• বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
  • ই-পেপার

রোহিঙ্গা প্রত্যাবসানে জরুরি উদ্যোগ নিন


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:১৮

শহীদুল ইসলাম (শুভ): রোহিঙ্গাদের জন্য উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের কর্মকাণ্ডে দিন দিন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে গুরুতর অপরাধে। একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদেরকে সংকট, ভয় ও নিরাপত্তার ঝুঁকিতে ফেলছে। টনক নড়ে যাচ্ছে আমাদের। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের পাশে বসবাস করা বাঙালিরা আতঙ্কিত জীবন যাপন করছে। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক মান সম্মান কমে আসছে। অর্থের লোভে তাদেরকে সহায়তা করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ পাশে বসবাস করা কিছু সাধারণ মানুষ। যা আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগ ও চিন্তাশীলতার বিষয়।

২০১৭ সালের ৫ আগস্ট শত থেকে হাজার, হাজার থেকে লাখো রোহিঙ্গা নিরাপদ আশ্রয়ের খুঁজে বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশও তাদের নিরাশ করেনি। সাদরে গ্রহণ করে তাদের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে। মিয়ানমারের সেনাদের হাতে নির্মূল উচ্ছেদের মুখে এবং ধর্ষণ, হত্যা ও বাড়িঘর জালিয়ে দেওয়ার পর প্রাণ রক্ষায় লাখো লাখো রোহিঙ্গাদের ঢল নেমে আসে এই ছোট্ট একটি দেশে। পরম মানবাধিকার মানবতার দেওয়াল হিসাবে সর্বস্তরের বাঙালি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেই নিরুপায় বাস্তুচ্যুতদের নিয়ে নানান ভয়ভীতিতে দিন পার করতে হচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ২৪টি ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের অমানবিক নির্যাতন করেছে। মায়ের সামনে মেয়ের লাশ বাবা ভাইয়ের সামনে মেয়ে, বোনের ধর্ষণের স্বীকার। ছোট্ট শিশু মৃত মায়ের বুকে হামাগুড়ির চিত্র পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। যার রেশ রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করছে।

রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার জন্য একাধিকবার চুক্তি, বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সফল হয়নি। বিশেষ করে ২০২১ সালের ১ ফেব্রæয়ারিতে যখন মিয়ানমারে সামরিক উত্থান হয় তখন তাদের সাথে আলোচনা করা জটিল হয়ে পড়ে। তাদের প্রত্যাবসানও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সামরিক সরকার চীনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। চীন রাশিয়ার সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব। ফলে জাতিসংঘ একাধিক বার মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনলে চীন রাশিয়া ভেটো দেয়। আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ফেললে চীন ও রাশিয়া পাশে দাঁড়ায়। মিয়ানমার থেকে চীনও গ্যাস, তেল, পেট্রোল ও খনিজের সুবিধা নিচ্ছে। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ মিয়ানমার প্রথম চুক্তি করে। একই বছরের ১৯ ডিসেম্বরে প্রায় ৯ লাখ রোহিঙ্গাদের তালিকা দেওয়া হয়েছে। মাত্র ২৯ হাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবসান নিয়েছে। ২০১৮ সালে পধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্ট বৈঠক করেন এবং আশ্বাস দিলেন। কিন্তু ফল হলো শূন্য। ২০১৯ সালে ২য় দফা উদ্যোগ নিলে তাও ব্যর্থ হয়েছে। ২০২১ সালে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সফল হয়নি। প্রকৃতপক্ষে চীন কখনো চাইবে না মিয়ানমার সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে রোহিঙ্গাদের দেশে পাঠানোর। এতে তাদের স্বার্থে আঘাত আসবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১০-১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। প্রতি বছর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পায় ৩০-৩৫ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। জনসংখ্যা গণহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের মধ্যে পারিবারিক পরিকল্পনাও নেই। শিক্ষিত হারও নেই। এই লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের এতোদিন বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিকভাবে খাবারের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপীয়দের থেকে খাবারের একটা বড় যোগান আসত। কিন্তু সাম্প্রতিক রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে এখন ইউক্রেনীয়দের দিকে তাকাতে হচ্ছে। আফগানিস্তানেও খাদ্যের সংকট রয়েছে। ফিলিস্তিনেও বাস্তুচ্যুত রয়েছে যাদের খাবারের যোগান দিতে হয় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে। পাকিস্তানের বন্যায় হাজার হাজার পরিবারও রাস্তায় নেমে গেল। তাদের খাবারের যোগানও দিতে হবে। ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্যের সংকটে পড়তে হবে। খাবারের অভাবেও তারা নানান গর্হিত কাজে অংশ নিচ্ছে এবং নিবে।

টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করছে স্থানীয় কিছু মানুষ এবং ইউপি সদস্যগণ। বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ একাধিক জায়গায় এরকম অনেক ঘটনা ঘটেছে। রোহিঙ্গাদের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েছে। এবং সেই পরিচয়পত্র দিয়ে বাহির দেশে পাড়িও জমাচ্ছিল। পাসপোর্ট করতে গিয়ে ধরা পড়ে। হয়তো এর আগে অনেকেই চলেও গিয়েছে। ছোট্ট জনবহুল দেশে আরো জনগণ বাড়ানো এবং বাহিরে গিয়ে নানান অপরাধ জড়িয়ে বাংলাদেশের মান কমানো আমাদের জন্য লজ্জাজনক। সারা বছরই নানান অপরাধ ও অপকর্মে জড়িয়ে থাকে। যাযাবরদের মতো লুণ্ঠন, চুরি, ডাকাতিই যেন তাদের প্রধান ও প্রথম পেশা ও নেশা। ১৬ জানুয়ারি (আরসা) আর্মির প্রধান আতাউল্লাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে মেরেছে এই রোহিঙ্গারা। জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে যদি তারা বাহির দেশে পাড়ি জমায় এবং নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের লাল-সবুজের পতাকার, সবুজ পাসপোর্টের এবং দেশের মান- মর্যাদা কোথায় গিয়ে পড়বে? সেই সাথে আমাদের দেশের নাগরিককেও সমস্যায় পড়তে হবে।
রোহিঙ্গাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে স্থানীয় যুবসমাজ।

মাদক পাচার, মানব পাচার, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, হত্যা, ধর্ষণ ও অবৈধ নেশা জাতীয় ওষুধ ইত্যাদিতে জড়িত। আইনশৃঙ্খলার তথ্য মতে, ২০২১ এর ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ২২ লক্ষাধিক ইয়াবা, দেশি-বিদেশি অস্ত্র, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ এবং নিষিদ্ধ করণ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী জব্দ করেন। সেই সাথে প্রায় ৯৭২ টি মামলাও করেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা একই স্থানে তাকায় অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। যদি আরো দীর্ঘদিন থাকে গাইলে আরো বেশি জটিল এবং কঠিন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়বে। এটার প্রভাব এসে পড়বে স্থানীয়- অস্থানীয়দের মধ্যে। যা আমাদের দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বা হবে সন্ত্রাসবাদ, কট্টরপন্থিতা, চরমপন্থি।

তাদের অপকর্মের ফলে দেশীয় যুবসম্প্রদায় পা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মান ক্ষুণœ হচ্ছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে একাধিক বার বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। মামলাও প্রায় ৫ শতাধিকের উপরে। আরসার চেয়ারম্যান মহিবুল্লাও ২০২১ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর বালুখালী ক্যাম্পে তাদের স্বজাতি ভাইয়ের হাতে খুন হয়েছে। আধিপত্য বিস্তারে নেশার মতো নানান অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। ২২ আগস্ট ১ হাজার ৬০টি ইয়াবা নিয়েও এক রোহিঙ্গা তরুণ আটক করা হয়। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ৩৩টি আশ্রয় শিবিরে ১৭-১৮ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। মামলা করা হয় প্রায় ২ হাজার ৩০৯টি এবং আসামি করা হয় ৫ হাজারের অধিক। যার সিংহভাগই তরুণ।

রোহিঙ্গাদের যথাসম্ভব প্রত্যাবসান না করা গেলে তরুণ প্রজন্ম অপরাধে জড়িয়ে পড়বে। তাদের অপরাধে ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মান এবং তরুণ সমাজ। প্রত্যাবসানের জন্য আঞ্চলিক দেশগুলো মুখ্য ভ‚মিকা পালন করতে পারে। তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এছাড়াও আসিয়ান, জাতিসংঘ বিশেষ করে ভারত, চীন রাশিয়া তাদের ভূমিকা থাকতে হবে। সর্বোপরি বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নানান সমস্যা, খাদ্যের সংকট, শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্র এবং তাদের অপরাধের কর্মকাণ্ডগুলো তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও চাপে রাখতে হবে। নইলে বাংলাদেশ বড় ঝুঁকিত পড়বে।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট।


poisha bazar