কিশোর অপরাধ ও আমাদের কর্তব্য


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৬ আগস্ট ২০২২, ১৬:২৮

অ্যাড. মো. রায়হান আলী: কিশোর অপরাধ ও অপরাধ প্রবণতার হার দিন দিন ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমান সময় বিবেচনায় এটি একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। কিশোর গ্যাং, কিশোর অপরাধের চিত্র যে কতটা বর্তমান সমাজকে নাজুক করে ফেলেছে তা বলা বাহুল্য। প্রতিনিয়তই আমরা গণমাধ্যমে কিশোর অপরাধের পরিসংখ্যানের হাল হকিকত দেখতে পাচ্ছি। এই কিশোর অপরাধের দৌরাত্ম্য কোনোভাবেই যেন রোধ করা যাচ্ছে না। এ অপরাধের রাশ টেনে ধরতে সরকার শিশু আইন ও আদালতসহ নানান প্রকার আইনি ব্যবস্থা রেখেছে। শিশু আইন ২০১৩-এর ৪ ধারা বিদ্যমান ‘অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন,অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সব ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হইবে।’

শিশু আইন অনুযায়ী বিদ্যমান কোনো আইনের অধীন কোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত অথবা বিচারে দোষী সাব্যস্ত কোনো শিশুকে সাধারণ জেলহাজতের পরিবর্তে নিরাপদ হেফাজতে বা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বা প্রত্যায়িত প্রতিষ্ঠানে রাখার বিধান রয়েছে।

শিশু আইনে একজন শিশু যত বড় অপরাধই করুক না কেন তার সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছরের বিধান রয়েছে। এ ছাড়াও একজন শিশু অপরাধীকে আদালত প্রবেশনে মুক্তি দিয়ে তাকে সংশোধনের সুযোগ দিতে পারে। আর এটা করার উদ্দেশ্য এই যে অপ্রাপ্ত বয়সে না বুঝে শিশুটি উক্ত অপরাধ করেছে, তা শর্তসাপেক্ষে সংশোধনের সুযোগ দিয়ে সমাজে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠুক। এ অপরাধের রাশ টেনে ধরতে পরিবার ও সমাজ কতটা দায়িত্ব পালন করছে এটাই বড় কথা। আমরা ডিজিটাল যুগে প্রায় সব কিছুই করছি ডিজিটাল। কৃষি ক্ষেত্র থেকে শুরু করে অফিস আদালত পর্যন্ত ডিজিটাইজেশনের ছোঁয়া। এ ডিজিটালাইজেশনের অপসংস্কৃতির ভয়াল গ্রাসে শিশু কিশোরদের মেধাশূন্য হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। শিশুরা সময় পেলে বই নয়, মোবাইল নিয়ে সময় কাটায়।

উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে না দিয়ে অভিভাকরা আদর করে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছে। আর সন্তানরা এই আদুরে স্মার্টফোনের অপব্যবহার করে একদিকে বইবিমুখ হচ্ছে, অন্যদিকে পর্নোগ্রাফি, সাইবার ক্রাইমসহ নানান অপরাধের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। একটা শিশু যখন কিছু কিছু বুঝতে শিখে তখনই যদি একজন অবিভাবক ঐ শিশুটির হাতে বিভিন্ন খেলনা কিংবা শিক্ষামূলক প্রদর্শনী তুলে না দিয়ে, তুলে দেয় স্মার্ট ফোন। আর এই ফোনে শিশুরা বিভিন্ন গেম খেলে সময় ব্যয় করে। তাহলে এই পশ্চিমা অপসংস্কৃতির তৈরি অ্যাপ জাতীয় ভিডিও গেমে সন্তানটি শিক্ষা নিচ্ছে কিভাবে পিস্তল চালাতে হয়, কিভাবে যুদ্ধ করতে হয়, কিভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম করতে হয়। এক কথায় বলা চলে শিশুটির বইয়ের শিক্ষাবিমুখ হয়ে ধীরে ধীরে তার আচার-আচরণ কেন জানি সন্ত্রাসী প্রকৃতির হয়ে যায়। একটা পর্যায়ে বাবা-মায়ের অবাধ্যতায় চলতে শুরু করে। মিশতে শুরু করে পাড়ার বখাটে ছেলেদের সঙ্গে। শুরু হয় শিশুটির অধপতন।

