জলবায়ু বিপর্যয় এবং বাংলাদেশের ঝুঁকি


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৬ অক্টোবর ২০২১, ১৩:২১

মোহাম্মদ ইয়াছিন ইসলাম

পৃথিবীজুড়ে বর্তমানে আতঙ্কের একটি নাম মহামারী করোনা ভাইরাস। তবে করোনার চেয়েও বড় বিপর্যয় পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে।  এই বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে থাকবে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ুর পরিবর্তন। পরিবেশের অত্যধিক দূষণের ফলে ধীরে ধীরে জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দ্রুত পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে গলতে শুরু করেছে মেরু অঞ্চলের বরফ ঝড়, বন্য, জলোচ্ছ্বাস, দাবানলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ হলেও মানুষের আচরণ ও অবহেলার কারণে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে তার চারপাশের পরিবেশ। সেই সাথে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। বাংলাদেশে পরিবেশের অবক্ষয় ও দূষণ একটি বড় সমস্যা। উপর্যুপরি বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ জলবায়ু ও আবহাওয়ার অস্থিরতাসহ অন্যান্য পরিবেশগত সমস্যা এখন মানুষের নিত্যসঙ্গী। এসবের মূলে মানুষের কর্মকাণ্ডই প্রধানত দায়ী। যথেচ্ছ বৃক্ষ নিধন, অধিক জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, যানবাহনের কালোধোঁয়া, জোরালো শব্দের হর্ন, আবাসিক এলাকায় শিল্প কারখানা ও ইটভাটার অবস্থান, ইত্যাদি পরিবেশকে দূষিত করছে।

পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষ কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠী নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের মুখে পড়েছে সারা বিশ্বের মানুষ। বিশেষত গত ২০ বছরে এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে আমেরিকা মহাদেশেও। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (সিআরআই)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হন্ডুরাস, তারপরেই আছে মিয়ানমারের নাম। চতুর্থ অবস্থানে আছে নিকারাগুয়া, পঞ্চম ফিলিপাইন ও ষষ্ঠ অবস্থানে বাংলাদেশ।

গেল ২০ বছরে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নানা কুফলে মারা যায় ৫ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (পিপিপিতে) ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর এর সরাসরি ফলাফল হিসাবে আবহাওয়া বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে ১১ হাজারটি। ‘ইউএনইপি অ্যাডাপ্টেশন গ্যাপ’-এর  ২০১৩ সালের রিপোর্টে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বা ফলাফলের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক খরচের পরিমাণ এখনকার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে যাবে।

আর বর্তমানে যা ধারণা করা হচ্ছে, তার চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বাড়বে ২০৫০ সাল নাগাদ। অন্যদিকে ওই রিপোর্টটিতে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ার সীমা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এতে করে একদিকে যেমন মানুষের দুর্ভোগ কমবে অন্যদিকে নামতে থাকবে খরচের হারও।

বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ গ্রাউন্ডস ওয়েল প্রতিবেদনে আশংঙ্কা করা হয় যে ২০৩০ সাল নাগাদ পরিবেশের বিপর্যয় শুরু হতে পারে। তবে এটি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে ২০৫০ সালে। এ সময় দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ুর কারণে অভিবাসিত হবে ৪ কোটি মানুষ এবং যার অর্ধেকই হবে বাংলাদেশের। আরেকটি জরিপে দেখা যায় যে আকাশপথে ভ্রমণের কারণে আগামী ২০ বছরে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ আরো ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী তিন দশকে ২১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দাবদাহ, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, যা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশের সরকারের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির ২০১৪ সালের মূল্যায়নে এই বিষয়গুলো উঠে আসে। ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বড় অংশে দাবদাহ ক্রমাগত বাড়ছে। একইভাবে, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে ভারি বৃষ্টিপাতের তীব্রতা  বেড়েছে এবং কিছু দিন পরপরই বিশ্বের নানা জায়গায় একই উদাহরণ সৃষ্টি হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। বছরের প্রায় দশ মাস গরম থাকা, শুধু গরম বললে ভুল হবে। তীব্র গরম। বছরে কোনো রকমে দুই মাস তাপমাত্রা একটু কম থাকে, যার মধ্যে এক মাসকে আমরা এখন শীতকাল বলে ধরে নিই। সেটি সাধারণত নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এক মাস পর শীত আসবে, অথচ তখনও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে। বছরের মাঝখানে কারণে-অকারনে শুরু হয় অতিবৃষ্টি, যার ফলাফল হলো বন্যা। এ বছর যেমন শরৎকালেও ১৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এসব ঘটনাকে গবেষকেরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে দেখছেন। এসবের ফলে দেশে খাদ্য উৎপাদন কমছে, বাড়ছে নিত্য নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অসুখ-বিসুখ। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঘরহারা মানুষের সংখ্যা। ফলাফল হিসেবে শহরাঞ্চলে বস্তিবাসীর সংখ্যাও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) তাদের চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আশঙ্কা জানিয়েছে যে, এই শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ডুবে যেতে পারে।  দেশের ১৯টি জেলার প্রায় ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ওই ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। এ কারণে ঘর হারাবে প্রায় দুই কোটি মানুষ। এছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বজ্রপাতের সংখ্যাও দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পরিবেশের এমন দূষণ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হয়তো পৃথিবীটা একদিন বসবাসের অযোগ্য হবে। মানবসভ্যতা বিলীন হবে এই পৃথিবী থেকে। তাই সভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দূষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে সারাবিশ্বকে একসাথে। সেটা না হলে যে জলবায়ুর এই বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


poisha bazar

ads
ads