ই-প্রতারণা কি বন্ধ হবে না


  • ১৯ নভেম্বর ২০২১, ১১:৫৫

মো. নাজমুচ্ছাকিব

আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাগরিক। করোনার কারণে দীর্ঘ দিন আমাদের দেশ শাট-ডাউন অবস্থায় ছিল। এছাড়াও সারা বিশ্বের পড়াশোনা, ব্যবসা বাণিজ্য, বিচার কার্য সকল কিছু আস্তে আস্তে অনলাইনের দিকে চলে যাচ্ছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের ব্যবাস বাণিজ্য খুব দ্রুত অনলাইনে চলে এসেছে। আর এখানেই এর সুযোগে আমাদের দেশের কিছু অসাধু চক্র প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা।
এছাড়া আমরা যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করি আমাদেরও মাঝে মাঝে বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হতে হচ্ছে।

সম্প্রতি ফেসবুকে বই প্রেমী এক গ্রুপে বই উপহার দেয়ার নাম করে কুরিয়ার খরচ বাবদ টাকা নিয়ে আইডি ডিজেবল করে দিয়েছে। এছাড়াও প্রেমের নামে প্রতিদিন হেনস্থা হতে হচ্ছে হাজারো নারীকে। ফারুক মাসুদের মতো হাজারো অপরাধী যখন ধরা-ছোঁয়া এর বাহিরে থাকে তখন এদেশের নারীদের ভার্চুয়াল হ্যারেজমেন্ট এর শিকার হতে হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া এর এক নারী শিক্ষার্থী আমাদের জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বড় ভাই, বা ক্লাসমেটরা প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে রাতবিরাতে ফেসবুকে মেসেজ দিতেই থাকে। তাদের প্রস্তাব না মানলে নানান হুমকি দিতে থাকে এবং বাজে মেসেজ পাঠাতে থাকে। একটা আইডি ব্লক করলে অন্য আইডি থেকে নক দিয়ে থাকে।’

এই চিত্রটি শুধু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের না, বরং আমাদের দেশের সরকারি বেসরকারি সকল বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল কলেজের। এছাড়াও অপরিচিত মানুষও ভার্চুয়াল মিডিয়াতে নানানভাবে হেনস্থা করে আসছে।

২২ দেশের ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী ১৪ হাজার নারীর ওপর প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এই গবেষণা চালিয়েছে। তাদের মধ্যে ব্রাজিল, ভারত, নাইজেরিয়া, স্পেন, থাইল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের নারীরাও রয়েছেন।

নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, কম বয়সী নারীদের লক্ষ্য করে অনলাইনের যৌন হয়রানি চলে। এমনকি গবেষণায় অংশ নেয়া কয়েকজন নারী বলেছেন, আট বছর বয়স থেকে তারা অনলাইনে যৌন হয়রানির মুখে পড়েছেন।

এ ব্যাপারে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী অ্যান্নে বিরগিট্টে অ্যালব্রেক্টসেন বলেছেন, নারী প্রতি এমন বীভৎস আচরণ করা হচ্ছে যে তারা ভয়েই মুখ খুলছেন না। এদিকে ওই জরিপে অংশ নেয়া নারীদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ বলেছেন তারা ফেসবুকে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ইনস্টাগ্রামে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৩ শতাংশ নারী। হোয়াটসঅ্যাপের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ১৪ শতাংশ। স্ন্যাপচ্যাটে ১০ শতাংশ, টুইটারে ৯ শতাংশ এবং টিকটকে ছয় শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এছাড়াও প্রতিবেদনের বাহিরে পড়ে আছে আরো কত হাজার ঘটনা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ই প্ল্যাটফর্মে শুধু নারীকে হেনস্থা করা হচ্ছে এমন নয়। ব্যবসাতেও করা হচ্ছে প্রতারণা। আমাদের দেশের যে সকল ই-প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়ী আছেন তারা প্রতারণার পথ কে সুগম করার জন্য দেশের বিভিন্ন খ্যাতমান ব্যক্তিদেরকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করে রাখে। সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মুর্তজা থেকে শুরু করে এমন জনপ্রিয় ব্যক্তিদেরকে অ্যাম্বাসেডর করে মানুষের মনের আস্থা গড়ে তুলে তারা প্রতারণা করতেছে।

এছাড়া ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে গড়ে উঠেছে হাজারো গ্রুপ যেখানে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন। সেখানে অর্ডার করে অনেক সময় কোনো পণ্য দেয়া হচ্ছে না। যদিও বা পণ্য পাঠিয়ে থাকে সেটা থাকছে একেবারে মানহীন।

ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালি বা আল ইহসানের মতো ই-প্রতারকদের কথা দেশের মানুষ কখনো ভুলতে পারবে না। ই-অরেঞ্জ, ই-কমার্সের নামে এক লাখ মানুষের এক হাজার ১০০ কোটি টাকা নিয়ে গেছে নানা অফারের নামে। কিন্তু তাদের ব্যাংক হিসেবে পাওয়া গেছে মাত্র তিন কোটি টাকা। আর ই-ভ্যালির চলতি সম্পদ আছে ১০৫ কোটি টাকার। দায় ৫৪৪ কোটি টাকা। এই হিসাব তারা নিজেরাই করে ১৯ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। তাহলে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অফারের নামে নেয়া নগদ টাকা কোথায় গেল?

এছাড়াও করোনার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিগত কোচিং বা কিন্টারগার্ডেনগুলো অনলাইনে ক্লাসের নামে লুফিয়ে নিয়েছে হাজারো টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিংগুলো নামে মাত্র কয়েকদিন অনলাইন মিডিয়াতে ক্লাস নিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৭০০০-১৫০০০ টাকা। এছাড়াও ফ্রিল্যান্সিং এর নামে বিভিন্ন অনলাইন প্রতিষ্ঠান লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

ই-প্ল্যাটফর্মে প্রতারিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, ‘সিগনেচার মাইন্ড ইন্সটিটিউট এবং এনেক্স ওয়ার্ল্ড ওয়াইড লিমিটেড এর নামে ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ শিখানোর কথা বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সিনিয়র এবং জুনিয়রদের একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে তিনিসহ শখানেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা করে প্রায় কয়েক লাখ টাকা নেয়। পরবর্তীতে তারা নামকাওয়াস্তে কয়েকটি ক্লাস করিয়ে তাদের এমএলএম ব্যবসায় আসার জন্য প্ররোচিত করতে থাকে। পরবর্তীতে তারা টাকা ফেরত চাওয়াতে বিভিন্ন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।’

এতো গেলো নারী বিষয়ক, ব্যবসা বাণিজ্য বা শিক্ষা খাতের কথা। এবার যদি আমরা যদি চিকিৎসার দিকে নজর দেয় তাহলে দেখব সেখানেও মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। ই-ডাক্তারের নামে সেখানে করা হচ্ছে প্রতারণা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো জ্ঞান নেই তারা ফেসবুকে বিভিন্ন নামে বেনামে পেজ খুলে ভুয়া চিকিৎসা করছে। যাতে করে রোগ তো ভালো হচ্ছেই না বরং আরো বড় বড় রোগ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও ইউটিব বা ফেসবুকে বিভিন্ন ভিত্তিহীন ভিডিও আপলোড করে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি বলেন চিকিৎসায় ব্যয় মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৬৫ লাখ মানুষ দরিদ্র হচ্ছে। তারা চিকিৎসার ৬৪ শতাংশ নিজেদের পকেট থেকে ব্যয় করে থাকেন। ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা (ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ) নিশ্চিত করতে হলে সারাদেশে প্রতিষ্ঠিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। প্রবন্ধে তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, ৩১-৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থায়ী ও অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ প্রাপ্ত ২১ থেকে ৩৫ জন ডাক্তারের পোস্টিং থাকলেও এদের মধ্যে নিয়মিত ৩ থেকে ৫ জন ডাক্তার সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকেন।

অবশিষ্ট ডাক্তারেরা নিয়মিত কর্মস্থলে আসেন না। এর বাইরে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়েছে কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা। এদের মধ্যে খুব সংখ্যক ডাক্তারকে কর্মস্থলে উপস্থিত পাওয়া যায়। শহরে ১৫শ’ লোকের জন্য একজন ডাক্তার । গ্রামে ১৫,০০০ লোকের জন্য একজন ডাক্তার। আসলে তিনজন ডাক্তারের বিপরীতে একজন নার্স থাকার কথা। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।

এতো গেলো সামান্য চিত্র এছাড়াও আমাদের দেশে আরো হাজারো ঘটনা রয়েছে যা আমাদের চোখের সামনে আসছে না। এই ভাবে অনলাইনে বা বাস্তব জীবনে অনিয়ম প্রতারণাতে আমাদের দেশ ভরে গেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের কাছে আমাদের অনুরোধ এসকল প্রতারণা দূর করণে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া


poisha bazar

ads
ads