৪১ হাজার ফুট উপরে তেল শেষ...


  • ২৭ আগস্ট ২০২১, ১১:১১

তানওয়ার আহমদ চৌধুরী : এয়ার কানাডা ফ্লাইট ১৪৩ জুলাই ২, ১৯৮৩ সালে টরন্টো থেকে এডমন্টন যায়। যেখানে ফ্লাইটের রেগুলার মেইন্টেন্স চেক আপ করা হয়েছিল। জুলাই এর ৩ তারিখ সকালে ফ্লাইট এডমন্টন থেকে মন্ট্রিয়াল এ গিয়েছিল। মন্ট্রিয়াল এ যাওয়ার পর ফ্লাইট মেম্বার রা তাদের ডিউটি এক্সচেঞ্জ করে ফেলে। এর ফলে প্লেনে নতুন পাইলট এন্ট্রি হয় যার নাম ছিল ক্যাপ্টেন রবার্ট পেয়ারসন।

যার ছিল ১৫,০০০ ঘণ্টা প্লেন উড়ানোর অভিজ্ঞতা। এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি তাদের অভিজ্ঞতা ঘণ্টা তে রেকর্ড করে থাকে। সেই সময় যেকোনো পাইলটের কাছে থাকত ১৫,০০০ ঘণ্টা প্লেন উড়ানোর অভিজ্ঞতা। ক্যাপ্টেন পেয়ারসনের সাথে সহকারী হিসাবে প্লেন উড়াতে আসে ফার্¯¡ অফিসার মায়ারস কোয়ান্টাল। যার ছিল ৭০০০ ঘণ্টা প্লেন উড়ানোর অভিজ্ঞতা।

ওই সময় কানাডা তাদের পুরনো মেজারমেন্ট সিস্টেম কে নতুন ইম্পোরটিয়াল মেট্রিক সিস্টেমে আপগ্রেড করতে থাকে। ইম্পোরিয়াল ইউনিট মেজরমেন্ট সিস্টেম যা আজ পৃথিবীর সর্বোচ্চ প্রচলিত রয়েছে। যা কেবল সে সময় প্রসেসিংয়ের কাজ চলছিল। আর আপগ্রেডের প্রসেসি ছিল দুর্ঘটনার মূল কারণ।

এটাই হয়েছিল কানাডার এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে। সে সময় ৭৬৭ প্লেনে নতুন ইম্পোরিয়াল মেজরমেন্ট সিস্টেম ইন্সটল করা হয়েছিল। কিন্তু বাকিগুলোতে সেই পুরাতন মেজরমেন্ট সিস্টেম বিদ্যমান ছিল। রিফুলিং টিম এয়ার কানাডা ফ্লাইট ১৪৩ তে ২২,৩০০ কেজি ফুয়েল লোড করার কথা ভুলে যায়।

এয়ার কানাডা ফ্লাইট ১৪৩ এবং ৭৬৭ প্লেন দেখতে একই রকম ছিল। কিন্তু একদম নতুন হওয়ার ফলে, রিফুলিং টিমের মনে হয়েছিল যে, এতে পুরাতন ইম্পোরিয়াল ইউনিট সিস্টেম ইন্সটল করা আছে। তাই তারা ২২,৩০০ কেজি ফুয়েলের পরিবর্তে ২২,৩০০ পাউন্ড ফুয়েল লোড করেছিল। যা প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক ছিল। ফ্লাইট ক্রু একটি ভুল করেছিল।

তারা টেক অফ করার আগে ফুয়েল লেভেল চেক না করে রিফুয়েলিং টিমকে কনফারমেশন দিয়েছিল। তারপর টেক অফ করে নেয়। তারপর আকাশের ৪১,০০০ ফুট বেশি উচ্চতায় ক্যাপ্টেন একটি সিগন্যাল দেখতে পান। সিগন্যালটির অর্থ ছিল প্লেনের বাম ইঞ্জিন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তারা মন্ট্রিয়াল থেকে ফুয়েল ভরে এডমন্ট যাচ্ছিল। কিন্তু যখন একটি ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার খবর পায়, তখন প্লেনটি ছিল মধ্য রাস্তায়।

এর সব চাইতে কাছে ছিল ছোট্ট একটি এয়ারপোর্ট। ফ্লাইট ক্যাপ্টেন ভেবেছিল তারা ওখানেই ল্যান্ড করতে পারবে। কিন্তু বাম ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার সাথে ডান ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। যখন পাইলট এটি জানতে পারে, তখন পাইলট দেখে, তারা মাটি থেকে ৪১,০০০ ফুট উপরে রয়েছে। প্লেনে যে ইলেক্ট্রিসিটি পাওয়া যায়, তা এই টার্বাইন ঘোরার ফলে উৎপন্ন হয়।

কিন্তু তখন প্লেনের দুটো টার্বাইন গতিশীল বায়ুর কারণেই ঘুরছিল। যা পুরো প্লেনে ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই করার জন্য যথেষ্ট ছিল। যার কারণে ককপিটে খুবই কম ইলেক্ট্রিসিটি ছিল। যা পুরো মনিটরিং সিস্টেমে ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই দিতে অক্ষম ছিল। ফলে অনেক মনিটরিং। সিস্টেম বন্ধ হয়ে যায়।

ক্যাপ্টেন পেয়ারসন এবং ফ্লাইট অফিসার দুইজন মিলে সিদ্ধান্ত নিতে থাকে যে এখন তারা কি করবে? কারণ প্লেনের ক্রু এবং ৬০ জন পেসেঞ্জারের জীবন তাদের দুজনের হাতে ছিল। এবং তাদের কাছে ফুয়েলও ছিল না। দুটি ইঞ্জিন বন্ধ। পর্যাপ্ত লাইট না থাকার কারণে অনেক ইন্সট্রুমেন্ট বন্ধ হয়ে যায়। কেবল কিছু এনালগ ইন্সট্র–মেন্ট কাজ করছিল।

তারা প্রথমে বোয়িং ৭৬৭ এর ইমারজেন্সি গাইড মেনুয়াল খুলে দেখতে থাকে। যে দুই ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে আর কি করার আছে? অনেক খোঁজার পরে তারা জানতে পারে, মেনুয়াল সিস্টেমে এমন কিছুই নেই। এই দিনের আগে এমনটি কখনো ঘটেনি। আর মেনুয়ালটি তৈরি করার টিমটি কখনোই ভাবেনি যে এমন কোনো কন্ডিশন আসবে।

যার কারণে এই মেনুয়াল দেখে তাদের শেখার মতো কিছুই ছিল না। এবং বেঁচে ফেরার মতো কোনো পথ ছিল না। ক্যাপ্টেন পেয়ারসন ঠিক করে সে প্লেনটিকে সুপার সিরিয়াসভাবে ল্যান্ড করবে। কিন্তু, এখানে প্রব্লেম হলো, ইলেক্ট্রিসিটি না থাকার ফলে ভার্টিক্যাল ইন্ডিকেটর এবং আংটিটিউটর। ইন্ডিকেটর কাজ করছিল না।

যার কারণে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে প্লেন কত উচ্চতায় আছে, আর প্লেন কত স্পিডে ল্যান্ড করছে। ক্যাপ্টেন তার সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্লেনকে নিচে ল্যান্ড করা শুরু করে দেয়। ক্যাপ্টেন ৪০০ কিলোমিটার পার আওয়ার গতিতে প্লেনকে নিচে নামাচ্ছিল। ফার্স্ট অফিসার ক্যাম্বুলেট করতে থাকে তারা বিনা প্যাকে নিচে ঠিকভাবে ল্যান্ড করতে পারবে কিনা?

প্লেনে মজুদ করা মেকানিক্যাল ইন্সট্র–মেন্ট আর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টিম ডিস্টেন্স ক্যাম্বুলেট করার পর জানতে পারে, প্লেন প্রচণ্ড গতিতে নিচের দিকে ধেয়ে আসছে। আর খুব কম সময়ের মধ্যে এটি মাটিকেও স্পর্শ করবে। আর এই কন্ডিশনে প্লেন ডিয়াগো ইমারজেন্সি স্পটের ওপর পৌঁছাতে পারবে। তখনই ফার্স্ট অফিসারের মনে পড়ে তার পুরানো এয়ার ফোর্স বেজেক গিমলির কথা।

যা সেই স্থানের পাশেই অবস্থিত ছিল। ক্যাপ্টেন পেয়ারসন এবং এয়ার ট্রাফিক টিম ক্যাম্বুলেট করে যে, সেখানে তারা পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু তারা এটা জানত না যে এই বেজটি এখন একটি রেস ট্রাকে পরিণত হয়েছে। প্লেনটির রেস ট্রাকে ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং করানো কোনো ব্যাপার ছিল না, যদি সেটা খালি থাকত। কিন্তু সে সময় রেস ট্রাকটিতে একটি রেস চলছিল। আর পুরো স্টেডিয়াম দর্শক দ্বারা পূর্ণ ছিল।

কিন্তু পাশেই ছিল গ্রেড ট্রাক, যা পুরোপুরিভাবে খালি ছিল। কিন্তু এটা অনেক বিপজ্জনক। ক্যাপ্টেন ওখানেই ল্যান্ড করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। প্লেনের ল্যান্ডিং গিয়ার গ্রেভিটি ড্রোপ করার কারণে বাইরে বের হয়ে যায়। যেকোনো উপায়ে ল্যান্ডিং করানোর জন্য ভার্টিক্যাল স্পিড অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু এই রিস্ক নেয়া ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পথ ছিল না।

তার মধ্যে অনেক কিছু অলরেডি হয়ে গিয়েছে, যা প্লেন ল্যান্ডিংকে আরো বিপজ্জনক করে তুলবে। প্রথমে প্লেনের ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার ফলে প্লেনের ইলেক্ট্রিসিটি শূন্য হয়ে যায়। যার ফলে কোনো শব্দের সৃষ্টি হচ্ছিল না। তাছাড়া আলোর অভাবে তাদের দেখতেও অনেক প্রবলেম হচ্ছিল। যার কারণে নিচের দর্শকরাও বুঝতে পারছিল না যে তাদের দিকে কি বিপদ আসছে? দ্বিতীয় ফ্রন্ট হুইল যাকে নস হুইল বলা হয়, সেটা গ্রেভিটি ড্রোপ হওয়ার কারণে লক হতে পারছিল না।

ক্যাপ্টেন যখন এটা শোনেন, তখন ভার্টিক্যাল স্পিডের গতিশীল বায়ুর কারণে টার্বাইন ঘুরছিল। ফলে কিছুটা ইলেক্ট্রিসিটি উৎপন্ন হচ্ছিল। যার ফলে হাইড্রোলিক স্টিয়ারিং সিস্টেম কাজ করছিল। কিন্তু নিচে আসার পর ব্লেড খুব আস্তে আস্তে ঘুরতে থাকে। যার ফলে হাইড্রোলিক স্টিয়ারিং সিস্টেম পুরো পাওয়ার নিয়ে ঠিক ভাবে ঘুরতে পারছিল না।

ফলে প্লেনকে কন্ট্রোল করা খুব কঠিন হয়ে যায়। এত কিছুর পরেও দুইটা ভালো কিছু হয়েছিল। ফলে অনেক মানুষের জীবন বেঁচে যায়। প্রথমে নস হুইল ঠিকভাবে কাজ করছিল না। যখন প্লেন মাটিকে স্পর্শ করে, তখন ক্যাপ্টেন পেয়ারসন পুরো ফোর্স ও ব্রেক লাগিয়ে দেয়। ফলে নস হুইল ভেতরে ঢুকে যায়। আর প্লেনের সামনের অংশ মাটিতে আঘাত করে।

আর অনেক বড় একটা বাউন্স দিয়ে দ্বিতীয়বার মাটিতে লেগে মাটির সাথে ঘর্ষণ খেতে খেতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আর এই ঘর্ষণের ফলে প্লেনের স্পিড অনেক কমে যায়। এতে অনেক ভালো কিছু হয়। যদি ফ্রন্ট হুইল লক হয়েও থাকত, তবে প্লেন এত কম সময়ে ব্রেক পুরোপুরিভাবে এত স্পিড কমাতে পারত না।

যার ফলে প্লেন খুব দ্রুতবেগে চলে রেস দেখা দর্শকদের ওপর আঘাত নিয়ে আসত। ফলে হাজার হাজার দর্শকের প্রাণ শেষ হয়ে যেত। তাছাড়াও ক্যাপ্টেন পেছনের হুইলে টান ব্রেক লাগিয়ে মেইন ল্যান্ডিং গিয়ার ভেঙে দেয়। যার কারণে প্লেনের আরেকটি অংশ মাটিতে স্পর্শ করে। এতে আরো বেশি ঘর্ষণ খেতে থাকে এবং প্লেনটি খুব তাগাতাড়ি থেমে যায়।

ফুয়েল শেষ হয়ে দুটি ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও মাত্র ১৭ মিনিট পরেই প্লেনটি মাটিতে ল্যান্ড করতে সক্ষম হয়। এই দুর্ঘটনায় ক্যাপ্টেন পেয়ারসনকে ৬ মাসের জন্য ডেমো করা হয়। আর ফার্¯¡ অফিসারকে ২ সপ্তাহের জন্য সাসপেন্ড করা হয়। কারণ এটা তাদের দুজনের জন্যই হয়েছিল।

তারা ফুয়েল লেভেল চেক না করেই ফুয়েলের ক্লিয়ারেন্স দিয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও প্লেনকে ভালোভাবে ল্যান্ড করানোর জন্য এই দুজনকে আউটস্ট্যান্ডিং এয়ারমেনশিপের সম্মাননা দেয়া হয়। আর তাদের পাইলট ক্যারিয়ার চলমান অবস্থাতেই থাকে। আর সেই ৭৬৭ প্লেনকে কিছু মেইন্টেইন করার পরে এয়ার কানাডা হয়ে আরো কিছু বছর চালু রাখা হয়। ২৫ বছর পর ২০০৮ সালে এই প্লেনটির উড়ান কার্যকর বন্ধ করা হয়। ওই প্লেনে থাকা কোনো যাত্রী ওই ১৭ মিনিটকে ভুলতে পারবে না।

লেখক: পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র।

 



poisha bazar

ads
ads