নকল ওষুধ: গণহত্যার হাতিয়ার


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৫ অক্টোবর ২০২১, ১৪:১১,  আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২১, ১৪:১৯

সায়মন পারভেজ হিমেল

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ত্যাগ’ ছোটগল্পে  নায়ক হেমন্ত  যখন প্রকৃতির আবেগময় জোছনা মুহূর্তে  স্ত্রী কুসুমের কাছে একান্ত প্রেম নিবেদনের ইচ্ছায় উš§াদ, তখনই কুসুমের  প্রতিক্রিয়া,‘ সমস্ত এই মুহূর্ত মিথ্যা ভাঙ্গিয়া যাইতে পারে, এমন এক মন্ত্র আমি জানি’।  বর্তমান প্রেক্ষাপটে লেখক হিসেবে কুসুমের মতো আমিও এমন এক মন্ত্র জানি, যা আমাদের সকল সম্ভাবনাময় উন্নতি, সকল বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে  ভেঙে দিতে পারে। যা অব্যক্ত এক গণহত্যার  মন্ত্র। আর সেই মন্ত্রটাই হলো নকল ওষুধের বিস্তার।  আর  অব্যক্ত যুদ্ধের  মঞ্চটা হলো মানুষের জীবন।

এটা সত্য যে, বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার মান নাজুক অবস্থা হলেও  বিশ্ববাজারে ওষুধ শিল্পের রয়েছে বেশ সুনাম ও  আস্থা। সেই সাথে দেশের চাহিদা মিটিয়ে ওষুধ বহির্বিশ্বে  রফতানি হয়ে থাকে।  বাংলাদেশে ওষুধের যে সহজলভ্যতা রয়েছে, তা পৃথিবীর কয়টা  দেশেই বা আছে।  সোনালি আঁশের দেশ বাংলাদেশ পাট রফতানিতে ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে চুকিয়ে গেলেও পোশাক ও ওষুধ শিল্পের সুনাম ক্রমশ বর্ধমান। বিশ্ববাজারে ওষুধ শিল্পের ক্রমশ বর্ধমান নিয়ে  ‘দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন’ একটি প্রতিবেদন দেখলাম। যেখানে বলা হয়, দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে ওষুধ রফতানি হচ্ছে ১৬০টি দেশে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের ৪৮ দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশের ওষুধ। দেশের ২৫৭টি কোম্পানির কারখানায় বছরে ২৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে। বছরে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল উৎপাদিত হচ্ছে এসব কারখানায়। এ শিল্পে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।

ওষুধ শিল্পের উন্নতি ও  সমৃদ্ধির কথা স্বীকার করেই বলছি। এক বালতি আদর্শ দুধে একফোঁটা গোমূত্র যেভাবে বিনষ্ট করে  আদর্শ দুধকে নষ্ট দুধে রূপান্তর করে, তেমনি সম্ভাবনাময় ওষুধ শিল্পকে নকল ওষুধ তেমনিভাবে  জীবনরক্ষার হাতিয়ার থেকে এক গণহত্যার হাতিয়ারে রূপান্তর করেছে। নকল ওষুধকে গণহত্যার হাতিয়ার  বলার কারণটা আগে পরিষ্কার করি। এই পৃথিবীতে যত অপকর্ম, দুর্নীতি কিংবা অসাধু কার্য আছে সবকিছুর ক্ষেত্র  পরোক্ষভাবে মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর। কিন্তু শুধুমাত্র এই নকল ভেজাল ওষুধের ক্ষেত্রটা সরাসরি মানুষের জীবনে। এর মতো জীবন মরণ খেলা,  অন্য কোনো প্রক্রিয়ায়  কোনোভাবেই সম্ভব না। কারণ নকল ওষুধের তিক্ত ফলাফলটা মানুষের জীবনের উপরেই ন্যস্ত হয়। অতএব শেষ সমাধান মরণ। এই মরণকে মৃত্যু বলা যাবে না। এই মরণটা হত্যার শামিল।  কেননা ব্যক্তির অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এ মরণকে ব্যক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।  এই হত্যাটা শুধুমাত্র কোনো পরিবার বা সমাজে সীমাবদ্ধ নয়, এই হত্যাটা সমগ্র জাতির ওপর বিস্তৃত। অতএব, এ হত্যা এক প্রকার গণহত্যা আর অব্যক্ত বলার কারণটা বলছি। ভূমিকায় বর্ণিত নায়ক হেমন্তের মতো আমরাও  জানি না কিরূপ ধ্বংসময় পরিস্থিতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, যা এখনো অপ্রকাশিত ও  অনুচ্চারিত কিন্তু প্রকাশ হওয়া শুধুমাত্র সময়মাত্র। অতএব, এ গণহত্যাটা হলো অব্যক্ত এক গণহত্যা, যার হাতিয়ার হলো নকল ওষুধ।

নকল ওষুধ প্রক্রিয়াটা বোঝার জন্য একটি চমৎকার উদাহরণ উল্লেখ করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক  ডক্টর মুনির উদ্দিন চৌধুরী স্যারের একটি  লেখায়  নকল প্যারাসিটামল নিয়ে একটি  উদাহরণ দিয়েছেন। একটা প্যারাসিটামল ট্যাবলেটে সক্রিয় উপাদান হিসেবে প্যারাসিটামল থাকে ৫০০ মিলিগ্রাম। সক্রিয় উপাদানের সঙ্গে আয়তন বাড়ানোর জন্য স্টার্চ, ল্যাকটোজ বা অন্যান্য নিষ্ক্রিয় উপাদান যোগ করাসহ ট্যাবলেটের আকার-আকৃতি প্রদানের জন্য অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে ওষুধের পরিপূর্ণ রূপ প্রদান করা হয়। অনেক সময় সক্রিয় উপাদানের পরিমাণ এত কম থাকে যে, (যেমন ১ মিলিগ্রাম) তা দিয়ে ওষুধের আকার-আকৃতি প্রদান করা যায় না। তাই নিষ্ক্রিয় উপকরণ মিশিয়ে আয়তন বাড়িয়ে ওষুধ তৈরি করা হয়। ওষুধে সক্রিয় উপাদান না থাকলে তাকে ওষুধ বলা যাবে না। প্যারাসিটামল ব্যবহার না করেই শুধু স্টার্চ বা অন্যান্য উপকরণ দিয়ে এমন ট্যাবলেট তৈরি করা যায়, যা দেখলে মনে হবে হুবহু একটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট।

একমাত্র গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ব্যতীত কেউ  বুঝতে পারবে না যে প্যারাসিটামল খাচ্ছে নাকি প্যারাসিটামল  সদৃশ অন্য কিছু খাচ্ছে। ফার্মাসিস্ট ব্যতীত ওষুধের গুণাগুণ বা সাবস্টেন্স নিরূপণ করা সম্ভব নয়। কেননা আমরা আপামর জনসাধারণ এ বিষয়ে অজ্ঞ। আমরা এমনই অজ্ঞ যে যদি বালি মাটি দিয়েও কোনো ওষুধ বানিয়ে আমাদের খেতে দেয়া হয় তবে এর আসল না নকল তা বুঝারও আমাদের সাধ্য নেই। আর এটাই বাস্তবতা। কষ্ট তো তখনই লাগে যখন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের বিচ্ছিন্ন রাখা হয় সরকারি পর্যায়ে ওষুধগুলোর মান নিরূপণে। সুযোগ  দেয়া হচ্ছে না  মাঠ পর্যায়ে। বেশ কদিন আগে কয়েকটি পত্রিকায় দেখলাম, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বিভিন্ন নামিদামি দেশি বিদেশি ব্র্যান্ডের  নকল ওষুধ তৈরিকারী সাত সদস্যের একটি চক্রকে গ্রেফতার করেছে। জেনে রাখা ভালো যে, অধিক লাভের আশায় ক্যান্সার কিডনি ও হার্টের দামি ওষুধগুলো নকল ও ভেজাল করা হয় মূলত। অতএব এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

পূর্ব অভিজ্ঞতা জানিয়ে রাখা ভালো, বিশ্ববাজারে পাট শিল্পে চাহিদা ও সুনাম নষ্ট হয়েছিল কিছুসংখ্যক অসাধু ব্যবসায়ীর কার্যকলাপে। যার ক্ষতি এখনো পোষানো সম্ভব হয়নি।  সেই একই পথে, অপার সম্ভাবনাময় ওষুধ শিল্পের সুনাম ও দেশের জনগণের আস্থা যেন জিম্মি না হয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর হাতে। যদিও আসল নকল ওষুধ শনাক্তকরণ সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। শনাক্ত করতে না পারাই স্বাভাবিক। তবে ব্যক্তিগত কিছু বিষয় জেনে রাখা ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘ডব্লিউএইচও’র পরামর্শ অনুযায়ী, নকল ওষুধ চেনার ক্ষেত্রে কয়েকটি উপায় জেনে  রাখতে পারি। সিরাপ, টনিক বা ওই জাতীয় বোতলজাত ওষুধের ক্ষেত্রে ওষুধের বোতলে সিল বা প্যাকেজিং-এ কোথাও কোনো গলদ (মোড়কের রং, আকার-আকৃতি, বানান ইত্যাদি সবই দেখে নিতে হবে) আছে কি-না, প্রথমেই তা ভাল করে দেখে নিতে হবে। কোনো রকম পার্থক্য বা সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লেই ওই ওষুধ ফিরিয়ে দিন বিক্রেতাকে।

এ ছাড়াও, ওষুধ খাওয়ার পর যদি শরীরে অস্বস্তি শুরু হয়, অ্যালার্জি হলে একটুও দেরি না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সেই ওষুধটি  চিকিৎসককে দেখানো যেতে পারে। এটি এক ধরনের ব্যক্তিগত সচেতনতা। এখন  সেইসাথে নিশ্চিত করতে হবে সরকারের সচেতনতা বা সরকারি বিভিন্ন পদক্ষেপের নিশ্চিতকরণ।  বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেয়া সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য হলেও তা সংখ্যায় বাড়াতে হবে। তাহলে ওষুধের গুণগত মান এবং সেবার মান উন্নতে সহায়ক হবে। মাঠ পর্যায়ে তদারকির জন্য ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ দিতে হবে। বাজার তদারকির ফলে নকল ওষুধ বিষয়ে ওষুধ বিক্রেতা ও ক্রেতার সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। সেইসাথে আইনের  সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করতে হবে । তবে  আমাদের দেশের   প্রচলিত ড্রাগ আইনে নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদনকারীদের সর্বোচ্চ দশ  বছরের  জেলের  বিধান রয়েছে।  এরা তো আত্মহত্যাকারী।  অতএব, প্রত্যাশা করি এই নীরব হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া জরুরি। আমরা কখনোই চাই না, নকল ওষুধের  বিস্তারে ধ্বংস হোক সম্ভাবনাময় ওষুধ শিল্প। জীবন নিয়ে খেলা আর নয়, স্বজনের বুকভরা  হাহাকারের কারণ যেন না হয়ে দাঁড়ায় নকল ওষুধের  বিস্তার।

লেখক: শিক্ষার্থী, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


poisha bazar

ads
ads