রাসেলের মৃত্যু আমার জীবন বদলে দিয়েছিল     


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:২৭,  আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:৩১

মিনার মনসুর

বঙ্গবন্ধুর পর শেখ রাসেল নামটি বাঙালির আবেগ ও ভালোবাসার। আমার আবেগ একটু ভিন্নরকম। রাসেলের মৃত্যু আমার জীবন বদলে দিয়েছিল। অবশ্য ওর সঙ্গে আমার বয়সের ব্যবধান খুব বেশি নয়। মানব ইতিহাসের ঘৃণ্যতম সশস্ত্র ঘাতকদের দল যখন নিরস্ত্র নিরীহ নিষ্পাপ এ-শিশুটির বুক ঝাঁজরা করে দেয়, আমি তখন এসএসসির রেজাল্টের অপেক্ষায় অস্থির সময় পার করছি। অস্থির এ কারণে যে মনে হচ্ছিল জীবনের এক জটিল চৌরাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি আমি।

কোন পথে যাব, কী করব কিছুই জানি না। এর মূল কারণ ছিল রাজনীতির প্রতি আমার দুর্বার আকর্ষণ। ফলে আমার সামান্য জীবনটাকে আরো অস্থির করে তুলেছিল তখনকার বেদনাদায়ক রাজনৈতিক বাস্তবতা। দুনিয়া কাঁপানো ঐক্য, সাহস, স্বপ্ন ও মহত্ত্বের চেতনা নিয়ে যে জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়েছিল, মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তা আমূল বদলে গিয়েছিল। সেই স্থানটি দখল করে নিয়েছিল অনৈক্য, হানাহানি, কাপুরুষতা, শঠতা ও নিচতার মতো যাবতীয় বদগুণ। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ একটা জাতি কীভাবে রাতারাতি এতটা বদলে যেতে পারে তা আমি আজও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারি না।

বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল নানা ষড়যন্ত্রের গন্ধ। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর গণরোষের ভয়ে যে কুলাঙ্গাররা বিবরবাসী হয়েছিল, অশুভ প্রেতাত্মার মতো তারা আবার বেরিয়ে আসতে শুরু করে জনপদে। তাদের মেকাপচর্চিত মুখে তখন আকর্ণবিস্তৃত হাসি আর আস্তিনের নিচে জিঘাংসার লকলকে ছুরি। অথচ সেদিকে তাকানোর মতো ফুরসতটুকুও ছিল না কাররোই। মাত্র কিছুদিন আগেও যারা দেশের জন্য নিজের জীবন বাজি ধরেছিল হাসিমুখে, তাদের বৃহদাংশই তখন পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। সর্বোপরি, চরম দুঃসময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মতো যে সব মহৎ আদর্শ বা মূলনীতির ভিত্তিতে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিল এ জনপদের মানুষ, বিস্ময়করভাবে ঐক্যের সেই মূল ভিত্তিগুলো নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল রাতারাতি। সেই সঙ্গে বিপজ্জনকভাবে মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছিল পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের সৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা ও হানাহানির ঘৃণ্য রাজনীতি।

প্রতিক্রিয়ার পুনরুত্থানের এই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে সদ্য স্বাধীন এ দেশটির একমাত্র রক্ষাকবচ বা ঐক্যের প্রতীক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মিত্ররা না জানলেও শত্রুরা তা ভালো করেই জানতেন। তাই তাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছিল তাদের সকল ষড়যন্ত্র। লক্ষ্য ভয়ঙ্কর। অব্যাহত অপপ্রচার ও মিথ্যাচারের তৈরি করা হচ্ছিল ক্ষেত্র। আর তাতে ইন্ধন জোগাচ্ছিল দেশি বিদেশি নানাচক্র।

