বাল্যবিয়ে রোধে চাই সচেতনতা


  • ২৯ আগস্ট ২০২১, ০৯:৩৬

মো. আব্দুল হাকিম জুবাইর : করোনায় অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে গেছে। অনেকেই চলে গেছে গ্রামে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেকের স্বপ্ন ভেঙেছে। অনেক ছেলেরাই লেখাপড়া ছেড়ে উপার্জনের পথ ধরেছে। আর কন্যা সন্তানদের বিয়ে দিয়ে মুক্ত হচ্ছে অভিভাবক। এ চিত্র সারাদেশের। আমাদের সমাজে বাল্যবিয়ে ও যৌতুকের জন্য অত্যাচার আগে থেকেই ছিল। করোনাকালে বাল্যবিয়ে ও যৌতুকের আদান প্রদান আগের চেয়ে বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে।

বিয়ের সময় মেয়েদের সঙ্গে কোনো উপঢৌকন বা উপহার যৌতুক প্রথার আধুনিক ভার্সন। আজকাল আমরা সভ্য থেকে সভ্যতর হয়েছি। তাই এটিকে যৌতুক বলে গ্রহণ করতে নারাজ। অথচ এটি গ্রহণের লোভও সামলানো কঠিন। তাই ছলাকলার আশ্রয় নিই। যৌতুক বা পণ একটি কু-প্রথা, যা আমাদের সমাজে বহু যুগ থেকে চলে এসেছে। এটি মধ্যযুগীয় একটি প্রথা, যা আধুনিককালেও পূর্ণস্বরূপে, ক্ষেত্রবিশেষে নতুন ও বিচিত্র রূপে টিকে আছে।

এ প্রথার আওতায় কন্যা পাত্রস্থ করার সময় কন্যাপক্ষ পাত্রপক্ষকে নগদ অর্থ, মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী, স্থাবর সম্পত্তি ও অন্যান্য বিনিময়যোগ্য বস্তু প্রদান করা হয়ে থাকে। যৌতুক প্রথার উৎপত্তি নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। তবে গ্রহণযোগ্য মতানুসারে বলা হয়ে থাকে, হিন্দু ধর্মে কন্যারা পিতার অর্থ-সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। সে জন্য বিয়ের সময়ই কন্যাকে নগদ অর্থ সম্পদ দিয়ে থাকে।

কিন্তু পরবর্তীতে এটি রীতিমতো ব্যবসায়িক হয়ে দাঁড়ায়। যৌতুক নারী জীবনের জন্য এক মহা অভিশাপ! এ অভিশাপে নারী জীবনে নেমে আসে নিদারুণ যন্ত্রণা। যৌতুকের কারণে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার হতাশাসে বুক বিদীর্ণ হয়, নারীকে শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়। এর কারণে আমাদের দেশে যে কত নারীর সংসার ভেঙে যাচ্ছে! কত বধূর জীবন অকালে ঝরে যাচ্ছে! তার ইয়ত্তা নেই।

অনেক নারী নিরুপায় হয়ে আজীবন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ভোগ করে সংসার নামক কারাগারে জীবন কাটায়। অনেক নারীর ওপর শারীরিক নির্যাতন পাশবিকতাকেও হার মানায়। যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং নিমর্মতা যে কত ভয়াবহ রকমের হতে পারে, তা হয়তো কয়েকটি উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। গত দুই বছর আগে যশোরের লেবুতলা গ্রামের বাবুল হোসেনের ছেলে কামালের সাথে সুমাইয়ার বিয়ে হয়।

বিয়ের পর থেকেই কামাল যৌতুক দাবি করে আসছিল। যৌতুকের কারণে সুমাইয়াকে প্রায়ই মারধর করা হতো। একপর্যায়ে সুমাইয়া যৌতুকের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সুমাইয়া ও তার চার বছরের মেয়ে সাবিহার গায়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ মর্মান্তিক ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল! পত্রপত্রিকার পাতা খুললেই যৌতুকের কারণে নারী নিগ্রহের বীভৎস এমন চিত্র চোখে পড়ে। যৌতুক দিতে না পারার অপরাধে নারীদের তালাক দেয়া বাংলাদেশে একটি অতি পরিচিত ঘটনা। যৌতুকের দাবি মেটাতে না পারায় হত্যা ও খুনেরও শিকার হচ্ছে নারী।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দেয়া এক তথ্য মতে, বাংলাদেশে যৌতুকের কারণে নির্যাতন, হত্যা ও খুনের ঘটনা বাড়ছে। সংস্থাটি জানায়, ২০১৯ সালের প্রথম নয় মাসে যৌতুকের কারণে বাংলাদেশে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ২৬৮টি। যা ২০১৮ সালের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এই তথ্যকে একটি আংশিক চিত্র বলে মনে করা হয় কারণ অনেক তথ্যই খবরের কাগজে প্রকাশ পায় না।

বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে নারী নির্যাতন ও সহিংসতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। যৌতুক প্রথা ক্যান্সারের মতো বিনাশীরূপে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে বসেছে আমাদের সমাজে। যৌতুকের জন্য নারী নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের সমাজে গরিব-ধনী সব পরিবারেই যৌতুক প্রথা বিদ্যমান। সময় পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ আগের থেকে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে।

