ই-কমার্সের নামে প্রতারণার ফাঁদ


  • ২৫ আগস্ট ২০২১, ০৯:৫৮

মোহাম্মদ নাদের হোসেন ভূঁইয়া : করোনা মহামারীর থাবায় গোটা বিশ্বের বেহাল অবস্থা। ভঙ্গুর পুরো বিশ্ব ব্যবস্থা। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথম করোনা শনাক্তের পর থেকে যেন অস্বাভাবিক হয়ে গেল সব কিছু। লকডাউন প্রভাবে পথে প্রান্তরে সুনসান নীরবতা। করোনার দাপটে ঘরবন্দি মানুষ। দফায় দফায় লকডাউনে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের কর্মচাঞ্চল্য।

দিনের পর দিন বন্ধ ছিল সব ধরনের বিপণি বিতান, দোকানপাট। মহামারীর এই সময়ে জীবন জীবিকার তাগিদে অনেকেই বাধ্য হয়ে শরণাপন্ন হয়েছে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের। কিন্তু কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছে এই ই-কমার্সগুলো? করোনার থাবায় চাকরিচ্যুত হয়েছে অনেক মানুষ। একটি জরিপে দেখা যায়, করোনায় লকডাউনের পর দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) তথ্য মতে, করোনা মহামারীর কারণে গত এক বছরে ৬২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছে। অনেকে পুনরায় কাজ শুরু করতে সক্ষম হলেও কমেছে অধিকাংশের আয়। ফলে বাধ্য হয়ে তারা ব্যয় কমিয়ে টিকে থাকার লড়াই করছে। এ লড়াই যেন বাঁচার লড়াই। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নিম্নআয়ের মানুষের।

সিপিডির তথ্য মতে, ৬২ শতাংশ মানুষ করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময় কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। যার বড় অংশ ২০২০ সালের এপ্রিল ও মে মাসে কর্মহীন হয়েছে। পরে অনেকের কাজ ফিরলেও আগের মতো আর চাকরি ফিরে পায়নি। তাছাড়া মহামারী এই সময় বিদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবাসী কাজ হারিয়ে দেশে ফিরেছে।

কোনোরূপ সহযোগিতা না পেয়ে পরিবার চালানোর তাগিদে তারা বাসায় বসে অনলাইন বিজনেসে মনোযোগী হচ্ছে। সরকারও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বেশ কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে ই-কমার্স মানুষের আস্থার প্রতিদান দিতে অনেকটাই ব্যর্থ।

করোনাকালে তো বটেই, করোনার আগেও ব্রডব্যান্ড টেকনোলজির প্রসার, মোবাইল টেলিকম ও ইন্টারনেটের বিকাশ ও সরকারের পক্ষ থেকে ডিজিটাল খাতকে উৎসাহ দেয়ার ফলে দেশে ই-কমার্স এমনকি এফ-কমার্সেরও বেশ বিকাশ হয়েছে। আর করোনাকালীন মানুষ স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে জনসমাগম এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অনলাইনে চাহিদা মতো পণ্যের অর্ডার করছেন।

ইতিমধ্যে এই বর্ধিষ্ণু ডিজিটাল কমার্স বিশেষ করে ই-কমার্স খাত নিয়ে বেশ সমালোচনাও উঠেছে। কিছু কিছু ই-কমার্স কোম্পানির পণ্য কিনে ভোক্তাদের ঠকে যাওয়া, বিক্রেতা কর্তৃক নিম্নমানের পণ্য প্রদান, টাকা নিয়ে পণ্য না দেয়া, পণ্য বিক্রির পরেও গ্রাহক কর্তৃক পণ্য গ্রহণ না করা বা ফিরিয়ে দেয়াসহ কিছু ই-কমার্স কোম্পানির অনেকটা ব্যাংকের মতো আচরণ করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

পণ্য কিনে অনেক ক্রেতার প্রতারিত হওয়ারও অভিযোগ এসেছে। অনলাইনে এক ধরনের পণ্য প্রদর্শন করে ডেলিভারি দিচ্ছে নিম্নমানের বা অন্য পণ্য। অনেক সময় অর্ডার নিয়ে পেমেন্ট পাওয়ার পর পণ্য ডেলিভারি না দিয়ে ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়। ফলে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছে এবং অনলাইনে কেনাকাটায় আগ্রহ হারাচ্ছে।

এই চক্রের সদস্যরা ছদ্মনাম ব্যবহার করে ফেসবুকে বিভিন্ন নামের পাতা খোলে। এরপর এসব পাতায় ভালো মানের মোবাইল ফোন, জুতা, ঘড়ি, থ্রি-পিস, শাড়িসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়। সেসব বিজ্ঞাপন দেখে কেউ অর্ডার করলে, অর্ডার নিশ্চিত করার সময় একটি বুকিং মানি নেয়। এরপর নকল, ভাঙাচোরা, নষ্ট ও নিম্নমানের ব্যবহার অনুপযোগী সামগ্রী প্যাকিং করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়।