আমার বয়সটা তখন রবীন্দ্রনাথের ফটিকের মতো। মনের অবস্থা তার চেয়েও সংকটাপন্ন। স্বাধীনতার আকাশচুম্বী যে স্বপ্ন ও আবেগ আমার সমগ্র শৈশব কৈশোরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, কঠিন বাস্তবতার আঘাতে তার তাল কেটে গিয়েছিল। হতাশার পাল্লা ভারি হয়ে উঠছিল দিন দিন। একমাত্র ভরসা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার কাছে আমার প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। আমি ভাবতাম, তিনি চাইলেই রাতারাতি সব বদলে যাবে। সেটা একেবারে অসম্ভবও হয়তো ছিল না। কিন্তু জাদুকরী ব্যক্তিত্বের অধিকারী সেই মানুষটিও তখন শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছেন ভেতরে বাইরে। অথচ সেটা বোঝার মতো রাজনৈতিক জ্ঞান কিংবা প্রজ্ঞা আমার ছিল না। ফলে স্বপ্নভঙ্গের বেদনাই বলি আর ক্ষোভই বলি সব গিয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধুর ওপর।

ঘন হতে থাকে অভিমানের মেঘ। বিপ্লবী রুশ সাহিত্য পড়ে আর সাহিত্যের ঘরোয়া আড্ডাগুলোতে ঘুরে আমার সময় কাটে। কিন্তু অস্থিরতা কাটে না। কোথায় বঙ্গবন্ধু আর কোথায় আমি! তবু মাঝে মাঝে ইচ্ছে হতো ছুটে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকেই আমার কষ্ট ও ক্ষোভের কথা বলি। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব ছিল না। এদিকে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের হাবভাব এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া এ সংগঠনটির নিবেদিত প্রাণ কর্মীদের মলিন মুখ দেখে মনোবেদনা আরো বেড়ে যেতে লাগল। সব মিলিয়ে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ঘরে বাইরে কোথাও কোনো অবলম্বন খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

ঠিক ও সময়টাতেই সংঘটিত হয় মানব ইতিহাসের কাপুরুষোচিত ও ঘৃণ্যতম সেই হত্যাযজ্ঞ। কোনো বঙ্গসন্তান বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারে বিশ্বের বোধবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষই তা কল্পনা করতে পারেনি। কিন্তু বঙ্গজ ঘাতকরা সেদিন মহৎপ্রাণ সেই মাটির মানুষটিকে শুধু নয়, তার পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকেই হত্যা করেছিল পাশবিক উন্মত্ততায়। পরে এ উন্মত্ততাকে নানা রকম যুক্তির পোশাক পরানোর চেষ্টাও হয়েছে। নির্লজ্জভাবে ‘জায়েয’ করার চেষ্টা হয়েছে বর্বরতম সেই হত্যাযজ্ঞকে। সেই অপচেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে। তবে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল তা হলো, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বেনিফিসিয়ারি ভুঁইফোঁড় রাজনৈতিক দল বা দলসমূহের শীর্ষপদে আসীন কতিপয় উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তা কিংবা জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিকই শুধু নন, ‘সুশীল সমাজ’ এর তকমাধারী বহু বরেণ্য ব্যক্তিও এতে অংশ নিয়েছেন সগর্বে।

একদিকে যখন অবৈধ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলকারীরা ঘাতকদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে, অন্যদিকে তখন এই ‘সুশীল’রা তাদেরকে জাতীয় বীর বানানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন বিরামহীনভাবে। বাংলার ইতিহাসের নিকৃষ্টতম এইসব নরঘাতককে ‘সূর্যসন্তান’ আখ্যা দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি তারা।

ভুক্তভোগীদের পক্ষে সেই সময়ের সেইসব অসহনীয় অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়া কঠিন। সে রকম ভয়ঙ্কর কিছু স্মৃতি জীবিতরা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন নীরবে নিঃশব্দে। তবে তাদেরও বয়স বাড়ছে। তারা নিজে থেকে মুখ না খুললে তা হয়তো এ দেশের মানুষের অজানাই থেকে যাবে চিরতরে। আর কিছু স্মৃতি দলিল আকারে মুদ্রিত আছে তখনকার পত্রপত্রিকার পাতায়। ইতোমধ্যে অনেকেই ভোল পালটে ফেলেছেন। তবে তখন তারা যা বলেছেন এবং খুনিদের সঙ্গে যেভাবে গলাগলি করেছেন, সেগুলো এখন তাদের সামনে হাজির করা হলে চক্ষুহীন বিবেকর্জিত এই মানুষগুলোও শিহরিত হবেন বলে আমার ধারণা।