কিন্তু যৌতুকের মতো জঘন্য ব্যাধি আজও প্রচলিত রয়েছে আমাদের এই সমাজে। গ্রাম-শহর সব জায়গাতেই স্ত্রীরা স্বামীদের বা তাদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে, কখনো কখনো মারাও যাচ্ছে। একাধিক সন্তানসহ নারীকে প্রায়ঃশই ঘর সংসার হারাতে হয় যৌতুকের কারণে। বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ডের শিকার নারীর বিরাট অংশই যৌতুকের বলি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে যৌতুকের কারণে ২৯৮ জন নারীর ওপর নির্যাতন চালিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়। ১০৮ জন নির্যাতনের শিকার হয়েও বেঁচে আছেন। এছাড়া নির্যাতন সইতে না পেরে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন একজন। যৌতুকের মামলা হয়েছে মোট ৯৫টি।
এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৮ সালে যৌতুকের কারণে ২০৭ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছিল।

আত্মহত্যা করেন ৭৪ জন আর ১০১ জন নির্যাতনের শিকার হয়েও বেঁচে আছেন। সে বছর যৌতুকের মামলা হয় ১৫৮টি। বিবাহে যৌতুক গ্রহণ ও প্রদান নিরোধ কল্পে বাংলাদেশের সরকার ‘যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০’ প্রণয়ন করে। উক্ত আইনের (৩) নং ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যৌতুক গ্রহণ বা প্রদান করলে সে সর্বাধিক পাঁচ বছর বা এক বছরের নিম্নে নহে মেয়াদের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

যৌতুক গ্রহণকারী ও যৌতুক প্রদানকারী উভয়ই সমান অপরাধী বলে বিবেচিত হবে। ১৯৮০ সালের আইনটি ২০১৮ সালে সংস্কার করে খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। নতুন আইনে শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ দুটিই বাড়ানো হয়েছে। নতুন আইনে বলা হয়েছে, কেউ যৌতুক দাবি করলে তিনি পাঁচ বছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

আইনের (৫) ধারায় বলা হয়েছে, কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য কেউ যদি যৌতুকসংক্রান্ত মিথ্যা মামলা দায়ের করেন, তারও সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল থেকে সর্বনিম্ন এক বছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য হবে; তবে আপোসযোগ্য হবে।

২০১৮ সালে এ আইনের সংস্কার করা হলেও এখন পর্যন্ত এর প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায়নি। বরং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যৌতুক আদান-প্রদান চলছে। ইদানীং হয়তো সেটি নেয়ার ধরন বদলেছে। সমাজে যৌতুক নানারূপে নানা কায়দায় আদায় করা হয়ে থাকে। শহুরে শিক্ষিত উচ্চবিত্ত! পরিবারে মেয়ের বিয়ের সময় সরাসরি অর্থের বদলে গয়না, ঘরের আসবাবপত্র, গৃহস্থালিতে ব্যবহারের নানা সামগ্রী উপহার হিসেবে দেয়া হয়।

মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে কন্যার অলংকার, খাট-পালং, টিভি-ফ্রিজ, ও অন্যান্য আসবাবপত্র সামাজিকতা রক্ষায় দিয়ে থাকে। বরকে মোটর-সাইকেল দেয়া বর্তমান সমাজে অতি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংগত কারণেই কন্যার পিতার সংগতি-সামর্থ্যরে বিষয়ে মোটেও নজর দেয়া হয় না।

ফলে কন্যাপক্ষ যৌতুক জোগাড় করতে গিয়ে বিপর্যস্ত আর পাত্রপক্ষ কাক্সিক্ষত পরিমাণ যত না পাওয়ার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হতাশ থাকে। কনের পিতাও বেশিরভাগ সময় মেয়ের কল্যাণের কথা চিন্তা করে ধার-দেনা করে হলেও যৌতুক প্রদান করে। যৌতুক আদান-প্রদানের বিষয়টি সমাজে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত এবং বেশিরভাগ মানুষই আর এটাকে অপরাধ বলে মনে করে না।

‘যৌতুক দেবেন না, যৌতুক নেবেন না।’ এমন স্লোগানে আমরা প্রায়ই রাজপথ কাঁপিয়ে ফেলি। কিন্তু বিয়ে করার সময় ঠিকই মেয়ের বাবার কাছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌতুক চেয়ে বসি। একজন পিতা মেয়েকে ছোটবেলা থেকে লালন-পালন করে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটাই তো আমার হাতে তুলে দিচ্ছে! পিতার কাছ থেকে আমার আর কি চাওয়ার থাকতে পারে?

এমন কাপুরুষোচিত মনোভাব থেকে আমাদের আগে বেরিয়ে আসতে হবে। মেয়েদের এবং তাদের অভিভাবকদের উদ্দেশে বলতে চাই, বিয়ের সময় যে ছেলে বা ছেলের পরিবার যৌতুক দাবি করতে পারে সে পরিবারে মেয়ে কখনোই ভালো থাকবে না।

আর যৌতুকের নেশা একবার যাদের পেয়ে বসে তাদের পরবর্তীতে আরো চাহিদা বাড়তে থাকে ও মেয়েকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে যৌতুকের অর্থ নিয়ে আসতে বাধ্য করে। যেটা করোনাকালে প্রকট আকার ধারণ করেছে। শুধু আইনের সংস্কার করে সমাজ থেকে যৌতুকপ্রথা দূর করা যাবে না; এ জন্য সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

পাঠ্যপুস্তকেও যৌতুক বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে সচেতনতার বিষয়টি সর্বপর্যায়ে নিয়ে আসা দরকার। সর্বোপরি সচেতনতা এবং মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন যৌতুক নির্মূল করতে পারে। কিন্তু একদিনেই সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যাবে এমন নয়।

দিনের পর দিন সচেতন করার নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কাক্সিক্ষত সাফল্য লাভ করা যেতে পারে। বিবেক জাগ্রত হোক, বন্ধ হোক এ অমানসিকতা। আসুন আমরা সকলে একত্রিত হই, যৌতুকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।


poisha bazar

ads
ads