পাড়া মহল্লার বখাটে দলের সদস্যভুক্ত হয়ে হয়তোবা হয়ে যায় বড় ভাই বা দাদার দলের লোক! হায়রে জীবন! কারো কারো জীবনে ফুটতেই গোলাপ ঝরে যাচ্ছে। আবার কোন কোন বখাটে সন্তান এক কিশোর গ্যাং এর সাথে অন্য কিশোর গ্যাং এর দলের সাথে দ্বন্দের কারণে শুরু করে সন্ত্রাসী প্রকৃতির কার্যক্রম। দলাদলির কারণে কেউ কেউ পিস্তল কিংবা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়ে পত্রিকার হেডলাইন হয়-‘.... কিশোর গ্যাং এর দলাদলিতে নিহত অমুক’। এখন প্রশ্ন এই অপরাধের প্রথম হাতেখড়ি কার হাতে বলতে পাড়েন? কে এই কিশোরকে সন্ত্রাসী বানাতে সহযোগিতা করল? কে এই শিশুটিকে সাধারণ খেলনা হাতে না দিয়ে স্মার্টফোন দিয়ে নষ্ট বানালো? প্রশ্নগুলো রয়েই গেল। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের সামনে থাকে অদম্য আশা আর জীবন জগৎ সম্পর্কে থাকে অতিকৌতূহল। অনেক সময় প্রতিক‚ল পরিবেশগত কারণে আশাভঙ্গের বেদনায় হতাশার হাত ধরে নৈরাশ্যের অন্ধকারে পতিত হয় তাদের জীবন। এতে কিশোর বয়সীরা ধীরে ধীরে অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ে। কিশোর অপরাধ দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

বৃক্ষের ভালো ফল পেতে হলে যেমন ভাল বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে ফল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সঠিক পরিচর্যা করতে হয় তেমনি যোগ্য নাগরিক হিসেবে সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে হলেও সঠিক পরিচর্যার প্রয়োজন। আপনি সন্তানদের উপযুক্ত পন্থায় পরিচর্যা করবেন না, আদুরে ভাব দেখায় সন্তানদের জীবনকে হুমকির মুখে পতিত করে দিচ্ছেন আর বলবেন ছেলেটাকে আর ঠিক করতে পাড়লাম না, এ দোষ কার আপনি নিজেই ভেবে দেখেন। আমরা কথায় কথায় নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে যেন হাঁপ ছেড়ে বসি। একবারও নিজের কর্ম ও দোষের পর্যালোচনা করি না। একটা সন্তানকে জন্মের পর থেকে সঠিক দিকনির্দেশনায় মানুষের মতো মানুষ করার দায়িত্ব অভিভাবকের। শুধু সন্তানকে ভাত কাপড় আর টাকা-পয়সা দিলেই হবে না, সব কিছুই নিজেই পর্যবেক্ষণ করতে হবে অভিভাবকদের।

সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে চাই সুন্দর সামাজিক পরিকল্পনা। কিশোর অপরাধ যেহেতু সুষ্ঠু সমাজে গঠনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেহেতু সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের একজন সুনাগরিক হিসেবে আপনার আমারও কিছু দায়িত্ব থাকে। সেই দায়িত্ব থেকে আমরা সবাই নিজ নিজ পরিবারে শিশু-কিশোরদের স্মার্ট ফোন থেকে যতদূর সম্ভব দূরে রাখব। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে স্মার্ট ফোনের শিক্ষামূলক সাইডগুলো ইনস্টল করে তাদের শিক্ষা দেব। সকলের সার্বিক সহযোগিতায় সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কিশোর অপরাধ নির্মূলে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক: আইনজীবী ও কলামিস্ট।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar