ফিরছে নকশিকাঁথার দিন


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৬ অক্টোবর ২০২১, ১৩:৩৭

শাপলা খাতুন

ঐতিহ্যবাহী একটি সেলাই শিল্প হলো নকশিকাঁথা।  আমাদের গ্রামবাংলার নারীদের সুনিপুণ হাতের জাদুতে তৈরি হয় নকশিকাঁথা। ভারত ও বাংলাদেশের লোকশিল্পের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ নকশিকাঁথা। মনের মাধুরী মিশিয়ে লাল, নীল, হলুদ প্রভৃতি রংবেরঙের সুতায় কাপড়ের ওপর সুঁইয়ের আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হয় নানা ধরনের আল্পনা, ফুল, পাখি ও লতাপাতার ছবি। চিত্তাকর্ষক এসব লাবণ্যময় বাহারি চিত্র দেখে চেনা যায় নকশিকাঁথা। সংস্কৃত শব্দ ‘কন্থা’ ও প্রাকৃত শব্দ ‘কথ্থা’ থেকে ‘কাঁথা’ শব্দের উৎপত্তি। এর আভিধানিক অর্থ ‘জীর্ণ বস্ত্রে প্রস্তুত শোয়ার সময়ে গায়ে দেয়ার মোটা শীতবস্ত্র বিশেষ’। অঞ্চলভেদে এদেশে কাঁথাকে খাতা, খেতা, কেথা বা কেতা নামেও ডাকা হয়।  নকশিকাঁথা হলো সাধারণ কাঁথার ওপর নানা ধরনের নকশা করে বানানো বিশেষ প্রকারের দৃষ্টিনন্দন কাঁথা।

আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নকশিকাঁথার সংস্কৃতি রয়েছে।  ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, যশোর, খুলনাসহ প্রায় সব অঞ্চলেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাঁথা বানানোর সংস্কৃতি। তবে প্রতি অঞ্চলের নকশিকাঁথারই রয়েছে আলাদা স্বকীয়তা। কাঁথার ফোঁড়, সেলাইয়ের কৌশল ও নকশার ব্যবহারই বলে দেয় কাঁথাটি কোন অঞ্চলের। রাজশাহী, বগুড়া ও কুষ্টিয়ার নকশিকাঁথা আকারে বড় ও পুরু, সেলাই তেমন সূক্ষ্ম নয়। এতে জ্যামিতিক নকশা ও ফুল, লতাপাতার নকশার ব্যবহারই বেশি। অন্যদিকে যশোর, ফরিদপুর ও খুলনা অঞ্চলের কাঁথা আকারে তেমন বড় নয় এবং পাতলা। সূক্ষ্ম সেলাইয়ে মানুষ ও পশুপাখির মোটিফ বেশি ব্যবহার করা হয় এ অঞ্চলে। অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে জনপ্রিয় পাঁচ রকমের কাঁথা রয়েছে,  লহরী কাঁথা, সুজনী কাঁথা, লীক কাঁথা, কার্পেট কাঁথা ও ছোপটানা কাঁথা।

সাধারণত গ্রামের নারীরা সাংসারিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে শৌখিনতাবশত নকশিকাঁথা তৈরি করতো। মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে মা, নানি-দাদিরা মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর সময় বাহারি রঙ এর নকশিকাঁথা সঙ্গে দিত। গ্রাম অঞ্চলে এখনো এটার প্রচলন রয়েছে। মেয়ে বিয়ে দেয়ার পর ৮-১০টি বাহারি রকমের নকশিকাঁথা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো হয়। নতুন কাপড়ের মধ্যে বাহারি নকশিকাঁথা দেয়াটা গ্রামীণ সংস্কৃতিতে খুবই স্বাভাবিক বিষয়। বাড়িতে মেহমান আসলেই নানা রঙের হাতের কাজের বিছানার চাঁদর, বালিশ, বালিশের কভার দস্তরখানা  ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।

আমাদের পল্লীকবি জসীম উদ্দীন “নকশিকাঁথার মাঠ” এ যে আখ্যান দিয়েছেন সেটা কোনো ভিনদেশি রূপকথা নয়। নকশিকাঁথার বাইরের সৌন্দর্য যতটা বিচিত্র, এর ভেতরের গল্প তার চেয়ে হাজার গুণে বেশি আবেগময়, বেদনাবিধুর, চমকপ্রদ ও তাৎপর্যপূর্ণ। নকশিকাঁথার মাঠ হচ্ছে বাঙালি নারীর প্রাণ আর সৌন্দর্য হচ্ছে বৈচিত্র্যময় জীবনের বৈচিত্র্যময় প্রতিচ্ছবি। প্রেম আর প্রকৃতি এখানে অবিচ্ছেদ্য সেতু বন্ধন।  আবহমান কাল ধরে বাঙালি নারীরা প্রিয়জনের বিরহে নকশিকাঁথা বুনেছে। বিদেশ বিভুঁইয়ে স্বজনের স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠেছে তাদের কাঁথার বুননে। সেই কাঁথা কেউ হয়তো পৌঁছে দিয়েছে প্রিয়জনের কাছে। কারো হয়তো “নকশিকাঁথার মাঠ” এর সাজুর মতো রুপাইয়ের হাতে কাঁথা তুলে দেয়ার সাধ অপূর্ণই রয়ে গেছে। নকশার নান্দনিকতা এবং আবেগ নকশিকাঁথাকে বাংলার লোকশিল্পের অনন্য অংশ করে তুলেছে।  সেলাইয়ের ফোঁড়ে ফোঁড়ে, কাঁথার শরীরে গ্রামবাংলার যাপিত জীবনের যে চিত্র, সেই শৈল্পিকতাকে অগ্রাহ্য করবার উপায় নেই।  তোমাকেই যেন দেখিয়াছি শতরূপে শতবার! কথাটি নকশিকাঁথার সাথে গভীরভাবে জড়িত।

বর্তমানে আমাদের দেশে নকশিকাঁথার চলনে ভিন্নতা এসেছে অন্যরকমভাবে। ব্যক্তিগত শখের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তৈরি হচ্ছে নকশিকাঁথা। পুরাতন কাপড় ও সুতার পরিবর্তে ব্যবহƒত হচ্ছে নতুন মার্কিন লালসালু কিংবা সাদা-কালো ও রঙিন কাপড় এবং বিদেশি সিল্কি পেটি সুতা। করোনা মহামারীতে অনেক নারী উদ্যোক্তা নকশিকাঁথার ব্যবসায় সফলতা অর্জন করেছেন। উপার্জনের প্রধান উৎস হিসেবে নকশিকাঁথাকে বেছে নিয়েছেন অনেকে।  প্রচুর চাহিদা থাকায় লাভবান হচ্ছেন নকশিকাঁথার উদ্যোক্তারা। একেকটা কাঁথা ৩, ৫ বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। আমাদের অর্থনীতির সমৃদ্ধিতে নকশিকাঁথা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়। পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে নকশিকাঁথা বর্তমানে এসে পৌঁছেছে।  দস্তরখানার জায়গা নিয়ে নিয়েছে নকশা করা টেবিল ম্যাট। সুজনী কাঁথার জায়গা দখল করেছে নকশা করা বেড কাভার। তবে কুশনের কভার, ওয়্যারম্যাট, বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ, কিংবা পোশাক! সব জায়গায় ভিন্নরূপে জায়গা দখল করেছে নকশিকাঁথা। যুগে যুগে প্রিয়ার মতোই তার দেখা মেলে শত রূপে শত বার! হারাতে হারাতেও,  নানা রূপে, নানা ঢঙে ফিরে এসেছে নকশিকাঁথা। অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সভ্যতার। তৈরি হয়েছে অর্থ উপার্জনের এক আকর্ষণীয় মাধ্যম।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


poisha bazar

ads
ads