অনেক সময় তারা নিউমার্কেটের সামনের ফুটপাত থেকে নিম্নমানের কাপড়চোপড় কিনে সরবরাহ করে। পুলিশ বলছে, তারা ফেসবুকে যেসব ভুয়া ই-কমার্স পাতা তৈরি করেছিল তার মধ্যে রয়েছে দারাজ অনলাইন, দারাজ অনলাইন ৭১, দারাজ অনলাইন শপ, দারাজ এক্সপ্রেস, দারাজ অনলাইন বিডি, ফ্যাশন জোন, গ্যালাক্সি ২৪, অনলাইন মোবাইল গ্যালাক্সি, শপিং সেন্টার নেট, শপিং জোন বিডি, শপিং ডেলস, স্মার্ট শপ বিডি, উইন্টার কালেকশন, সোনিয়া ফ্যাশন হাউজ, সু বাজার বিড, ফ্যাশন হাউজ ২৪, চায়না ফ্যাশন বিডি, বিডি ফ্যাশন ইত্যাদি।

সম্প্রতি ই-অরেঞ্জ নামক একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান পণ্য দেয়ার কথা বলে প্রায় হাজারখানেক মানুষের কাজ থেকে আনুমানিক ১১ শত কোটি টাকা নিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে পালিয়ে যায়। টাকা প্রদানকৃত একটি লোক বলেন, আমি লোন করে এই টাকা দিয়েছি। এখন আমার পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তারা সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

এছাড়াও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ই-কমার্সের প্রতারণার খবর আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। করোনার কারণে কাজ হারিয়ে কিছু বিপদগামী লোক এই সব পেশায় পাড়ি জমাচ্ছে। মূলত তাদের এই পেশার নেপথ্যে থাকে প্রতারণার ফাঁদ। অথচ করোনার এই দুঃসময়ে ই-কমার্স হতে পারত নির্ভরতার প্রতীক। সর্বজনস্বীকৃত একটি অনলাইন বিজনেস মাধ্যম।

এমনিতেই করোনার দাপটে কাজ হারিয়ে বিপন্ন মানব জীবন। তার মাঝে এমন প্রতারণার দৃশ্য নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু লোকের প্রতারণার জন্য ই-কমার্স হারাচ্ছে তার সৌন্দর্য। তাই ই-কমার্সের মতো একটি বিপুল সম্ভাবনাময় খাতের প্রসার যাতে কোনোভাবেই থেমে না যায় তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং করতে হবে।

আর মানুষকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। প্রতিটি কাজে ভালো মন্দ দুই ধরনের মানুষ থাকে। দু-একটি ই-কমার্স প্রতারণা করেছে তার মানে এই নয় সবাই ব্যর্থ। যারা আস্থার প্রতিদান দিতে সক্ষম, যারা মানসম্মত পণ্য প্রদানে সক্ষম তাদের ব্যবহার করুন।

বাংলাদেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আক্তার নিশা বলছেন, বর্তমান সময়ে ই-কমার্স ব্যবসায় প্রতারণার হার আগের চেয়ে অনেক কমেছে, তারপরেও অনলাইনে কেনাকাটার সময় ক্রেতাদের কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা উচিত। ১.পাতার বয়স: প্রথমে দেখতে হবে পাতাটা কতদিনের পুরনো। পরিচিত না হলে একেবারে নতুন পাতা থেকে কেনাকাটা না করাই ভালো।

২.রিভিউ: ফেসবুকের পাতাগুলোয় কেনাকাটার সময় দেখতে হবে সেখানে আগের রিভিউগুলো কতটা পজিটিভ আর কতটা নেগেটিভ। নেগেটিভের সংখ্যা বেশি হলে সেখান থেকে কেনাকাটা না করাই ভালো।

৩.সদস্য: পেশাদার ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের অনেকেই ই-ক্যাবের সদস্য হয়ে থাকে। এই সংগঠনের সদস্যদের অনেক নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। তাই ই-ক্যাবের সদস্য কিনা, সেটা দেখে নেয়া।

৪. ব্র্যান্ডের নাম: বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের নাম ঠিক আছে কিনা, সেটাও ভালোভাবে নজর দিতে হবে। অনেক সময় প্রতারকরা বিখ্যাত ব্র্যান্ডের নামের সঙ্গে কিছু যোগ করে বা অদল বদল করে প্রতারণা করার চেষ্টা করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিখ্যাত কোনো ব্র্যান্ড যখন তখন তাদের নামের পরিবর্তন করে না।

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের অনলাইন বিজনেসকে সমৃদ্ধ করতে হবে। ই-কমার্সের ওপর মানুষের আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। যে সকল অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবসার নামে মানুষের সাথে প্রতারণা করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ই-কমার্সকে প্রতারণামুক্ত রাখতে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কারণ করোনার এই ক্রান্তিকালে চাকরিহারা মানুষ ও তরুণ প্রজন্মের জন্য ই-কমার্স হতে পারে সম্ভাবনাময় একটি বড় কর্মসংস্থান। যার মাধ্যম নিত্যনতুন সৃষ্টিশীল তরুণ উদ্যোক্তা উদ্ভব হবে। বিশ্বায়নের এই যুগে তারাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বহুদূর।

লেখক: শিক্ষার্থী: জয়নাল হাজারি কলেজ, ফেনী।



poisha bazar

ads
ads