নিরপরাধ যে মানুষগুলো সেদিন নজিরবিহীন অন্যায়ের শিকার হলেন তাদের নয়, বরং অন্যায় যারা সংঘটিত করেছে সেই আত্মস্বীকৃত খুনিদের পক্ষ নিয়েছিলেন তারা। এজন্য তাদের সামান্য লজ্জাবোধও হয়নি। কেউ অনুতপ্ত হয়েছে এমনটাও শোনা যায়নি। বরং তারা জাতির পিতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডকেই শুধু বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেননি, এইসঙ্গে সেই কালরাতে রাসেলসহ যে সব শিশু ও নারীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাকেও ‘জায়েয’ করার যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছেন। সেটা কতটা হƒদয়বিদারক হতে পারে তার একটি উদাহরণ এখানে তুলে ধরা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

ঘটনাটি লে. জে. এরশাদের স্বৈরশাসনের পতন পরবর্তী পর্যায়ের। বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বে বিএনপি সরকার তখন ক্ষমতায়। আমি তখন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। সেখানে আমার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা। নানা প্রয়োজনে অনেকই এখানে আসতেন। আমাকেও বেশ ছুটোছুটি করতে হতো প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে।

সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ থাকায় কাজটি আমি বেশ উপভোগও করতাম। এখানে আমি প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় কাজ করেছি। সারা দেশ ঘোরারও সুযোগ পেয়েছি। মিশেছি নানা রকম মানুষের সংগে প্রিয় অপ্রিয় অনেক অভিজ্ঞতাও জমা হয়েছে স্মৃতির ভাণ্ডারে। কিন্তু একটি অভিজ্ঞতা আমি আজও ভুলতে পারিনি এবং কখনো ভুলতে পারব বলে মনে হয় না। সেটি বলার জন্যই এতো কথা বলা। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন বিশিষ্ট একজন নারীনেত্রী কী একটা কাজে এসেছিলেন আমার সেই কর্মস্থলে। অপেক্ষার সময়টুকুতে আমি তাকে সঙ্গ দিচ্ছিলাম।

কথা প্রসঙ্গে কিছুটা অভিযোগের সুরে তিনি বলছিলেন যে বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি নৃশংসতা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু কেউ কিছু করছে না। তার কথার সূত্র ধরেই আমি বললাম, এ দেশের বিবেকবান মানুষেরা যদি শিশু রাসেল হত্যার যথোচিত প্রতিবাদ জানাতেন, তা হলে হয়তো এমনটা হতো না...। আমার কথা শুনে তিনি এতটাই ক্ষিপ্ত হন যে প্রায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন।

আমাকে থামিয়ে দিয়ে খুবই উত্তেজিতভাবে তিনি বলেন, ‘এটাই তো আপনাদের সমস্যা! আপনারা আওয়ামী লীগরা সবকিছুর মধ্যে রাজনীতি নিয়ে আসেন!’ তার আচরণে আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি। মুহূর্তে সমগ্র পরিবেশটাই বদলে যায়। তিনি শুধু যে আমার বয়সে বড় তাই নয়, অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজনও বটে। কেন তিনি এতটা উত্তেজিত হলেনÑতা আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না। যতদূর মনে পড়ে, আমি তাকে বিনিতভাবে কিছু একটা বলার চেষ্টা করেছিলোম। কিন্তু আমার কথা শোনার মতো ধৈর্য তার ছিল না।

