সব আলো নিভিয়ে দেয়ার শেষ চেষ্টা ছিল


  • দীপংকর গৌতম
  • ২০ আগস্ট ২০২১, ২৩:০২,  আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২১, ২৩:১৬

মুহুর্মুহু গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ও ভয়ঙ্কর শব্দে কেঁপে ওঠে ঢাকার মাটি। পায়ের নিচের মাটি সরে যায় মুহূর্তের বীভৎসতায়। বিকট শব্দ, ধোঁয়া আর অযুত মানুষের ভয়ার্ত দিগ্বিদিকহীন ছোটাছুটির মধ্যে আবার পুলিশের কাঁদানে গ্যাস আর ফাঁকা আওয়াজ। যেদিকে তাকাই আমার চারদিকে পড়ে আছে মানুষ, স্যান্ডেল, অবিস্ফোরিত গ্রেনেড।

আমার সহযোদ্ধা ও সমাবেশে আসা মানুষের কান্না আর আর্তচিৎকারে ভারি গুলিস্তান। আহতদের নিয়ে রিকশা-ভ্যানে হাসপাতালে ছুটছে যে যেভাবে পারে। ছুটছি আমিও- ঢাকা মেডিক্যাল, পঙ্গু হাসপাতাল। সহযোদ্ধার রক্তে তখন আমার শরীরও ভিজে গেছে। মনে হচ্ছিল আমিও মরে যাচ্ছি।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীর সমাবেশে গ্রেনেড হামলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অশ্রুসজল চোখে কথাগুলো বলছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী এবং তৎকালীন অ্যাডভান্স কমান্ডারের দায়িত্বে নিয়োজিত পরিমল দে (অব) জেসিও।

২০০২ সালের জানুয়ারিতে তিনি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা স্টাফ হিসাবে যোগ দেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ট্র্যাজেডির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সেদিন দুপুর ২টায় অ্যাডভান্স নিরাপত্তা দল নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে র‌্যালির উদ্দেশ্যে আমি ১০/১২ জনের একটি নিরাপত্তা দল নিয়ে হাজির হই। সেদিন সভাস্থলে কোনো মঞ্চ তৈরি হয়নি।

একটা ট্রাকের ওপর মঞ্চ তৈরি করে তার সঙ্গে মাইক সেট করা ছিল। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ মাইকে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। ট্রাকটার মুখ ছিল পূর্বদিকে আর পেছনটা ছিল পশ্চিম দিকে। ট্রাকে ওঠা-নামার জন্য কাঠের একটা সিঁড়ি ছিল। ওই সিঁড়ির ডান পাশেই দাঁড় করানো ছিল নেত্রীর বুলেটপ্রুফ গাড়ি। ওই গাড়িতে ড্রাইভার আব্দুল মতিন ছিলেন।

সাধারণত ওই গাড়িতে নেত্রীর সঙ্গে ৩ জন সিকিউরিটি কর্মকর্তা থাকতেন। এরা হলেন- জেনারেল তারেক সিদ্দিকী (অব.), মেজর সোয়েব (অব.), স্কোয়াড্রন লিডার মামুন (অব.)। নেত্রী বক্তব্য দেয়ার আগে আমরা ওই জায়গা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতাম। সেদিনও করেছিলাম। আমাদের সিকিউরিটিদের কে কোথায় দাঁড়াবে তা ঠিক করে আমরা অন্যান্য সভা-সমাবেশের মতো দাঁড়িয়ে যাই।

ওইদিন যেমন ছিল জনগণের উপচেপড়া ভিড়, তেমনি চারদিকে ছিল পুলিশ আর পুলিশ। সবার শেষে নেত্রী বক্তৃতা করলেন। মঞ্চে তখন প্রয়াত মেয়র হানিফ, মোফাজ্জল চৌধুরী মায়া, শেখ সেলিম, সাবের হোসেন চৌধুরী, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রমুখ। নেত্রী বক্তব্য শেষে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলার সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে আততায়ীর গ্রেনেড। আমরা হতভম্ব হয়ে যাই।

কোত্থেকে আসছে কি আসছে। আর ওগুলো যে গ্রেনেড তা তখনো ভেবে উঠতে পারিনি। সে কি বীভৎস মুহূর্ত যা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও দেখিনি। মানুষ ছুটছে যে যেদিকে পারছে। অনেকে ছুটতে গিয়ে উঠতে পারছে না। পা দিয়ে গল গল করে বেরোচ্ছে রক্ত। তবু গ্রেনেড থামছে না। একের পর এক গ্রেনেড। ট্রাকের ওপর সব নেতৃবৃন্দ মানববর্ম রচনা করে নেত্রীকে ঘিরে রাখে।

ট্রাকের সিঁড়ির পাশে নেত্রীর গাড়ির দরজার পাশেই দাঁড়ানো ছিল নিরাপত্তাকর্মী মাহবুব। সে ওখানেই পড়ে যায়। পেছনে আরেক নিরাপত্তাকর্মী নীহার রঞ্জন কর, সেও পড়ে যায়। তখন ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝে উঠতে পারছিনা কি করব। কিছু সময়ের জন্য শব্দ থামলে নেত্রী মঞ্চ থেকে গাড়িতে ওঠেন।

গাড়ির একটা চাকা পাংচার হয়ে গেছে, গ্লাসও ফেটেছিল। তার মধ্যেও জিপিওর রাস্তা ধরে চলে যায় নেত্রীর গাড়ি। ড্রাইভার মতিন একচাকা ছাড়াই নেত্রীকে নিয়ে সুধা সদন। আমি নীহার ও মাহবুবকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে যেতেই ডাক্তার মাহবুবকে মৃত ঘোষণা করে। মৃতদের এক সারিতে রাখা হয়। বাকিদের চিকিৎসা চলতে থাকে বিভিন্ন হাসপাতালে। নীহার তখনও কাৎরাচ্ছে।

ওর ডান পায়ে স্প্লিন্টার লেগে হাড় ভেঙে গিয়েছিল। ঢাকা মেডিক্যাল থেকে বলল ওখানে চিকিৎসা সম্ভব নয়। আমি নীহারকে নিয়ে ছুটলাম পঙ্গু হাসপাতালে। রাতে অপারেশন হয়।

এর মধ্যে আমি আমাদের গ্রুপের আরো তিনজনের আহত হওয়ার খবর দেই সুধা সদনে আমাদের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা মেজর শোয়েবকে। মাহবুব মারা যায় ২১ আগস্ট, দু’বছর পরে নীহার। আর যারা তারা অনেকেই শরীরে আগস্টের স্প্লিণ্টার বয়ে বেড়াচ্ছে।

 



poisha bazar

ads
ads