• বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি ২০২২
  • ই-পেপার

ব্যবসা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকার বিবর্তন


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৩:১৬,  আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৩:২১

ড. শামসুল আলম

বিশ্বখ্যাত ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি দিয়েই শুরু করি। যে দেশে সংবাদপত্র স্বাধীন, সে দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না- ‘No substantial famine has ever occurred in any independent and democratic country with a relatively free press’. এ উদ্ধৃতির তাৎপর্য হল, একটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গণমাধ্যম ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

আমাদের দেশে এখনো সাড়ে ৪ কোটির ওপর লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। দরিদ্র লোকের বঞ্চনা অনেক বেশি, কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ খুব কম। কেননা তারা সংগঠিত নয়। উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম শর্ত হচ্ছে জ্ঞান স¤প্রসারণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে আমাদেরকে আগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং এর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। যাদের তথ্যভাণ্ডার যত সমৃদ্ধ, তাদের ক্ষমতায়ন তত বেশি।

তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তই যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত হয়। অবাধ তথ্যভিত্তিক সমাজ সে কারণেই হয় উন্নত। মিডিয়াকে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ জরুরি। প্রথমত, গণমাধ্যম হবে স্বাধীন; দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম মানসম্পন্ন তথ্য সরবরাহ করবে; এবং তৃতীয়ত, এর পরিসর বড় হতে হবে, মানে জনগণের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে গণমাধ্যমের সঙ্গে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থ হল, ভয়হীনভাবে সত্যনিষ্ঠ কোনো তথ্য প্রকাশ করার ক্ষমতা এবং বিশেষ কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের কিংবা গোষ্ঠীর পক্ষ বা নিয়ন্ত্রিত হয়ে কাজ না করা। যদিও গণমাধ্যমের গুণগত মান পরিমাপ করা কঠিন, তথাপি মানসম্পন্ন তথ্য সরবরাহ করার অর্থ হলা, বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ ও তথ্য উপস্থাপন করা। তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা থাকতে হবে এবং সব মত উপস্থাপন করতে হবে, যাতে পাঠককুল সত্য উদ্ঘাটন করতে পারে।

আমি মনে করি, কতগুলো বিষয় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন-গণমাধ্যমের মালিকানার কাঠামো, অর্থনৈতিক কাঠামো ও অর্থায়নের সহজলভ্যতা, তথ্যে প্রবেশের জন্য একটি দেশের প্রচলিত বিধান এবং মিডিয়াবিষয়ক নীতিমালা। অন্যদিকে গুণগত মানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সেই সঙ্গে নৈর্ব্যত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। অর্থাৎ নিজ স্বার্থ দ্বারা বিবেচনাবোধ তাড়িত হবে না।

তৃতীয় শর্তটি হচ্ছে, মিডিয়া কত লোকের কাছে পৌঁছাচ্ছে; মিডিয়ার ওপর লোকজনের প্রবেশ (ধপপবংং) কতটুকু আছে। সংবাদপত্র যদি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে না পারে মনে করা হয়, লোকে তা পড়বে না। তবে স্বল্প শিক্ষিত স্বল্পোন্নত দেশে হলুদ সাংবাদিকতা অবশ্যই জনগণের কোনো কোনো অংশকে বিভ্রান্ত করতে পারে। যে দেশে মাথাপিছু গ্রস ন্যাশনাল প্রডাক্ট (জিএনপি) যত বেশি, সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে তত অ্যাকসেস বেশি। আমরা এ রকম একটি সম্পর্ক দেখতে পাই।

গণমাধ্যম মানুষের মনোজগৎ নিয়ন্ত্রণ করে। এ প্রেক্ষাপটে মিডিয়া অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ফলাফল বদলে দিতে পারে। যেমন- বিগত শতকের ষাটের দশক থেকে স্বাধীনতার ঊষালগ্ন পর্যন্ত জাতীয় জাগরণে জনগণের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল তখনকার প্রায় সব প্রিন্ট মিডিয়া। জনগণ ও গণমাধ্যমের এমন অবিভাজ্য ঘনিষ্ঠতা বাঙালির ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি। তখন নেতৃস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর মালিকানা ছিল সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের হাতে।

তবে আজকে মালিকানা যাদের হাতেই থাক, নাগরিক শ্রেণির মতামত প্রকাশে বর্তমানের মিডিয়াগুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে, যা এর প্রশংসিত দিক। তবে স্বাধীন দেশে মিডিয়া কতটুকু জোরাল ভূমিকা পালন করতে পারে, তা নির্ভর করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর। কেননা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর মুক্ত গণমাধ্যম একে অন্যের পরিপূরক। দুটোই একে অন্যকে প্রভাবিত করে।

স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষত বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে মিডিয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। স্বাধীনতার প্রারম্ভিক কয়েক বছর পর পুনরায় মিডিয়া বিকশিত হতে শুরু করে ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর থেকে। অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও ব্যক্তি খাতের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের ব্যাপক স¤প্রসারণ শুরু হয়েছিল।

বিগত দশকে বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও এফএম রেডিওর সূচনার মাধ্যমে মিডিয়ার ল্যান্ডস্ক্যাপ বা ভূমিতলের ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে যাদের সংবাদপত্র বা স্যাটেলাইট টেলিভিশনের সুবিধা নেই, তারা এখন এফএম রেডিওর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সংবাদ জানতে পারছে।