তিনি একা নন। এ দেশের অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়েও যারা কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েন, বক্তৃতা বিবৃতির তোড়ে জাতির কান ঝালাপালা করে ফেলেন, দাতাদের অনুগ্রহভাজন শান্তি ও মানবাধিকারের সেই ‘সোল এজেন্ট’রা বরাবরই এমন ভাব দেখিয়ে আসছেন যে পঁচাত্তরের সেই কালরাতে কিছুই ঘটেনি! যদি ঘটেও থাকে তাতে তাদের কথিত ‘শান্তি ও মানবাধিকারের’ গায়ে বিন্দুমাত্র আঁচড়ও লাগেনি।

অতি মূল্যবান এই ‘নিরপেক্ষ’ ভূমিকার জন্য তারা ইতোমধ্যে নানা রকম ‘ইনাম’ও পেয়েছেন দেশে বিদেশে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এদের অনেকেই এখনো ‘জাতির বিবেক’ সেজে বসে আছে। ভাবতে অবাক লাগে যে, জীবনানন্দ দাশ আজ থেকে অর্ধশতকেরও বেশি সময় আগে তার ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতায় যে ভয়াবহ চিত্রটি এঁকে গেছেন তা একটুও বদলায়নি। পুরো কবিতটিই এখানে উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করা গেল না;

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;

যাদের হƒদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি

এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়

মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা

শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

বস্তুত এরা হলেন জ্ঞানপাপী। তারা সবই জানেন। সবই বোঝেন। সে কারণেই অস্ত্রধারী ঘাতকদের চেয়ে এদেরকেই আমার অধিক বিপজ্জনক বলে মনে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও তার ঐতিহাসিক বাকশাল বক্তৃতায় এদের স্বরূপ তুলে ধরেছেন। বলেছেন, আমি তিনটি জিনিসকে ভয় পাই সাপ, কুমির ও বিশ্বাসঘাতক। এরা তার চেয়েও বিপজ্জনক। কারণ স্বার্থসিদ্ধির জন্য এরা পারে না হেন কাজ নেই। সেই বক্তৃতার বৃহদাংশজুড়ে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই ‘ভদ্রলোকদের’ সমালোচনা করেছিলেন। বলেছিলেন, ভালো হয়ে যেতে। সেই সঙ্গে পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করে দিয়েছিলেন।

আর বিস্ময়করভাবে তার কয়েক মাসের মধ্যেই তাকেই সপরিবারে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হয়। এটা ছিল ঠান্ডা মাথার একটি হত্যাকাণ্ড। এর পেছনে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিলো। ছিল ভয়ঙ্কর একটি নীলনকশা। যারা এ বর্বরতার শিকার হয়েছিল তারা ছিলেন সর্ম্পূণ নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত। অন্যদিকে, ঘাতকদের সকলেই ছিলেন সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সশস্ত্র। বেশিরভগাই পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। আর যাকে তারা হত্যা করতে গিয়েছিল তিনি কেবল জাতির পিতা বা স্থপতিই নন, দেশের আইনানুগ প্রেসিডেন্টও বটে।

সামরিক বাহিনীর এ কর্মকর্তারা এই মর্মে শপথ নিয়েছেন যে নিজেদের জীবনের বিনিময়ে হলেও প্রেসিডেন্টের জীবন রক্ষা করবেন। নিশ্চিত করবেন দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা। প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার জন্যই রাষ্ট্র তাদের বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। দায়িত্ব নিয়েছিল তাদের ভরণপোষণের। তাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল অস্ত্র। সেই অস্ত্র দিয়ে তারা দেশের প্রেসিডেন্টকে হত্যা করেছিল। হত্যা করেছিল তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ও নিকটাত্মীয়সহ অনেক নিরপরাধ নারী ও শিশুকে। এক সঙ্গে অনেকগুলো অপরাধ করেছিল তারা।

প্রথমত, শপথ ভঙ্গ করেছিল। দ্বিতীয়, যে সংবিধানের অধীনে তারা শপথ নিয়েছিল চরম অবমাননা করেছিল তার। তৃতীয়ত, লাখ লাখ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশটিকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছিল তারা। ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল তার সকল মান মর্যাদা ও গৌরব। সর্বোপরি, গণহত্যা সংঘটিত করেছিল যা জঘন্য অপরাধ।

