নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের দাবি


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০১ আগস্ট ২০২২, ১৫:৪৪

জিয়াউল হক: নাগরিকের যেমন রাষ্ট্রের কাছে দাবি রয়েছে সম দাবি রাষ্ট্রেরও রয়েছে নাগরিকের কাছে। নাগরিক তার প্রাপ্য অধিকার যেমনি ভাবে রাষ্ট্রের কাছে থেকে কড়ায়গণ্ডায় আদায় করে নেয়। তেমনি রাষ্ট্রকেও তার প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া একজন সু-নাগরিকের দায়িত্ব। নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের যে দাবি বা প্রত্যাশা যাই বলি না কেন এটা পূর্ণ হলে আখেরে নাগরিকেরই কল্যাণ হয়। মনে রাখা উচিত রাষ্ট্র ও নাগরিক পৃথক দু’টি সত্তা এবং দু’টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটি বিহীন অন্যটি মূল্যহীন। নাগরিক তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে রাস্তায় নেমে হলেও তা আদায় করে নেয়। কিন্তু রাষ্ট্রের সে উপায় নেই। কারণ রাষ্ট্র তো আর রক্তে মাংসে গড়া সত্তা নয়। তবে রাষ্ট্রের অধিকার বুঝে নেয়ার জন্য রয়েছে আইন ও সংবিধান, যা নাগরিককে মানতে বাধ্য।

রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো হচ্ছে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা। নাগরিকের এই চাওয়া পূরণে রাষ্ট্র অপারগ হলে আমরা তাকে মন্দ রাষ্ট্র বলে সংজ্ঞায়িত করি। ব্যবস্থা মন্দ হলে সে দায় ব্যবস্থাপকের। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ম্যানেজারিয়াল টিমের। ম্যানেজারিয়াল টিম বলতে আমরা ক্ষমতাসীন সভাসদ। মন্দের দায় শুধু রাষ্ট্রের একার নয় নাগরিকেরও। কেননা নাগরিক স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করে বা ভোটের মাধ্যমে ব্যবস্থাপক বেছে নেয়। ইহাকে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, তাহলো ব্যবস্থাপকের মন্দ ভালো বোঝার মতো সম্যক জ্ঞান থাকাও নাগরিকের কম জরুরি নয়।

নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের প্রধান অধিকার বা দাবি রাষ্ট্রের কালা কানুনের প্রতি আনুগত্য স্বীকার। দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের প্রতি সংহতি জানানো। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধান ও অখণ্ডতা রক্ষা, বহিঃশত্রæর হাত থেকে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা, স্বাধীনতা সার্বোভৌমত্ব রক্ষা ও রাষ্ট্রকে অক্ষত রাখতে সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য সদা প্রস্তুত থাকা। সমাজে কোনরূপ শান্তিশৃঙ্খলা বিঘিœত না ঘটে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। যাতে কেউ আইন হাতে তুলে নিতে না পারে ও আইনের অপব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা এবং বেআইনি কার্যকলাপকে আইনিভাবে মোকাবিলা করা।

মনে রাখতে হবে যে রাষ্ট্র একটি সিস্টেম। এই সিস্টেমটি সয়ংক্রিয়ভাবে চলে না। একে পরিচালিত করতে হয়। আর পরিচালনা করতে দরকার ঢের খরচাপাতির। এই খরচার পয়সা আকাশ থেকে পড়ে না। রাষ্ট্র থেকেই সংগ্রহ করে নিতে হয়। রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস জনগণের পকেট। আরও নির্দিষ্ট করে বললে নিকট হতে প্রাপ্ত ভ্যাট, ট্যাক্স। নাগরিক কল্যাণ সাধনে সঠিক সময়ে নির্ধারিত পরিমাণ ভ্যাট ও ট্যাক্স পাওয়া রাষ্ট্রের অধিকার। রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের ওপর অর্পিত দায়িত্ব বিনাবাক্যে পালন করা উচিত। দেশের প্রতি দরদ  ও মমত্ববোধ থাকা, নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণ ও বিকাশ ঘটানো, ধার করা বা অপসংস্কৃতির হাত থেকে নিজস্ব সংস্কৃতিকে রক্ষা করাও নাগরিকের দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় সফলতায় আমরা যেমন খুশি হই তেমনি বিফলতায় রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানো উচিত। 

রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা নাগরিকের কর্তব্য। অনেক সময় দেখা যায় চোখের সামনে রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় হচ্ছে। তা দেখেও আমরা না দেখার ভান করে পাশ কেটে যাই। কারণ এসবক্ষেত্রে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করাকে আমরা উটকো ঝামেলা বলে গণ্য করি। আপাতদৃষ্টিতে এমন ঘটেও। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের অনেক দায় রয়েছে। দেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর প্রতি শ্রদ্ধা ও তার অবদানকে স্বীকার করা ও তার কৃতকর্ম স্মৃতিচিহ্ন মোরাল, প্রতিকৃতি, রক্ষণাবেক্ষণ করা নাগরিকের দায়িত্ব।  জাতির বীর সন্তানদের প্রাপ্য মর্যাদা দেয়াও নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দাবি। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ভিন্নমতাবলম্বী, ভিন্নধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু হিসেবে নয় সকলে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা বজায় রেখে হাতে হাত কাঁধেকাঁধ রেখে সকলে সকলের সহযোগিতার মনোভাব পোষণ করা। ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচার রুখতে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। দেশের সর্বস্তরে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সদা জাগ্রত থাকতে হবে। সততা ন্যায়পরায়ণতা ও রাষ্ট্রীয় আদেশ প্রতিপালনে নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হবে।

রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের দায় বলতে নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের পাওনা বা অধিকারকে নির্দেশ করে। তবে এটি কোন আর্থিক বা বৈশ্বিক পাওনা নয়। এটি নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পাওনা বা অধিকার। একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে নাগরিকের দায় নেহাৎ কম নয়। রাষ্ট্রে যদি মন্দ কালাকানুন চালু হয়। সেখানে নাগরিক যদি প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ না করে। তাহলে ধরে নিতে হবে মন্দ কালাকানুনে নাগরিকের সায় রয়েছে। রাষ্ট্রকে সঠিক পথের দীক্ষা কেবল সচেতন নাগরিকই দিতে পারে। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্র একটি তরী আর নাগরিক তার তরণী। যেভাবে তরীর হাল ধরবে তরী সেভাবেই এগোবে। না হলে দুষ্ট জল চক্রে তরী সলিল সমাধি হবে। নাগরিক যদি সবকিছু দেখে শুনে মৌনব্রত পালন করে তাহলে মন্দ ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় আনুক‚ল্যতা লাভ করবে। পরে শুধু শুধু রাষ্ট্রকে দোষ দিয়ে নিজের দায় এড়ানো যাবে না। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এখন প্রতিনিয়ত তাই ঘটছে।

রাষ্ট্রীয় আইন মান্য করা সকল নাগরিকের সাংবিধানিক কর্তব্য। অথচ আমরা আইন অমান্যকেই ক্ষমতাজ্ঞান করি। তাহলে আমরা কি করছি? সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করাকে নিজের পাওয়ার হিসেবে গণ্য করছি। আমরা প্রতিনিয়ত সচেতন চিত্তেই এই বদ চর্চা করছি। অথচ আমরা কল্যাণ রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রের তুলনা করছি। কিন্তু নিজেরা কল্যাণকর নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলছি না। এটা কিছুটা আত্মপ্রবঞ্চনার মতো। নিজের সাথে প্রতারণার শামিল।

বর্তমানে আমরা যেকোন উপায়ে আত্ম সমৃদ্ধি চাই। সেখানে রাষ্ট্রীয় নিয়মে তোয়াক্কা করছি না। মনোভাবটা এমন যে রাষ্ট্র না হয় গোল্লায় যাক। টিনের চশমা পরে শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধিকে বড় করে দেখছি। সেক্ষেত্রে কোনটা ন্যয় আর কোনটা অন্যায় তা জেনে বুঝেই নিজের স্বার্থের স্বাস্থ্য বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে দিচ্ছি। এটি রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়। পরিশেষে বলতে হয় রাষ্ট্রকে তার অধিকার বুঝে দিতে প্রকারান্তরে আমরা আমাদের অধিকার আদায় করছি। ন্যায় ও সমতা ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মানে রাষ্ট্রের অধিকার বুঝে না দেয়ার কোন বিকল্প নেই।  

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar