শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগ্যতায় পিছিয়ে যাচ্ছে শিশুরা


  • ০২ আগস্ট ২০২১, ১১:১৯

সবুজ আহমেদ : আজকের শিশুরাই আগামী দিনে জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ, দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তারাই একদিন বড় হয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবে, তারাই জন্ম দেবে এক একটা গৌরবময়, ঐতিহ্যপূর্ণ সোনালি অধ্যায়। আর এই সম্ভাবনাময় আগামীর প্রজন্মের বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত আনন্দঘন পরিবেশ, যেখানে প্রত্যেক শিশুরা পাবে নিজেকে তৈরি করার যথেষ্ট সুযোগ ও অনুকূল আবহাওয়া।

তবে বর্তমান সময়ের আমাদের সমাজে চলমান পারিপার্শ্বিক দুরবস্থা, অসুস্থ সংস্কৃতি, আর পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাবে প্রতিনিয়তই শিক্ষা, স্বাস্থ ও মেধায় পিছিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিশুরা। ছোট-বড় বিভিন্ন পারিবারিক কিংবা সামাজিক জটিলতায় একটু একটু করে অস্তমিত হয়ে যাচ্ছে আমাদের আশার আলো, নানান জটিলতায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের শিশুদের পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ।

প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা আর উপযুক্ত পরিবেশের সুষ্ঠু ব্যবহার করে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শিশুরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মেধা এবং যোগ্যতায় এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে। বিপরীতে অপসংস্কৃতি, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা আর সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মেধায় দিনের পর দিন পিছিয়েই যাচ্ছে আমাদের দেশের শিশুরা।

উপযুক্ত পরিচর্যা এবং সঠিক পরিবেশের অভাবে ক্ষণে ক্ষণেই পথভ্রষ্ট হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা। অপূর্ণ মানসিক বিকাশের কুপ্রভাবে আমাদের শিশুরা প্রায়শই জড়িয়ে যাচ্ছে অগ্রহণযোগ্য ভয়ঙ্কর অপরাধে, ক্রমেই বেড়ে চলেছে তাদের অসহিষ্ণুতা। খেলাধুলার বয়সে প্রয়োজনীয় মাঠ সংকট আর শৈশব-কৈশোরের স্বভাবজাত খেলাধুলায় মেতে উঠতে না পারার দুর্ভোগে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে আমাদের কোমলমতি শিশু-কিশোররা।

ফলাফলে, প্রতিনিয়তই তাদের সঙ্গী হচ্ছে, হতাশা, বিষণ্নতা ও অবসাদ। আমাদের দেশের শহরগুলোতে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ ও খোলা জায়গার যথেষ্ট অভাব রয়েছে, যেটুকু আছে তাও কারো না কারো দখলে, দূষণে কিংবা কখনো আবার সেটা থাকে পরিত্যক্ত। মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও নগরবিদরা বলছেন, খেলাধুলা ও নির্মল বিনোদন ছাড়া কোনোভাবেই শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ সম্ভব নয়।

খেলাধুলা, সুস্বাস্থ্য এবং যথোপযুক্ত পরিবেশের অভাবে আমাদের শিশুরা আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৫-১০ বছর বয়সী প্রতিটি শিশুর জন্য দিনে অন্তত ১ ঘণ্টা ঘরের বাইরে খেলাধুলা করার পরামর্শ দিয়েছে। অথচ পড়াশোনার চাপ, কোচিংয়ের পড়া, স্মার্টফোনের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তির মতো বিচিত্র কারণে দেশের প্রতিটি শিশুই খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

চাঞ্চল্যকর এক তথ্যে উঠে এসেছে যে; খেলার মাঠে গিয়ে খেলার সুযোগ পায় ঢাকা শহরের মাত্র ২ শতাংশ শিশু। যার ফলে সেখানকার ২০ শতাংশ কিশোর এবং ২৯ শতাংশ কিশোরীর মধ্যে প্রায়শই দেখা মিলে হতাশার লক্ষণ। দেশীয় সংস্কৃতি এবং নানা কুসংস্কারে খেলাধুলার সুযোগ থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে মেয়েশিশুরা।

সারাদিনের একটানা ক্লাস, সন্ধ্যার কোচিং আর রাতে বাসায় এসে পড়িয়ে যাওয়া শিক্ষকের পড়া প্রস্তুত করার পহাড়সম চাপে আমাদের শিশু-কিশোরেরা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। ফলে হতাশা, বিষণ্নতা গ্রাস করে নিচ্ছে তাদের নাবালক মস্তিষ্ক। দীর্ঘদিনের এই একগুঁয়েমি রুটিনে একটু একটু করে তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অসহিষ্ণু মনোভাব।

প্রতিটি শিশুই নিষ্পাপ, ফুলের মতো। আজ আমাদের সমাজে যে শিশুরা বিপথগামী, চোর, টোকাই, ছিনতাইকারী কিংবা প্রতারক বলে পরিচিত, তাদের প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে এক একটি ভয়ংকর অতীত। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে জীবনের জয়গানে আজ তারা পরাজিত। পারস্পরিক সমঝোতা ও সহানুভ‚তিশীল আচরণ সাংঘাতিকভাবে কমে যাওয়া শিশুদের এই অপূর্ণ মানুষিক বিকাশের একটি বড় কারণ।

যার ফলে ক্রমেই বাড়ছে অপরাধের প্রবণতা, আক্রোশ, স্বার্থপরতা, আত্মহত্যা, ক্লান্তি ও অবসাদ। আর এগুলো শিশুর অপূর্ণ মানসিক বিকাশেরই বহিঃপ্রকাশ। প্রতিটি শিশুই সম্ভাবনাময়। শিশুদের শেখার ধরন বুঝে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ীই তাদেরকে শিক্ষা দিতে হবে। পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশের জন্য শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষাবান্ধব, আনন্দঘন পরিবেশ। তাহলেই কেবল এই শিশুরা একদিন শেখ মুজিব, শেরে বাংলা, কাজী নজরুল, রবীন্দ্র হতে পারবে।

শিশুর মন হলো মুক্ত বিহঙ্গের মতো, কোনো কিছুতেই বাধা মানতে চায় না। তারা নীড় বাঁধতে চায় সুদূর ঐ নীল আকাশে, দীপ্ত প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে চায় নতুন সম্ভাবনার দিকে। শিশুদের শেখার ধরন অনুযায়ী তাদেরকে সুশিক্ষা প্রদান করা গেলে এই শিশুরাই একদিন পরমাণু বিজ্ঞানী, বিচক্ষণ চিকিৎসক, কালজয়ী বিশেষজ্ঞ হবে। ভীতিহীন মুক্ত পরিবেশের মাঝেই শিশুরা শিখতে চায়।

কঠোর শাসন, নিয়ন্ত্রণ, প্রতিক‚ল পরিবেশ শিশুদের শিক্ষা জীবনকে ঠেলে দেয় অনিশ্চয়তার পথে। মনের আনন্দই শিশুর অন্তর্নিহিত শক্তির মূল উৎস। আর এই আনন্দঘন ও শিশুবান্ধব পরিবেশ ছাড়া শিশুর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো সত্যিই অসম্ভব।

প্রতিটি শিশুই অত্যন্ত সৃজনশীল। সৃজনশীলতা হলো নিজের মতো করে নতুন কিছু করা, সবার চেয়ে আলাদা কিছু করা। শিশুদের ভেতর এই সৃজনশীলতা স্বাভাবিকভাবেই সুপ্তাবস্থায় থাকে। তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেয়ার মাধ্যমে শিশুর ভেতর এই লুকানো প্রতিভাকে বের করে আনা প্রতিটি অভিভাবকেরই একান্ত দায়িত্ব।

আমাদের অসচেতনতা, অনুপযুক্ত পরিবেশ ও আনন্দহীন শিক্ষার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে আমাদের শিশুদের জীবনে। সুশিক্ষা প্রদান করার মাধ্যমে আমাদেরকে শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং আদর্শ নাগরিক হিসেবে ভবিষ্যৎ সময়ের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। আমাদের দায়িত্বশীল আচরণেই সাফল্যের আলোকে উদ্ভাসিত হতে পারে হাজারও শিশুর জীবন। শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রস্তুত করা দেয়া গেলে আজকের এক একটা শিশু আগামী দিনে জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


poisha bazar

ads
ads