একজন গুণী মানুষের চিরবিদায়


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ৩০ এপ্রিল ২০২২, ২০:৩৩,  আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২২, ২০:৪৭

কুল্লু নাফসিন জাইকাতুল মাউত। অর্থাৎ, জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে (সূরা আল ইমরানঃ আয়াত-১৮৫)। আবুল মাল আবদুল মুহিত ও তার ব্যতিক্রম নয়। একটি নির্দিষ্ট সময় নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে আসে এটাই বুঝা যায় এই আয়াতের মাধ্যমে। মানুষ মরে এটা সত্য, সেরকম সত্য মানুষের ভালমন্দের কৃতকর্মের জন্য মানুষ এই পৃথিবীতে অমরতা লাভ করে কিংবা মৃত্যুর সাথে সাথে তার নাম পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে যায় । আবুল মাল আবদুল মুহিত মহতী কাজ করে গেছেন নীরবে তাই জাতি তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে ।

আসুন আমরা এই গুণী মানুষ সম্পর্কে জেনে নেই-

তিনি ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল তার মৃত্যু হয় । তিনি ৮৮ বছর বেঁচে ছিলেন। বাবা আবু আহমদ আব্দুল হাফিজ এবং মাতা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী । পিতা ও মাতা দুইজনই তৎকালীন সিলেট জেলার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন । বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও তার ছোট ভাই ।

ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র ।তিনি ১৯৪৯ সালে সিলেট সরকারি পাইলট হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতকার্য হন । পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে তিনি সিলেটের এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক(সম্মান)এ প্রথম শ্রেণী পেয়ে কৃতকার্য হন। পরের বছর ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ও অধ্যয়ন করেন । এছাড়া ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ভাষা সংগ্রামে ও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস সংস্হার কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব হিসেবে ও তিনি দায়িত্ব পালন করেন (১৯৬০-১৯৬৯ সাল পর্যন্ত)।

অর্থনৈতিক পরামর্শক হিসেবে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন পাকিস্তান দূতাবাসে যোগদান করেছিলেন। এছাড়া পাকিস্তানের কর্মপরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ও উপ-সচিব ছিলেন। সেই সময়ের পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরেছিলেন এবং পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসে পেশ করেন। দেশ স্বাধীন পরবর্তীতে তিনি ১৯৭২ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮১ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে নিজ ইচ্ছায় অবসর নেন । তারপর কাজ শুরু করেন ফোর্ড ফাউনডেশনের অর্থনীতি এবং উন্নয়ন বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন সংস্হা বা ইফাদেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ, আইডিবি এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
তিনি ১৯৮৪-১৯৮৫ সালে প্রিন্সটন ইউনিভারসিটির ভিজিটিং ফেলো ছিলেন । বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের তিনি একজন পথিকৃৎ এবং বাপার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

২০০১ সালের আগস্টে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। সে বছরের অক্টোবরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হয়েছিলেন।
২০০৮ সালে সিলেট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং শেখ হাসিনা সরকারে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ২০১৪ সালে সিলেট-১ আসন থেকে পুনরায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে আবার ও শেখ হাসিনা সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান ।

২০১৫ সালের ১৬ জুন উনার বিভিন্ন অবদানের জন্য তার নামে রাখা হয় সিলেট জেলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের নাম । ২০১৬ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রধান করা হয় এই গুণী মানুষটিকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন ।

লেখক হিসেবে ও তিনি ছিলেন সফল । প্রশাসনিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্হ ছাড়া ও বিভিন্ন বিষয়ে তার ৩০ টি গ্রন্হ প্রকাশিত হয়েছে । তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৬ সালে প্রিয় মুহিতকে তমঘা ই খিদমত পদকে ভূষিত করে ।
মুহিতের সহধর্মিণী সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তাদের মোট তিন সন্তান । প্রথম কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার, বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্ত্তকলাবিদ এবং অন্য ছেলে সামির মুহিত একজন শিক্ষক।

এই বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী আবুল মাল আবদুল মুহিত তিনি নিজে সিলেট অনলাইন টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না।’ তার মৃত্যুর খবর হয়ত তার অন্তর আত্মা আগে থেকেই জেনে গিয়েছিল।
ইসলামী বিশ্বাস মতে বান্দা তার মৃত্যুর ৪০ দিন পূর্ব হতেই তার মৃত্যুর খবর জেনে নিতে পারে, যদি সে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়। এই প্রিয় ব্যক্তি যেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা হন এই কামনা করি।

একজন রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, একজন লেখক, একজন অর্থনীতিবিদ, একজন পরিবেশবিদ হিসেবে তার বর্ণাঢ্য জীবন আমাদেরকে কীর্তিমান মানুষ হয়ে ওঠার প্রেরণা যোগায়।

সিলেট বিভাগের উন্নয়ন নিয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তিনি যা করেছেন তাতে তিনি তৃপ্ত বোধ করছেন। যদিও সমালোচনা আছে, তিনি সিলেট বিভাগের অন্যান্য সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, শাহ এ এম এস কিবরিয়া সাহেবদের মত সিলেট বিভাগের সার্বিক উন্নতিতে অবদান রাখতে ততটা সফল নয়। আজ ও সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায় একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় ভাল ডাক্তারের অভাবে ভালো চিকিৎসা সম্ভব না হওয়াতে, সিলেট ওসমানী হাসপাতালে রোগী রেফার করেন ডাক্তাররা । অনেক রোগী সেখানে পৌছার আগেই রাস্তার মধ্যেই তার মৃত্যু হতে দেখা যায়। কেন এখনো একটি জরুরী এবং প্রয়োজনীয় দাবির বাস্তবায়ন হচ্চেনা ? তা এই জেলার মানুষের জানা নেই।

একজন মানুষের শতভাগ সফলতা আশা করা ও যায়না । তবুও তিনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে কারণ তিনি শুধু সিলেটকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়ত ভালোবাসেন নি । তিনি সমস্ত দেশকে এক করে দেখেছেন এই প্রিয় মানুষটি । এমন হত হতে পারে হয়ত তাকে সিলেটের উন্নয়নে সরকার যথেস্ট বরাদ্দ দেয়নি।

মুহিত সাহেবের সরলতা, স্পস্টতা মানুষকে সব সময় মুগ্ধ করেছে। তার প্রানবন্ত হাসি বাংলাদেশের মানুষ আর দেখতে পারবেনা। আপনাকে আল্লাহ ওপারে ভালো রাখুন এই দোয়াই করি ।

লেখকঃ আজিজুল আম্বিয়া, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট। email: [email protected]


poisha bazar