্রের প্রক্রিয়াটিই শুরু হয় অন্তত তিন মাস পর। এরপর আবার মূল্যায়নসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলো শেষ করতেও দেরি হচ্ছে। বিলম্বে কার্যাদেশ ও চুক্তি হলে শেষ সময়ে নিম্নমানের কাগজে বই দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও ইতিপূর্বে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার জন্য যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিল এবং মুদ্রণ শিল্প সমিতি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে শেষ সময়ে এবার আরও বেশি নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানোর আশঙ্কা আছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বরাত দিয়ে পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে যে, এটা ঠিক যে তারা সময়ের চেয়ে পিছিয়ে আছেন। এ জন্য কিছুটা আশঙ্কা থাকলেও তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে সময়মতো মানসম্মত বই দেয়া যায়। মুদ্রণকারীরাও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। আমরা মনে করি, বছরের শুরুতে ছাত্ররা নতুন বই নিয়ে উৎসব করবে- এটা নিছক উৎসব নয়, পড়াশোনার জন্য এটা একটি প্রেরণাও। একটি প্রতিষ্ঠান যেহেতু এই কাজটির জন্য নিয়োজিত তারা কেন তিন মাস দেরি করে বই ছাপার প্রক্রিয়া শুরু করবে এটা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

শিক্ষাকে কোনো শ্রেণির মধ্যে না রেখে একে সর্বজনীন করে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টা ছিল লক্ষণীয়। তিনি মনে করেন, শিক্ষা হবে অভিন্ন, গণমুখী ও সর্বজনীন বা সবার জন্য শিক্ষা। বাংলাদেশে কেউ নিরক্ষও থাকবে না। সবাই হবে স্বাক্ষর। প্রতি বছর ১ জানুয়ারি বই বিতরণ, দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা, উপবৃত্তি ইত্যাদি চলছে সাফল্যের সঙ্গে। লেখাপড়া করছে লাখ লাখ গ্রামের শিক্ষার্থী। দেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৫ ভাগ এবং প্রায় ৯৯ ভাগ শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। গ্রাম-শহর উভয় অঞ্চলেই বেড়েছে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার হার।

সারাদেশের শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে সময়মতো তাদের হাতে বই পৌঁছানোর জরুরি উদ্যোগ নিলে এটা কঠিন কাজ নয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar