সাপে কাটা চিকিৎসায় থামাতে হবে ওঝাদের দৌরাত্ম্য


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৬ অক্টোবর ২০২১, ১৩:৪০

সৈয়দ রিফাত

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া সরীসৃপ প্রজাতির শীতল রক্ত বিশিষ্ট প্রাণীদের বসবাসের আদর্শ স্থান হওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির সাপ এখানে বিকশিত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) তথ্য মতে, বাংলাদেশে ৯২ প্রজাতির সাপ রয়েছে। এদের মধ্যে  ২৬টি প্রজাতি বিষধর, যার ১২টি হলো সামুদ্রিক। বাকি ১৪টি প্রজাতির মধ্যে বেশিরভাগই লোকালয় থেকে দূরে বনে জঙ্গলে বাস করে।

বিষধর সাপের প্রজাতিগুলোর মধ্যে সাধারণত পদ্মগোখরা, খইয়া গোখরা, শঙ্খচূড়ের কামড়েই আমাদের দেশে মানুষ বেশি মারা যায়। এ ছাড়া রয়েছে পাতি কালাচ, শঙ্খিনী, রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া এবং সবুজ বোড়া। অধিকাংশ প্রজাতি শান্ত স্বভাবের হলেও ঘটনাচক্রে আক্রান্ত হয়ে কিংবা ভয় পেয়ে সাপে কামড়ানোর ঘটনা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর সাপের কামড়ের শিকার হয় প্রায় সাত লাখ মানুষ এবং মৃত্যু প্রায় ছয় হাজারেরও বেশি। বিষধর সাপের কামড়ের একমাত্র চিকিৎসা এন্টিভেনম। বাংলাদেশে ‘সর্প দংশন চিকিৎসা নীতিমালা ২০১৯’ অনুসারে সাপেকাটা রোগীর চিকিৎসা হিসেবে স্নেক এন্টিভেনম, কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস ব্যবস্থা এবং আনুষঙ্গিক চিকিৎসা অনুসরণ করা হয়ে থাকে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীই ওঝা চিকিৎসার ওপর দৃঢ় বিশ্বাস এবং কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে সাপেকাটা রোগীর চিকিৎসায় ঝাড়ফুঁক, শিকড়-বাকড় কিংবা তাবিজের ওপর নির্ভরশীল।

তাদের এই অবৈজ্ঞানিক ভ্রান্ত ধারণাকে পুঁজি করে একশ্রেণির অসাধু ‘ওঝা, ফকির কিংবা বৈদ্য’ নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। অপচিকিৎসায় বাড়িয়ে তুলছে সাপেকাটা রোগীর মৃত্যুহার এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি। রাজশাহী স্নেক রেসকিউ অ্যান্ড কনজারভেশন সেন্টারের তথ্যমতে, জুন, জুলাই এবং আগস্ট মাসের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে মোট ৩৮ জন মানুষ ওঝার চিকিৎসা নিয়ে মারা গেছেন। একবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও কুসংস্কার যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না।

বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চল এবং মফস্বলে সাপের কামড়ের ঘটনা বেশি ঘটায় এসব এলাকায় ওঝাদের দৌরাত্ম্যও বেশি। উক্তক্ত না করলে কিংবা খুব বেশি ভয় না পেলে সাপ সব ছোবলেই বিষ নিঃসরণ করে না। যা ড্রাই বাইট নামে পরিচিত। আবার অনেকসময় অজ্ঞতার কারণে নির্বিষ সাপকে বিষধর ভেবেও মানুষ ভুল করে। ড্রাই বাইট কিংবা নির্বিষ সাপের কামড়ের সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে বোকা বানিয়ে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিচ্ছে এসব ওঝা বা বৈদ্যরা।

বিষ অপসারণের নাটকের মাধ্যমে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রতারণা করছে মানুষের সরল বিশ্বাসের সাথে। যার ফলে গ্রামগঞ্জ কিংবা মফস্বলের মানুষ এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব কিংবা বিভিন্ন ধরনের স্থায়ী শারীরিক সমস্য। অথচ সময়মতো হাসপাতালে নিলে অধিকাংশ রোগীরই প্রাণ বাঁচানো এবং ক্ষয়ক্ষতির হার কমানো সম্ভব। কেউ কেউ সাপে কাটা রোগীকে হাসপাতালে নিতে চাইলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার চাপে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না, এমনকি তাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্নও হতে হয়।

ওঝার অপচিকিৎসায় অধিকাংশ রোগীরই ‘গোল্ডেন আওয়ার’ পার হয়ে যায়, ফলে পরবর্তীতে হাসপাতালে নিলেও রোগীর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয় না। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, ওঝার চিকিৎসার পর রোগীর প্রাণহানি ঘটলেও তা সকলেই ‘নিয়তির লিখন’ ভেবে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে। নিজেদের ব্যবসা চালু রাখতে ওঝারা ‘সাপেকাটা রোগীকে ঝাড়ফুঁক ছাড়া বাঁচানো সম্ভব নয়; দাঁড়াশ সাপ গাভীর বাট চুষে দুধ খায়; সাপের মাথায় মহামূল্যবান মণি থাকে’ এ ধরনের ভ্রান্ত ধারনা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। এছাড়াও দিনের পর দিন খেলা দেখানোর উদ্দেশ্য তারা সাপকে বন্দি করে, অভুক্ত রেখে এবং বিষদাঁত নষ্ট করে নিজেদের বসে আনার চেষ্টা করে থাকে, যা ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২’ বিরুদ্ধ।

ওঝাদের এমন দৌরাত্ম্য এবং প্রতারণার কারণে প্রতিনিয়ত দেশে সাপের কামড়ে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়লেও এ ধরনের অপচিকিৎসা বন্ধে নেই কোনো ধরনের আইনের প্রয়োগ। বাংলাদেশে চিকিৎসকদের ভুল সংশোধনে উত্তম মধ্যম দেয়ার মতো ঘটনার কথা শোনা গেলেও ওঝাদের বিষয়ে যেন সকলেই নীরব। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে আরো বেশি পরিমাণ  বিষাক্ত এবং বিষধর  সাপ থাকা সত্ত্বেও সেসব স্থানে সাপে কামড়ের সংখ্যা, পঙ্গুত্ববরণ ও মৃত্যু খুবই নগণ্য।

বাংলাদেশে সাপে কাটা রোগীর প্রাণ বাঁচানোর পথে অন্যতম অন্তরায় এসব ওঝা বা বৈদ্য শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। যারা প্রতিনিয়ত অপচিকিৎসা এবং ভ্রান্ত ধারণা ছড়ানোর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চল কিংবা মফস্বলে সাপেকাটা রোগীর  প্রাণহানির সংখ্যা বাড়িয়েই চলেছে। তাই জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ওঝাপ্রথা নির্মূলে পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


poisha bazar

ads
ads