ঘৃণ্যতম এ অপরাধী চক্রকে কারা কীভাবে দিনের পর দিন আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে এবং ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে কীভাবে তাদেরকে আইনের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে তাও সর্বজনবিদিত। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক স্বৈরশাসকরা শুধু তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্যই এটা করেনি, এখানে ঘাতকদের প্রতি দায়বদ্ধতাজনিত ঋণশোধেরও একটা ব্যাপার ছিল। কারণ ঘাতকরাই তাদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে ছিল কিংবা বসার সুযোগ করে দিয়েছিল। শাসক ও ঘাতকদের এই বীভৎস গলাগলি দেখে দেখে আমি বেড়ে উঠেছি। তারা এমনভাবে মিলেমিশে গিয়েছিল যে, কে যে ঘাতক তা আলাদা করা যেত না।

দীর্ঘসময় ধরে অব্যাহত ছিল শাসক ও ঘাতকের এই সম্মিলিতি কোরাস। আর তাতে শরিক হয়েছিলেন তথাকথিত ‘বিপ্লবী’ রাজনীতিক এবং ‘সুশীল’দের একটি উল্লেযোগ্য অংশ। আমি এবং আমার সমবয়সী বন্ধুদের মধ্যে প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্রোধের জš§ দিয়েছিল এ ঘটনা। এ অশুভ চক্রটিকে প্রতিরোধ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম আমরা। কেউ কলমকেই অস্ত্র বানিয়েছিল, আর কেউ বা সংগ্রামমুখর রাজপথকেই সঙ্গী করে নিয়েছিল স্থায়ীভাবে। অস্ত্র দিয়েও প্রতিরোধ করতে উদ্যোগী হয়েছিল কেউ কেউ। আমাদের হৃদয়-উৎসারিত সেইসব উদ্যোগ যে একেবারে বৃথা যায়নি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথাটি হলো, আমার সব বিভ্রান্তি কেটে গিয়েছিল। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের সেই কালরাতে যে ভয়ঙ্কর অন্ধকার নেমে এসেছিল গোটা দেশজুড়ে, সেই অন্ধকারই পথ দেখিয়েছিল আমাকে। স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল শত্রুমিত্র। যারা দাতমুখ খিচিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার পক্ষে ১০১টি কুযুক্তি দেখাতেন, আমি তাদেরকে শুধু একটি প্রশ্নই করতাম। সেটি হলো, রাসেলকে কেনো হত্যা করা হয়েছিল? যারা এ বর্বরতার পক্ষাবলম্বন করে বা আকারে ইঙ্গিতে তার পক্ষে ওকালতি করে তাদেরকে পশুর দলভুক্ত করতেও আমার দ্বিধা হয়। পশুদেরও তাদের শাবকদের প্রতি অতুলনীয় মমত্ববোধ আছে। ছানাপানার নিরাপত্তার জন্য জীবন দিতেও দ্বিধা করে না তারা।

রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত পঙক্তি হলো, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে-তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।’ আমি আজও সেইসব ঘাতক এবং তাদের পক্ষাবলম্বনকারীদের ঘৃণা করে চলেছি। আমৃত্যু তাই করে যাব। মানুষকে ঘৃণা করা পাপ। কিন্তু যারা নরাধম তাদের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য নয়। শিশু রাসেল জীবন দিয়ে এ সহজ সত্যটি আমার চেতনায় স্থায়ীভাবে খোদাই করে দিয়েছিল। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো স্পষ্ট করে দিয়েছিল আমার যাত্রাপথ। রাসেলের মৃত্যুই আমাকে মানুষ অমানুষ আলাদা করতে শিখিয়েছিল। আর সেই সঙ্গে বদলে গিয়েছিল আমার জীবন।

বিশ্বব্যাপী শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে শেখ রাসেলের জš§দিনকে জাতীয় দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। পৃথিবীর আর একটি শিশুও যেন কোন ধরনের নৃশংসতার শিকার না হয়। শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবী জুড়ে শিশুরা নিরাপদে বাস করুক।


poisha bazar

ads
ads