বাংলাদেশে মিডিয়ার সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত দুর্নীতি বিষয়কে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসা। তাছাড়া বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে সাধারণভাবে মিডিয়া সোচ্চার। স্টক মার্কেট কিংবা হল-মার্ক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা আজ আমাদের আর্থিক খাতে অসঙ্গতির বিষয়টি তুলে ধরেছে।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি ও এর ভয়ানক প্রভাব সম্পর্কে প্রিন্ট মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এটাকে অন্যতম বড় বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ফলে সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষত ইউনিসেফ, ডব্লিওএইচও ও বিশ্বব্যাংক এগিয়ে এসেছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার এটাকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছিল সংবাদপত্রের প্রচার-প্রচারণায় বাধ্য হয়ে।

পরিবেশ ও নদী রক্ষার আন্দোলনেও গণমাধ্যম জোরালোভাবে এগিয়ে এসেছে। আজকে বুড়িগঙ্গা বা পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন হোক কিংবা নদী রক্ষার, মিডিয়া যদি কার্যকর ভূমিকা পালন না করে তাহলে সরকারের উদ্যোগ ফলপ্রসূ ও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে না। জনসচেতনতা বাড়বে না। অবৈধ স্থাপনা ও নদী দখলের বিরুদ্ধে আমাদের প্রিন্ট মিডিয়া প্রতিনিয়ত প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। ফলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সহজ হচ্ছে।

অনুরূপভাবে আমরা দেখি, এসিড সন্ত্রাস, গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিয়ে ও ফতোয়া জারির বিরুদ্ধে মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক জনসমর্থন ও জনসচেনতা বেড়েছে। ফলে এসিড সন্ত্রাস এখন অনেকাংশে কমে এসেছে। তবে বিপরীতভাবে এটাও সত্য, মিডিয়া যদি আরো বলিষ্ঠভাবে ভূমিকা পালন করত তাহলে তাজরীন ফ্যাশনস বা রানা প্লাজার মতো এত বড় দুর্ঘটনা হয়তো পরিহার করা যেত। এ বিষয়ে গভীর ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যথেষ্ট ছিল না।

বাংলাদেশের একটা বড় সমস্যা হল, রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন। ঠিক তদরূপ মিডিয়ার পরিসরটাও বিশেষত রাজধানীকে কেন্দ্র করে। এখনো গ্রামাঞ্চলের সিংহভাগ লোকের কাছে প্রিন্ট মিডিয়া পৌঁছে না। সে কারণে সেখানে সে ধরনের কোনো পাঠকসমাজ গড়ে ওঠেনি। এর একটা বড় কারণ হতে পারে আমাদের শিল্পায়ন যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেভাবে এগিয়ে যায়নি।

ফলে বিজ্ঞাপনের বাজারটা ঢাকার বাইরে এত বড় নয়। তদুপরি গ্রামাঞ্চলের সমস্যাগুলো মিডিয়ায় সেভাবে গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করা হয় না। চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীনের পর তেমন গ্রামঘনিষ্ঠ সাংবাদিক আজ আর দেখা যায় না। আমাদের দেশে মিডিয়ার একটা নেতিবাচক দিক হল, তারা সেসব খবরই বেশি প্রচার করে যেগুলো খামখেয়ালি পাবলিকের বেশি পছন্দ। সে খবর কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বিষয় নয়।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেখা গেছে, গণমাধ্যমের কর্মীরা সহিংস ঘটনা বেশি প্রচার করার ফলে দুষ্কৃতকারীরা সাংবাদিকদের ডেকে এনে বিস্ফোরণ ঘটাত। যেন নেতিবাচকতা আর নেতিবাচকতায় বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল তখন। সহিংস ঘটনার পাশাপাশি ভালো খবরগুলো তুলে আনতে পারলে তা সহিংসতাকে উসকে দিত না হয়তো। কিছু ক্ষেত্রে মিডিয়ার কোনো বিষয়কে নিয়ে অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি দেখা যায়। ফলে গণমানুষের মনে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়। যেমন- ৫ মে হেফাজতের সমাবেশ ও তৎপরবর্তী ঘটনাকে কেন্দ্র করে অগণিত মৃত্যুসংখ্যার প্রচার, যার আদৌ কোনো ভিত্তি ছিল না।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, কতিপয় প্রগতিশীল ও সুশীল নামধারী পত্রিকাকে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে রফা বা আপস করতে দেখা যায়। এ কারণেই সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকেও প্রগতিশীল ও জননন্দিত কলামিস্টরা আজকাল লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। প্রচুর মিডিয়া এখন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তদুপরি আমাদের গণমাধ্যম বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে-নাগরিক সমাজের অনেকেই এমন মনে করেন।

সাকসেস স্টোরির জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় বিশ্বখ্যাত পত্রিকা ‘দি ইকোনমিস্ট’, দ্য গার্ডিয়ান’ এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতের ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’ কিংবা অমর্ত্য সেনের মতো ব্যক্তিদের লেখনীর ওপর। গোল্ডম্যান স্যাকস বাংলাদেশকে নেক্সট ইলেভেন হিসেবে চিহ্নিত করে অথচ আমাদের সংবাদমাধ্যম নেতিবাচক দিক বেশি তুলে ধরার প্রবণতা দেখায়-এমন অভিযোগ রয়েছে।

পরিশেষে আমি বলতে চাই, মিডিয়ার কর্মীদের আরো বেশি পরিমাণে মানসম্পন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা উচিত। সেজন্য মালিকানা কাঠামোকে আরো গণমুখী ও জনসম্পৃক্ততাপূর্ণ করা যায় কিনা ভাবতে হবে। গণমাধ্যম হতে পারে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতাগুলো নিখুঁত ও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত। তাতে রাষ্ট্রের পক্ষে তার প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন সহজতর হবে এবং সরকার অধিক জণকল্যাণমুখী ও গণমুখী হতে বাধ্য হবে। জনসচেতনতা বাড়িয়েই কেবল সুশাসনের চাহিদা বাড়ানো যাবে। সুশাসন আমাদের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে।


poisha bazar

ads
ads